আদর্শ অনুসরণে ঝর্ণাধারাকে স্মরণীয় করে রাখার প্রত্যয়

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ২২:৩৫

মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আদর্শে ব্রতী হয়ে ঝর্ণাধারা চৌধুরী মানব ও সমাজসেবার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন, তাঁর সেই আদর্শ অনুসরণ করে তাঁকে চিরস্মরণীয় করার প্রত্যয় নিলেন শবযাত্রায় শামিল রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে ঝর্ণাধারার কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান দলটির সাধারণ সম্পাদক সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘ঝর্ণাধারা চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অহিংসার চেয়ে বড়ো হাতিয়ার আর কিছু নেই। শান্তির লক্ষ্যে অহিংসা আর ত্যাগের আদর্শ তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন। জাতি সমাজসেবায় তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী আদর্শ অনুসরণ করে যাবে।

মানবাধিকারকর্মী ও সংসদ সদস্য অ্যারোমা দত্ত জানান, ঝর্ণাধারা অসামপ্রদায়িকতার এক মূর্ত প্রতীক। তিনি সারা জীবন অন্যায়, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছেন। অহিংস আদর্শ থেকে জীবনে একচুলও বিচ্যুত হননি তিনি।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, স্কুলের পাঠ্য বইয়ে ঝর্ণাধারা চৌধুরীর জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হোক। অহিংস আর ত্যাগের আদর্শে তিনি আমৃত্যু অবিচল ছিলেন।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করতে গিয়ে ঝর্ণাধারাকে অনেক কষ্ট সইতে হয়েছে। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি কখনো পিছপা হননি। মানবিক বাংলাদেশ গড়তে ঝর্ণাদি আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’

গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, আত্মত্যাগের নতুন ধারা রচনা করেছিলেন তিনি। সে ধারাকেও তিনি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘আমরা সবাই যখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তুলে ধরতে ব্যস্ত, তখন ঝর্ণাধারা চৌধুরী অহিংস নীতিতে বিশ্বাস করেছেন। নিজেকে সঁপে দিয়েছেন মানুষের কল্যাণে।’

গান্ধী আশ্রমের নির্বাহী কর্মকর্তা রাহা নবকুমার বলেন, ‘দিদি ছিলেন আমাদের সকলের আলোকবর্তিকা।’

এ সময় ঝর্ণাধারার মরদেহ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। ঝর্ণাধারা চৌধুরীর মরদেহের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন কুমুদিনী ট্রাস্টের পরিচালক ভাষাসৈনিক প্রতিভা মুত্সুদ্দি, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

এ সময় ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান ডেপুটি হাইকমিশনার বিশ্বদীপ দে। শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ ঐক্য ন্যাপ, নোয়াখালী পৌরসভা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, গৌরব ৭১, কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, সিপিডি, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদসহ আরো বেশ কটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ঝর্ণাধারার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে, তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল গান্ধী আশ্রমে। মানুষের সেবায় জীবন উত্সর্গ করা এই নারী মরণোত্তর দেহ দান করে গেছেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর মরদেহ সন্ধানীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান ৮০ বছর বয়সি সমাজকর্মী ঝর্ণাধারা চৌধুরী। সেদিন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে তাঁর মরদেহ রাখা হয় স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে।

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নিজ কর্মস্থল নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর জয়াগ গান্ধী আশ্রমে শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়েছেন ঝর্ণাধারা চৌধুরী। গতকাল বিকালে ঢাকা থেকে ঝর্ণাধারা চৌধুরীর মরদেহ গান্ধী আশ্রমে পৌঁছালে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সব ধর্মের কয়েক হাজার নারী-পুরুষের ভিড় জমে। এ সময় বাংলাদেশস্থ ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জি, নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস, পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, ধর্মীয় সংগঠনের নেতা, আশ্রমের সহকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁর মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে ধর্মীয় সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাঁর মরদেহ ঢাকার পথে রওনা হয়। গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের পরিচালক রাহা নবকুমার জানিয়েছেন, ঝর্ণাধারা চৌধুরী জীবদ্দশায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সন্ধানী ডোনার ক্লাবে তাঁর মরদেহ দান করে যান। সে অনুযায়ী আজ শনিবার সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সন্ধানী ডোনার ক্লাবে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।