রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’— মন্ত্রের উৎস অনুসন্ধান ও প্রাসঙ্গিকা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৩, ১৬:৫৯

ওয়েস্টফেলীয় রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকেই জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাগুলো বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার সম্পর্কের ধরন কিরূপ হবে সেটিও মূখ্য বিষয় হয়ে উঠে। পাশাপাশি, ‘আধিপত্য’ ও ‘স্বায়ত্ত্বশাসন’ এই ধারণাগুলো ঔপনিবেশিক ও স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ঔপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে জাতি-রাষ্ট্রগুলো বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে নিজস্ব পছন্দের স্বাধীনতা খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা নির্মিত নয়া-ঔপনিবেশিক পরিকাঠামো থেকে খুব কম রাষ্ট্রই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। ফলস্বরূপ, নতুন ধরনের নির্ভরশীলতার আবির্ভাব ঘটে এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ বাজার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে বৈশ্বিক দক্ষিণের উন্নয়নশীল এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। তাছাড়া, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সময় মতাদর্শগত বিভেদের ফলে সৃষ্ট দ্বিমেরুত্বের প্রভাবে উন্নয়নশীল এবং দুর্বল দেশগুলো তাদের বৈদেশিক নীতি তৈরি এবং বাইরের প্রভাব ছাড়াই তাদের জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণে খুব কমই স্বাধীনতা উপভোগ করেছে। যদিও একদিকে ‘জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন’ উল্লেখযোগ্য গতি পেয়েছে, অন্যদিকে ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ ধারণারও আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু, একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়ন, বহুপাক্ষিকতাবাদ, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং মেরুকরণের ফলে বৈশ্বিক দক্ষিণ ও উদীয়মান দেশগুলো বিশ্ব মঞ্চে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ উত্থাপন ও অনুসরণ করার বিষয়ে আরও দৃঢ় এবং আশাবাদী হয়ে ওঠেছে।    

এক. পাকিস্তান রাষ্ট্রের দীর্ঘ তেইশ বছরের অভ্যন্তরীণ-উপনিবেশবাদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নয়মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ফলে সৃষ্ট বিভাজনের মধ্যে সদ্যস্বাধীন দেশের জন্য একটি দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি ও আদর্শ ঠিক করা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু জাতির পিতার দূরদর্শী নেতৃত্ব সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হয়েছে। দ্বিমেরু প্রভাববলয়ের বাইরে বেরিয়ে এসে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলেনে (ন্যাম) যোগ দেয়ার পাশাপাশি তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ উত্থাপন ও বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। 

সদ্যগঠিত একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে এবং প্রথমে যেটি প্রয়োজন সেটি হলো একটি পররাষ্ট্রনীতি মতবাদ। এই মতবাদ বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যান্য সমস্ত নীতি উপকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বস্তুগত সম্পদকে পরিচালিত করে। রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি এই মতবাদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সদ্যস্বাধীন দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশকে মর্যাদার আসনে সু-প্রতিষ্ঠিত করা যখন অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর “রূপান্তরমুখী নেতৃত্বের” মহিমায় (James MacGregor Burns এবং Bernard M. Bass এ ধরনের তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। এ ধরনের নেতৃত্ব অনুগামীদের নিজস্ব কল্যাণার্থে কর্মে উৎসাহ দেওয়ার বাইরেও তাদের একটি পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্যে অনুপ্রেরণামূলক কর্মপরিকল্পনা ও রূপকল্প স্থির করেন) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”- এই ডকট্রিন বা মতবাদের কাঠামোয় সংস্থাপন করেন এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভূমিকা, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট দরকষাকষির ক্ষেত্রে এক মোক্ষম আদর্শিক চেতনাকে তুলে ধরেন। বাহাত্তরের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে এই ডকট্রিনের সারবস্তু প্রতিফলিত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদের মূল বক্তব্য হলো আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, অন্যান্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, জাতিসংঘ সনদ বাস্তবায়ন এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা প্রভৃতি। 

দুই. “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”- এই মতবাদটি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র দর্শনের একটি যুগান্তকারী দিক। বঙ্গবন্ধুর এমন চিন্তাভাবনার সর্বপ্রথম বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় তাঁর রচিত ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থে। স্মৃতিনির্ভর এ ভ্রমণকাহিনীটি তিনি ১৯৫৪ সালে জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় রচনা করেন। ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত “পিস কনফারেন্স অব দি এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওন”-এ পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে তিনি নয়াচীন সফর করেন। কম্যুনিস্ট না হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের উক্ত শান্তি সম্মেলনে যোগদানের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর উপলব্ধি ছিল, আমার দেখা নয়াচীন গ্রন্থের ঊনিশ নম্বর পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত, “দুনিয়ার আজ যারাই শান্তি চায় তাদের শান্তি সম্মেলনে আমরা যোগদান করতে রাজি। রাশিয়া হউক, আমেরিকা হউক, ব্রিটেন হউক, চীন হউক যে-ই শান্তির জন্য সংগ্রাম করবে, তাদের সাথে আমরা সহস্র কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে রাজি আছি, “আমরা শান্তি চাই’”। 

