উত্তরবঙ্গের ৭ জেলায় বেকারত্ব
আলাউদ্দিন চৌধুরী
উত্তরবঙ্গের বেকার যুবদের কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পেয়েও সহজশর্তে ঋণ পায়নি একটি বৃহত্ অংশ। সরকারি ভাবে প্রশিক্ষণের পর যারা ঋণ পেয়েছে তাদের অনেকের মতে ঋণের আকার কম, যা দিয়ে কোনো সুবিধামত ব্যবসা শুরু করা যায় না। ফলে অনেকেই বিশেষ করে মহাজনের কাছে থেকে ঋণ গ্রহণ করে। উত্তরবঙ্গের ৭টি জেলায় বেকার যুবদের কর্মসংস্থান এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি (২য় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সম্প্রতি প্রকাশিত ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের উত্তরাঞ্চলে বেকারত্বের সংখ্যা এবং দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এদের অধিকাংশ কৃষিনির্ভর হওয়ায় বছরের সব সময় কাজ থাকে না। বেকার যুবদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ও তাদেরকে উত্পাদনমূলক কাজে লাগানোর লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রকল্পটি গ্রহণ করে। প্রকল্পটি ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের জুন মেয়াদে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটি রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও নাটোরে বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটি গ্রহণের আগে কোনো বেইজলাইন জরিপ করা হয়নি। ফলে ঐ সময়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে বর্তমানের কোনো তুলনা করা যায়নি।
পাঁচটি ট্রেডে বিশেষ করে ডেইরি পণ্য সামগ্রীর উত্পাদন, গরু মোটাতাজাকরণ, হাঁস-মুরগি ও ছাগল-ভেড়া পালনের উপর ৩৭,৯৫০ জন বেকার যুব প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এদের মধ্যে ২১২০০ জনকে ঋণ প্রদান করা হয়। এই প্রশিক্ষণ ও ঋণ ব্যবহার করে প্রায় ৩৭,৩৫০ জন আত্ম-কর্মসংস্থানে নিয়োজিত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এদের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ঋণ ফান্ডের স্বল্পতা ও ঋণ প্রাপ্তির শর্তসমূহ পূরণে ব্যর্থতার কারণে অনেক প্রশিক্ষণার্থী ঋণ পাননি। উপকারভোগীর মধ্যে ১৬,০৩১ জন কোনো ঋণ পাননি। পাঁচটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও বেশির ভাগ সুবিধাভোগী দুটি বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর একটি হল গাভী পালন, আর অন্যটি হল গরু মোটাতাজাকরণ। উপকারভোগীদের নিয়ে করা জরিপে আইএমইডি উল্লেখ করেছে, তাদের মতে প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ সুবিধাভোগী গাভী পালনে, শতকরা ৩৮ ভাগ গরু মোটাতাজাকরণে এবং বাকি শতকরা ২ ভাগ হাঁস-মুরগি ও ছাগল-ভেড়া পালনে ঋণ ব্যবহার করেছেন। যারা ঋণ নিয়েছেন তাদের শতকরা ৯৪ ভাগ সময়মত ঋণ পরিশোধ করেছেন। সুবিধাভোগীদের ব্যবসায়ে গড় মূলধনের পরিমাণ ৩৫,৯৬৬ টাকা। যদিও তারা মাত্র ২৫ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছেন। এদের কেউ কেউ নিজস্ব পুঁজির সাথে ঋণের টাকা যোগ করে বেশি মূলধন নিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিষয়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও যারা ঋণ পাননি তাদের মধ্যে জরিপকালে জানিয়েছেন, জমির দলিল না থাকা, গ্যারান্টার না থাকায়, নিজের জায়গা জমি না থাকায় তারা ঋণ পাননি। আবার কেউ কেউ বলেছেন, অতিরিক্ত কিছু টাকা প্রদান করতে না পারায় প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও ঋণ পাননি। এসব এলাকায় ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমও অনেক কম। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে মাথাপিছু ২৫০০০ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে। যারা পরিশোধ করতে পেরেছেন তারা পরবর্তীতে ৪০ হাজার টাকা করে ঋণ পেয়েছেন।
আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থানে উন্নতি হয়েছে। দুগ্ধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে উঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। উত্পাদন বেড়ে গেলে পশ্চাদবর্তী ও পূর্ববর্তী লিংকেজ শিল্পজাত দ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে এই সমস্ত শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। প্রকল্পকে শক্তিশালী করার সুপারিশের ওপর প্রশ্নের জবাবে শতভাগ উত্তরদাতা ‘প্রশিক্ষণ ও ঋণ বৃদ্ধি করা’ বিষয়ে সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শতকরা ৭৫ ভাগ বেকার যুব কর্মসংস্থানের উপায় না পেয়ে যুব ঋণ গ্রহণ করে। যে পরিমাণ ঋণ প্রদান করে তা দিয়ে একটি বাছুরও কেনা যায় না। ফলে ব্যবসা শুরুর জন্য ঋণ পেয়ে আবারও ঋণ গ্রহণ করতে হয় অন্য কারো কাছে থেকে। এতে করে দুই জায়গাতেই লভ্যাংশ প্রদান করতে হয়, যা ব্যবসার উপর দারুণ প্রভাব ফেলে। এজন্য প্রশিক্ষণের পর কমপক্ষে এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
