বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ডেঙ্গু প্রকোপ: ঢাকা মেডিকেলে দুই ঘণ্টা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৫০

ডেঙ্গুতে মৃতের মিছিল কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অবস্থা আরও করুণ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন ৪০-৪৫ জন করে রোগী আসেন। গত মাসে হাসপাতালটিতে ৪৫০ জন ডেঙ্গু রোগীর নাম নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢামেক হাসপাতালে দেখা যায়, ঘিঞ্জি পরিবেশ আর স্বল্প জায়গার মধ্যে রোগীরা গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন। সবাই শুধু ভাবছেন, কীভাবে ডেঙ্গুর মারণকামড় থেকে তারা সুরক্ষা পেতে পারেন।

ডেঙ্গুর ভয়বহতা নিয়ে ঢাকার অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল আলম চৌধুরী বলেন, ‌‘প্রতিদিন ডেঙ্গু ক্রমশ বাড়ছে। হাসপাতালেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা।’

হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক বলেন, ‘প্রতিদিন ৪০-৪৫ জন রোগী ঢাকা মেডিল্যালে ভর্তি হচ্ছেন। এ বছর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে দুই লাখ ৪৭ হাজার ১৯৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা েই প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ রোগী ডেঙ্গু পরীক্ষা করাচ্ছেন।’

এদিকে রাজধানী ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। বৃহস্পতিবার এতে ৮ ও শুক্রবার ১২ জনের মৃত্যু হয়। শনিবার মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে উপনীত হয়। গত সপ্তাহ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ছিল এক হাজার ১৪৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১১ জন, ১৬ অক্টোবর ১৬ জন, ১৭ অক্টোবর ৯ জন এবং ১৮ অক্টোবর ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার তিনদিন মিলিয়ে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই বিচারে ডেঙ্গুতে মৃত্যু তুলনামূলক কমেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী চলতি মাসে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২২৫ জন। এছাড়া, চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুই হাজার ৩৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন দুই লাখ ৪৯ হাজার ৫৪৩ জন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু সংক্রান্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৭ বছরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। ২০১৬ সালের আগস্টে সারা দেশে ১৪৫১ জন, সেপ্টেম্বরে ১৫৪৪ জন ও অক্টোবরে ১০৭৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ২০১৭ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও মাথাচাড়া দেয় ডেঙ্গু মহামারি। এছাড়া, বিগত বছরগুলোর সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০১৯ সালের ৫২ হাজার ৬৩৬ জন আক্রান্ত হন। এরপর আবার মাথাচাড়া দেয় ২০২২ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন যথাক্রমে ২১ হাজার ৯৩২ ও ১৭ হাজার ৫৮৩ জন।

বুধবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এমনই চিত্র দেখা গেছে ঢামেকে। দুই ঘণ্টা অবস্থান করে রোগীদের অবস্থা ও চিকিৎসার পরিবেশ পর্যবেক্ষণে এসেছে।

বিকেল পাঁচটা ৪২ মিনিট

হাসপাতালের মেঝেতে অনেক রোগী একসঙ্গে গাদাগাদি করে রয়েছেন। কেউ কেউ কুঁকড়ে যাচ্ছেন, কাউকে টেস্ট দেওয়া হয়েছে, কারও আবার টেস্টের রিপোর্ট বাকি। কয়েক ঘণ্টা বাদেই কিংবা একদিন পরেই চিকিৎসক রিপোর্ট দেবেন। রিপোর্টের অপেক্ষায় থাকা এক রোগীর স্বজনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘আমরা ময়মনসিংহ থেকে এসেছি। আমার মেয়ে তিনদিন ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছে। ডাক্তাররা রিপোর্ট দেবে আগামীকাল। রিপোর্টে কী আসে দেখি। স্বাভাবিক হলে হাসপাতাল থেকে ছুটি পাবো।’

বিকেল পাঁচটা ৫৫ মিনিট

হঠাৎ চারদিকে শোরগোল। একটি স্ট্রেচারে ডেঙ্গুতে কাতর রোগীকে কেবিনে নেওয়া হচ্ছে। সামনে যারা ছিল, সবাই সরে দাঁড়াচ্ছে। সেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সাতদিন ধরে তীব্র জ্বরে ভুগছেন তিনি। ডেঙ্গু হয়েছে মনে করে রামপুরায় বাসার কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেখানকার চিকিৎসকরা ওই রোগীকে ঢাকা মেডিক্যালে স্থানান্তর করে দেন।

সন্ধ্যা ছয়টা ১০ মিনিট

নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিকেলে এসেছেন মীম। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের পর এখন চাকরির জন্য পড়াশুনা করছেন। এর মধ্যেই হঠাৎ ডেঙ্গু হলো তার। গত চারদিন ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছেন। পাশে থাকা তার মা বললেন, ‘ডাক্তার টেস্ট দিয়েছিল ‍দুটো। একটা ইউরিন টেস্ট। অন্যটি অ্যান্টিবডি ডেস্ট। ইউরিন টেস্ট নরম্যাল, এখন অ্যান্টিবডি টেস্টের রিপোর্ট কী হয় দেখা যাক। কাল সকালে দেবে, বলেছে।’

সন্ধ্যা ছয়টা ৩৭ মিনিট

আত্মীয়রা সবাই মিলে হারাধন পাল নামে এক বৃদ্ধ রোগীকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে টেস্ট করাতে গেলেন। শয্যায় কেবল বসে রইলেন তার সহধর্মিণী ঝর্ণা পাল। তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে তার জ্বর। বাসার কাছেই একটি হাসপাতালে ডেঙ্গু ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেরি না করেই ঢাকায় নিয়েছি তাকে। এখনও সুস্থ হতে পারেননি তিনি। ডাক্তার বলেছে, সময় লাগবে সুস্থ হতে।’

সন্ধ্যা সাতটা ১০ মিনিট

হারাধন পালের টেস্ট করানো শেষ। এরপর তাকে ধরে শয্যায় নিয়ে যান তার আত্মীয়রা। শয্যার কাছাকাছি আসতেই স্ত্রী ঝর্ণা পাল উঠে দাঁড়ালেন এবং স্বামীকে শয্যায় শোয়ান।

সন্ধ্যা সাতটা ২০ মিনিট

প্রিয়াংকা নামে ছয় বছর এক শিশু শয্যায় শুয়ে কাঁদছে। তার মা তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন। প্রিয়াংকার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাতদিন ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সে (প্রিয়াংকা)। এখনও সুস্থ হওয়ায় ভীষণ উদ্বিগ্ন তারা।

সন্ধ্যা সাতটা ৪৫ মিনিট

স্ট্রেচারে করে একজন প্রবীণ রোগীকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। হন্তদন্ত হয়ে ছুটছেন তার স্বজনরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনদিন আগে ওই ব্যক্তি ডেঙ্গু আক্রান্ত হন।

রাত আটটা ২০ মিনিট

চিকিৎসকের সিরিয়াল পেয়ে হাসপাতালে অপেক্ষা করেন স্বজনরা। রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। করছেন হাঁসফাঁস।

রাত আটটা ৪২ মিনিট

হাসপাতালের মেঝেতে গাদাগাদি হয়ে শুয়ে থাকেন রোগী ও স্বজনরা। কেউ অপেক্ষায় থাকেন টেস্ট রিপোর্টের, আবার কেউ অপেক্ষায় ডাক্তারের পরামর্শের।

ইত্তেফাক/এসকে