এই ডকট্রিনের কথা সরাসরি উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে। ইশতেহারের ‘পররাষ্ট্রনীতি’ বিভাগের ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ উপ-বিভাগে বর্ণিত হয়েছে, “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয় - এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমরা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে এবং একে অপরের নিরাপত্তার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আমাদের প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকতে চাই” ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস: প্রথম খণ্ড, ইউপিএল, ১৯৯৯, পৃ. ৮১)। পরবর্তীতে, ২৮শে অক্টোবর ১৯৭০ সালে দেয়া নির্বাচনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু এই মতবাদ পুনঃব্যক্ত করে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে আমাদের জনগণের সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিত হবে” (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ, ৫৬২)। ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন মিশনে থাকা বাঙালি অফিসার যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন তাদের জন্য ১৬ দফা নির্দেশিকা প্রস্তুত করে। উক্ত নির্দেশিকার সর্বপ্রথম নির্দেশনা ছিল সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বিদ্বেষ নয়। অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে ছিল- রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিলুপ্তিতে বিশ্বাস; জোট-নিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধীতা; CENTO এবং SEATO’র মতো বিশ্ব শান্তিকে বাধাগ্রস্তকারী সামরিক জোটের বিরোধিতা ইত্যাদি। তাছাড়া, ১৯৭২ সালের ১৫ই জানুয়ারি বার্তা সংস্থা এপি’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকের করা পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি মূল নীতির কথা উল্লেখ করেন যথাঃ জোট-নিরপেক্ষতা, নিরপেক্ষতা, স্বাধীন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, এবং সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়।  

তিন. জাতির পিতার দেয়া এই ডকট্রিনকে ঘিরে বাংলাদেশের সকল বৈদেশিক সম্পর্ক আবর্তিত হচ্ছে। স্নায়ু যুদ্ধকালীন ও পরবর্তী কঠিন সময়ে এই মতবাদ জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগদান এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে ভারসাম্য ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আবার এই মতবাদের স্বীকৃতিও মেলেছে বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছ থেকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত International Year of Dialogue as a Guarantee of Peace, 2023 শীর্ষক রেজুলেশনে উক্তিটি সন্নিবেশিত হয়েছে। রেজুলেশনে বলা হয়, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, নিরক্ষরতা এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্ব স্বীকার করে এবং গঠনমূলক সহযোগিতা, সংলাপ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার চেতনায় প্রবুদ্ধ হয়ে সকলের সাথে বন্ধুত্ব এবং কারও প্রতি বিদ্বেষ নয় এই মর্মে জোর দিলে উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যসমূহ অর্জন সম্ভব হবে। 

সম্প্রতি ঘোষিত বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুকেও এই ডকট্রিনের প্রতিফলন রয়েছে। এই আউটলুকে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ‘ন্যায্য ও টেকসই উন্নয়নের’ জন্য ‘ উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপত্তা কাঠামো’ ও ‘নিয়মতান্ত্রিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে যা প্রকারান্তরে এই অঞ্চলের সকলের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অংশীজনদের মধ্যে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমুলক উন্নয়নের পথকে মসৃণ করবে। এ ধরনের ভিন্নধর্মী শব্দচয়ন বাংলাদেশ ডকট্রিনকে প্রতিফলিত করেছে এবং এই অঞ্চলের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশের একটি নিরপেক্ষ ভঙ্গি গ্রহণের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেছে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জি-২০ সম্মেলন ও জাতিসংঘের ৭৮তম সাধারণ অধিবেশনে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেখানেও এই ডকট্রিন বিম্বিত হয়েছে। জি-২০ সম্মেলনে দেয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বৈশ্বিক আবহ তৈরির কথা উঠে আসে যা বিশ্বসম্প্রদায় ও জনগণের পারস্পরিক সহাবস্থানের মাধ্যমে দারিদ্রতা দূর ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে ভূমিকা রাখবে, পাশাপাশি বিশ্বে সংঘাতের বদলে সহযোগিতার আবেষ্টন সৃষ্টি করবে। আর সে আবহ তৈরির পূর্বশর্ত হবে বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে সুসংহত ব্যবস্থা গ্রহণ ও মানবকল্যাণের স্বার্থে পুরো বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা। তাছাড়া, ৭৮তম অধিবেশনে দেয়া তাঁর ভাষণেও বাংলাদেশ ডকট্রিন সমুন্নত থেকেছে। তিনি চলমান বৈশ্বিক সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানবজাতির কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা ব্যক্ত করেছেন। 

এছাড়া, ইন্দো-প্যাসিফিক ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে পরাশক্তি ও উদীয়মান শক্তিসমূহের মধ্যকার প্রতিযোগিতা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে যা এই অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। বিগত একদশকে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিসমূহের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাই এই প্রতিযোগীতাপূর্ণ সম্পর্কের ভেতর থেকে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোকে আদায় করে নেয়ার জন্য এই ডকট্রিনটি একটি কার্যকর দিকনির্দেশক হিসেবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও দৃঢ় করতে পারে। অধিকন্তু, ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়ন ও রপ্তানী বাজার সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আনয়ন, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যক চুক্তি তৈরি ও বাস্তবায়ন, এবং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটসমূহে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই ডকট্রিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

পরিশেষে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রতিবেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনায় এই ডকট্রিনটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক দোলাচলে মধ্যে নিজস্ব অগ্রাধিকারগুলোকে উত্থাপন করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও সুসংহত করার জন্য বাংলাদেশের অনুসৃত এ মতবাদ বঙ্গোপসাগরীয় এলাকা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের দেশসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং সম-অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক দৃষ্টান্ত হতে পারে।  

লেখক: রিসার্চ ফেলো, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ 

ইত্তেফাক/এসএটি