মেহেরপুরে দল গোছাচ্ছে বিএনপি, কোন্দলে আওয়ামী লীগ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩, ১৪:৩৬

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরহাদ হোসেনকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না দিতে আহ্বান জানিয়েছেন জেলার একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগ নেতা। এতে মেহেরপুরে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ পরিগ্রহ করেছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরহাদ হোসেনকে আগামী নির্বাচনে নৌকার প্রতীক না দেওয়ার দাবিতে জেলার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। মেহেরপুর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মিয়াজান আলীর সভাপতিত্বে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন নেতারা।

‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতে নিষেধ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নিষেধ অমান্য করে যারা মতবিনিময় সভার নামে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বক্তব্য রেখেছেন এর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’
- ফরহাদ হোসেন
প্রতিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সাংসদ, মেহেরপুর-১

এর প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন জেলা আওয়ামী লীগের ফরহাদ হোসেনপন্থী নেতারা।

জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে পাল্টা প্রতিবাদ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুস সামাদ বাবলু বিশ্বাস। পাল্টাপাল্টি দুই কর্মসূচিতে উভয় পক্ষের নেতারা একে অন্যের প্রতি বিষোদ্গার করে বক্তব্য দেন।

ছবি: ইত্তেফাক

পৌর কমিউনিটি সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে জেলা আওয়ামী লীগের শক্তিকে দুর্বলকারী দল ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিরোধী চক্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নৌকা প্রার্থীদের পরাজয়ের নীলনকশাকারী ও ছাত্র জীবনে ‘শিবিরের রাজনীতির’ অভিযোগ করা হয়।

আওয়ামী লীগে ত্যাগী ও শক্তিশালী নেতাদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ জানিয়ে মেহেরপুর পৌর মেয়র ও জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘দুঃসময়ে যারা মেহেরপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছে, হামলা হামলা হয়রানির শিকার হয়ে জেলা আওয়ামী লীগের ভিত মজবুত করেছেন। তাদেরকেই বাদ দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মুজিবনগরের জিয়া উদ্দিন, মেহেরপুরে গোলাম রসুলকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। তিনি অভিযোগ করে বলেন জনবিচ্ছিন্ন ও প্রতিমন্ত্রীর পকেটের লোক দিয়ে প্রতিটা কমিটি করা হয়েছে। আর কখনও দলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।’

ছবি: ইত্তেফাক

জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক এম এ এস ইমন বলেন, ‘জাতীয় উন্নয়নের পাটকে আপনি নিজের উন্নয়ন বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। আপনি দশ বছর দায়িত্ব পালন করছেন, ৫ বছর প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন অথচ আপনার দ্বারা মেহেরপুরের কোন উন্নয়ন হয়নি। আপনি বলেন মেহেরপুরের বেকার সমস্যার কোনো সমাধান আপনি করতে পারেননি। আপনি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর মেহেরপুরের মানুষ আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল কিন্তু আপনি সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘পৌর কলেজকে সরকারি কলেজ করতে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করিয়েছেন নাম পরিবর্তন করে ছহিউদ্দিন ডিগ্রি কলেজ করেছেন কিন্তু সরকারি করতে পারেননি।’

মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম রসূল বলেন, ‘আজকে যিনি এমপি হয়েছেন ‘১৪ সালে নমিনেশন পাওয়ার পরে আমরা তার ভোট করতে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের হাত-পা চেপে ধরেছিলেন বলেছিলেন ভাই আমাকে এমপি করেন আপনারা যা বলবেন তাই আমি শুনবো। যাক ‘১৪ সাল চলে গেল ফের ‘১৮ সালে যখন নমিনেশন পেল তখন বলল ভাই প্রথমে আপনাদের কাছে মাফ চেয়ে নিচ্ছি। আমি ছোট মানুষ প্রথমে আমার ভুল হয়েছে তখনো তার হয়ে আমরা ভোট করেছি। ভোটে জেতার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে মন্ত্রী বানালো এর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। মন্ত্রী হওয়ার পর মেহেরপুরে যারা আওয়ামী লীগ করে যারা দুর্দিনে আওয়ামী লীগ করেছে তাদের উপর নির্যাতন করা শুরু করলো।’

