বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের চিত্র

এখনো জরাজীর্ণ ৩৯ হাজার আর ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ হাজার

  • নতুন ৪ হাজার ৪৪১টি শ্রেণিকক্ষের কাজ চলেছে 
  • ২০২৫ সালের মধ্যে ১ লাখের বেশি নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা 
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:০০

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ভবন ও শ্রেণিকক্ষ যেন কমছেই না। একদিকে নতুন ভবন ও শ্রেণিকক্ষ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা বাড়ছে। যে হারে স্কুলের ভবন ও শ্রেণিকক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে, সে তুলনায় নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে না। এ কারণে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

তবে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে আরও অন্তত ১ লাখ নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরি হবে বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

দেশের ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ কোটি ৯০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এসব শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিশুবান্ধব রাখতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই সুপারিশ করা হচ্ছে। 

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য মোট ভবন ১ লাখ ৭ হাজার ৪৮৪টি। এর মধ্যে নতুন ভবন রয়েছে ৩৪ হাজার ৪২৫টি, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৩২ শতাংশ। তবে পুরোনো ভবনের সংখ্যাও কম নয়। ১৭ হাজার ৮৯৩টি বিদ্যালয় ভবন এখনো পুরোনো, যা মোট ভবনের ১৭.৫৭ শতাংশ। এছাড়া জরাজীর্ণ রয়েছে ১১ হাজার ৯২৫টি বিদ্যালয় ভবন, যা মোট বিদ্যালয়ের ১১ শতাংশের বেশি। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে ৫ হাজার ৬৩টি। পরিত্যক্ত রয়েছে ৩ হাজার ২৯২টি, অব্যবহারযোগ্য ১ হাজার ৩৫৯টি। তবে বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে  নির্মাণাধীন রয়েছে ১ হাজার ১০৯টি ভবন।

শ্রেণিকক্ষের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ভবনে নতুন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৫টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। তবে পুরোনো ৫৮ হাজার ৪৪৯টি। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। এর সংখ্যা ৩৯ হাজার ১০১টি। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ হাজার ৬২৭টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। পরিত্যক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৮৪৬টি শ্রেণিকক্ষ। অব্যবহারযোগ্য ৪ হাজার ২৪২টি। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে আরও নির্মাণ করা হচ্ছে ৪ হাজার ৪৪১টি শ্রেণিকক্ষ।

একাধিক শিক্ষা কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, নতুন ভবন না হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান করতে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে জানানো হয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে ভবন পেতে বছরের পর সময় পার হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়েই জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান করা হয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরাজীর্ণ বিদ্যালয়গুলোর কোনোটায় মেঝেতে গর্ত, লাইট-ফ্যান থাকলেও নষ্ট, কোনোটায় আবার অল্প বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে পানি পড়ে।

শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, স্কুলের অন্যান্য পরিবেশ নিয়েও সমস্যা রয়েছে। ৬০০ প্রতিষ্ঠানের জরিপ করে আইএমইডির সর্বশেষ একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব স্কুলের ১৩ শতাংশে কোনো নলকূপ নেই। একইসংখ্যক বিদ্যালয়ে নলকূপ থাকলেও ব্যবহারের অযোগ্য কিংবা নষ্ট।

আবার কোথাও শিক্ষার্থীর তুলনায় শ্রেণিকক্ষ ছোট। তাই সবার বসার জায়গা হয় না। ফ্যান না থাকায় গরমে কষ্ট হয়। ১১ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ নেই। আর ১০ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোনো কমন রুম নেই। ২৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের জন্য পৃথক টয়লেট নেই। আবার বিদ্যালয়ের টয়লেট সব সময় খোলা থাকে না। আবার কোনো কোনো টয়লেট ব্যবহারের উপযোগী নয়। অপরিষ্কার থাকায় টয়লেটে যেতে খারাপ লাগার কথাও ঐ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, দেশে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবন বা শ্রেণিকক্ষ থাকলেও নতুন ভবন ও শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের জন্য একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। এছাড়া নতুন আরও একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।

তিনি জানান, এসব জরাজীর্ণ ভবনের বিষয়টি বিবেচনায় এনেই একটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মধ্যে ৫০ হাজার নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-৪-এর আওতায় নির্মাণ করা হবে আরও ৩৭ হাজার ৫০০ শ্রেণিকক্ষ। এছাড়া পৃথক একটি প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হচ্ছে ২৫ হাজার ৫০০ শ্রেণিকক্ষ। এভাবে ১ লাখের বেশি নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরির সিদ্ধান্ত রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এসবের কাজ শেষ হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

ইত্তেফাক/এমএএম