টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দার ১৫ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, নিখোঁজ হয়েছে এক যুবক। এদিকে সীমান্তের নদ-নদী ও হাওর অঞ্চলে পানি বাড়তে থাকায় জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে সুনামগঞ্জ শহর। চরম দুর্ভোগে পড়েছে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ। সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দেখা দিতে পারে বন্যা। পদ্মা-যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে এই নৌরুটে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
নেত্রকোনা :ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কলমাকান্দা উপজেলার পাচগাঁও নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে উপজেলার সীমান্তবর্তী রংছাতি, খারনৈ ও লেংগুরা ইউনিয়নে অন্তত ১৫টি গ্রামের কমপক্ষে ১ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রবল বর্ষণের কারণে ভেঙে গেছে বেশকিছু কাঁচা বাড়িঘর। ভেসে গেছে পুকুর ও ফিশারির মাছ। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ-ব্যবস্থা। এ অবস্থায় পানিবন্দি ঐসব পরিবারের লোকজন চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ পানিবন্দি পরিবারের লোকজনের। এদিকে বৃহস্পতিবার উপজেলার গণেশ্বরী নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে হান্নান নামে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ ওই যুবক লেংগুরা ইউনিয়নের চৈতা গ্রামের আহমেদ মিয়ার ছেলে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বৃহস্পতিবার ভোরে সীমান্তবর্তী পাচগাঁও এলাকায় নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও, ধারাপাড়া, নয়া চৈতাপাড়া, রামনাথপুর, নংক্লাই, কৃষ্টপুর, রায়পুর, নতুন বাজার, বারমারা, খারনৈ ইউনিয়নের সুন্দরীঘাট, বাউশাম, ভাষানকুড়া এবং লেংগুরা ইউনিয়নের চৈতা, লেংগুরা বাজার, ফুলবাড়ী, ঝিগাতলা ও শিবপুর গ্রামের লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এছাড়া কলমাকান্দা-পাচগাঁও পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকাবাসী। সুন্দরীঘাট-বাউশাম কাঁচা রাস্তার দুই পাশের মাটি ভেঙে দেবে গেছে বাউশা বাজার ব্রিজ। যে কোনো সময় ব্রিজটি ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার তিন ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কিছু কাঁচা রাস্তা তলিয়ে গেছে। উপজেলা চেয়ারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শন করেছি।
সুনামগঞ্জ :শুক্রবার সকালে সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্ট দিয়ে পানি বিপত্সীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হাওর ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের পৌর এলাকার নবীনগর, বনানীপাড়া, ষোলঘর, তেঘরিয়া, বড়পাড়া কাজির পয়েন্ট, বিলপাড়সহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে।
আগামী ২৪ ঘণ্টায় জেলার নদ-নদীতে আরো পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর উপজেলা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে নিমজ্জিত। হাওর ও নদীর পানি বেড়ে তাহিরপুর, দোয়ারাবাজারসহ নিম্নাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, তিন দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীসহ সীমান্ত নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়ছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বড়ো ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) : তিন দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জগন্নাথপুরে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পৌর শহরের আংশিকসহ চারটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও শহর ও গ্রামের অধিকাংশ রাস্তা ডুবে যাওয়ায় যাতায়াত সমস্যায় চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। কুশিয়ারা, নলজুরসহ বিভিন্ন নদী ও হাওরের পানি হুহু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) : আষাঢ়ের বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে নাগেশ্বরীতে সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দেখা দিতে পারে বন্যা। ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়েছে নদীতীরবর্তী কচাকাটার ধনিরামপুর, শৈলমারী, তরিরহাট নতুন বাজার বদুর দোলা, কেদারের টাপুর গ্রাম, সাতানা, পুটিমারী বিষ্ণুপুর, বল্লভের খাসের টাপুরচর, ফান্দিরচর, নামারচর, কালীগঞ্জের ফান্দির ভিটা, সাহেবগঞ্জ, ধনীরপাড়, নারায়ণপুরের বালার হাট, চর ঝাউকুটি, মাঝিয়ালী, নুনখাওয়ার বোয়ালমারী, চরপাটতলা, চরকাপনা, মাঝেরচর, বেরুবাড়ীর নয়ারচর, বামনডাঙ্গার চরলুছনিসহ অনেক গ্রাম।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) :পদ্মায় দ্রুত হারে পানি বৃদ্ধিতে প্রবল স্রোত ও ডুবোচর এড়িয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল করায় উভয় ঘাটে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। বহরের ২০টি ফেরির মধ্যে চার-পাঁচটি বিকল থাকায় যানজট যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। পাটুরিয়া দৌলতদিয়া ঘাটে ও আরিচা বিকল্প সড়কে অন্তত দেড় হাজার পণ্যবাহী ট্রাক পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে। পারের অপেক্ষায় সময়ক্ষেপণ, দ্রব্যমূল্য বেশি, শৌচাগার সংকটসহ নানা কারণে যাত্রী ভোগান্তি চরম পৌঁছেছে।