ছবি: ইত্তেফাক

সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে মিয়াজান আলী বলেন, ‘২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন নেতাদের হাতেপায়ে ধরে ভোটের মাঠে নামিয়েছিলেন। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা নৌকাকে জয়লাভ করিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৪ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রধান এজেন্ট হয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ করে মাঠে নামিয়েছিলেন তার জয় নিশ্চিত করেছিলেন। অথচ নির্বাচনের পরে দলীয় নেতাকর্মীদের আর চিনতে পারেননি তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ‘১৪ সালের ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে আবারও তার সঙ্গে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। এবারও তাকে জেতাতে দলীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে মন্ত্রিত্বও দিয়েছেন। অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার পর সে কথা মনে রাখেননি তিনি। বিজয়ের পর পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছেন। মূল্যায়ন করেননি কোনো নেতাকর্মীকে।’

ছবি: ইত্তেফাক

মিয়াজানের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে পছন্দের মানুষ নৌকার মনোনয়ন না পাওয়ায় নৌকার বিপক্ষে ভোট করেছেন ফরহাদ হোসেন। তাই আগামীতে আমরা তাকে আর নৌকার প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাই না। তাকে বাদে জেলার যেকোনো নেতাকে নৌকার পক্ষে প্রার্থী করলে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাঁধে কাঁধ রেখে মাঠে কাজ করতে হবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জিয়াউদ্দীন বিশ্বাস বলেন, ‘ফরহাদ হোসেন যদি নৌকার প্রার্থী হয় তাহলে নৌকায় ভোট দেবো না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে বলে এসেছি। তাই সবাইকে এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম পেরেশানের সঞ্চলনায় মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রসুল, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়ারুল ইসলাম, সহ-সভাপতি আবদুল মান্নান, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জেমস স্বপন মল্লিকসহ আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতারা।

ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে কটূক্তি ও বিষোদ্গারকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বর্ধিত সভা করেছে জেলা আওয়ামী লীগের ফরহাদপন্থী নেতারা। মেহেরপুর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে এই বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এমপি। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতে নিষেধ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নিষেধ অমান্য করে যারা মতবিনিময় সভার নামে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বক্তব্য রেখেছেন এর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, জনতার স্বতঃস্ফূর্ত যে সংগ্রাম শুরু হয়েছে। যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা এই অবৈধ কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটাতে চাই। জনতার বিজয়কে সুনিশ্চিত করতে চাই’
- মাসুদ অরুণ
সভাপতি, মেহেরপুর জেলা বিএনপি ও সাবেক সাংসদ

এছাড়া, মেহেরপুরে বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসায় জন্য বিদেশ প্রেরণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ অনশন কর্মসূচি পালন করেছে জেলা বিএনপি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসায় জন্য বিদেশ পাঠানোর দাবিতে অনশন কর্মসূচি পালন করেছে জেলা বিএনপি।

ছবি: ইত্তেফাক

জেলা বিএনপির কার্যালয়ে প্রাঙ্গণে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুণের নেতৃত্বে এ অনশন কর্মসূচি পালন করা হয়।

অনশনে অন্যদের মধ্যে জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি জাবেদ মাসুদ মিল্টন, সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন, সহ-সভাপতি আব্দুর রহমান, উপদেষ্টা ইলিয়াস হোসেন, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ফারুক আহমেদ বিজন, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, মুজিবনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম, বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর বিশ্বাস, যুবদলের সভাপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আজিব জাভেদ সেনজির, সাধারন সম্পাদক  বিপ্লব হোসেনসহ জেলা বিএনপি ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনশনে মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুণ বলেন, ‘জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, জনতার স্বতঃস্ফূর্ত যে সংগ্রাম শুরু হয়েছে। যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা এই অবৈধ কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটাতে চাই। জনতার বিজয়কে সুনিশ্চিত করতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ জনতার বিজয় না হওয়া পর্যন্ত, মানুষের ভোটের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত, খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবেনা। একটি নিরাপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র জনতার লাগাতার এই গণতান্ত্রিক সংগ্রামই অবসান হতে পারে।’

এছাড়া মেহেরপুরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

ইত্তেফাক/এইচএ