সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম পরিবেশ এখন নেই

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:৪০

প্রশাসনে রদবদল, গণগ্রেফতার বন্ধ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা বাতিলসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়েছে বিএনপি। এসব দাবি নিয়ে গতকাল শনিবার বিকালে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বরাবর পৃথক ৫টি চিঠিতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপনের পাশাপাশি বেশ কিছু দাবি করে দলটি।

সিইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সুষ্ঠু কোন নির্বাচনের ন্যূনতম কোন পরিবেশ এখন নেই। দিন দিন এ পরিবেশের অবনতি ঘটছে। সরকার যেভাবে তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে এগিয়ে চলেছেন নির্বাচন কমিশন সেটা রোধ করতে সক্ষম হচ্ছে না। বিএনপি দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশব্যাপী পুলিশি অভিযান চলছে। সকল নির্বাচনী এলাকায় গণগ্রেফতার চলছে, প্রতি রাতে অভিযান চলছে। আমাদের নেতাকর্মী, যাদের ওপর নির্ভর করে আমরা নির্বাচন করবো, তারা কেউ বাড়িতে থাকতে পারে না। আজকে এর কোন প্রতিকার নাই। এরই মধ্যে আমাদের সাতজন প্রার্থী যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মওদুদ বলেন, গ্রেফতারকৃতদের জামিন পাওয়া প্রায় মুশকিল হয়ে গেছে এখন। বিচারিক আদালত এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বেগম খালেদা জিয়া আজকে দারুণভাবে অসুস্থ, আপনারা দেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত যেখানে তাকে জামিন দিয়েছে কিন্তু নিম্ন আদালত মানে বিচারিক আদালত তাকে নানা অজুহাতে আটকে রেখেছে, আমরা এখনো তাকে মুক্ত করতে পারি নাই। আরেকটি বিষয়ের ওপর আমরা নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। সেটি হলো-সরকারের সাজানো প্রশাসন। যেই পুলিশ প্রশাসন, সিভিল প্রশাসনের ওপর আজকে নির্বাচন নির্ভর করছে কারণ যেহেতু আজকে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কোন কর্মকর্তা নাই, কোন প্রতিনিধি নাই। এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রিটার্নিং অফিসার বা ডেপুটি কমিশনার যিনি এ সরকারের একজন চাকুরে। সহকারী রিটার্নিং অফিসার তিনিও একজন ইউএনও, তিনি সরকারের একজন কর্মকর্তা। তারা মেইনস্ট্রিম ব্যুরোক্রেসিতে বিলং করেন। একই রকমভাবে পুলিশ প্রশাসনও। পুলিশ সুপার এবং থানার ওসিরা এই চারজন কর্মকর্তা কার অধীনে কাজ করেন, সরকারের অধীনে কাজ করেন। দেশে এখন একটি রাজনৈতিক সরকার বিদ্যমান, সমস্ত মন্ত্রীরা সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছেন। ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছেন, প্রভাবিত করতে পারছেন বিভিন্নভাবে। এমপিরা প্রভাব-ক্ষমতা, শক্তি-সামর্থ্য আছে, তার সবকিছুই ব্যবহার করতে পারছেন। সুতরাং তারা প্রার্থী যারা এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নির্বাচন করতে হচ্ছে।

প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী, কবিতা খানম ও ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মুশফিকুর রহমান, বিজন কান্তি সরকার উপস্থিত ছিলেন।

ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা বাতিলের দাবি: আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে অভিযোগ করে  এ কার্যক্রম বাতিলের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর দাখিল করা লিখিত অভিযোগে বিএনপি বলেছে, তারা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছে, মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা ভেটিংয়ের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত প্যানেল হতে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গণগ্রেফতার বন্ধ, পুলিশ-প্রশাসনে প্রত্যাহার, বদলি ও রদবদল : বিএনপির চিঠিতে বলা হয়েছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুই দফা আলোচনা বৈঠকে তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করা হবে না এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। সিইসির উদ্দেশে বিএনপির ওই চিঠিতে বলা হয়, আপনি গণমাধ্যমে বলেছেন, পুলিশ বাহিনী আপনার নির্দেশেই কাজ করছে। সিইসির এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপি সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনে পুনর্বিন্যাসসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়। এসব দাবির মধ্যে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার, পুলিশ ও প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তাদের যাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের প্রত্যাহার, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা এক বা একাধিক স্টেশনে দুই বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করেছে তাদের প্রত্যাহার, সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বর্তমান কর্মস্থল জেলার বাইরে বদলি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন বা আছেন এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, উপদেষ্টা বা সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পিএস-এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট পদে পদায়ন রোধ এবং অতীতে নির্বাচনকালীন সময়ের ন্যায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলেছে বিএনপি।

নৈর্ব্যক্তিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন :শান্তিপূর্ণ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ভোট প্রদান নিশ্চিতের জন্য প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নৈর্ব্যক্তিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। বিএনপির এ দাবিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি নির্বাচনী আসনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দৃশ্যমানভাবে নাম ও র্যাংক ব্যাজসহ ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো সদস্য সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের মোতায়েনের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ওয়ার্ড বা নিজে যে ভোটকেন্দ্রের ভোটার সেখানে মোতায়েন করা যাবে না। তাদের নিয়োগের সময় নিশ্চিত হতে হবে যে, তিনি বা তারা কোনো রাজনৈতিক দলের বা প্রার্থীর সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বা ছিলেন না।

জানিপপ এবং বেরোবি’র ভিসিকে ভোট পর্যবেক্ষণ থেকে বিরত রাখা: নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিপপ এবং এর চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার দাবি জানিয়েছে। বিএনপি অভিযোগ করেছে, জানিপপ চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বর্তমানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ভিসি। তিনি রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের নেতা রাশেক রহমানের পক্ষে প্রচারণা চালান।