আব্দুর রহমান
তখন আমি ক্লাস ফাইভে সমাপনী পরীক্ষা দিয়ে শেষ করলাম। ছুটিতে নানুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে পড়লাম এক বিপদে। নানু আর আমি সেদিন একসঙ্গে ঘুমিয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে জেগে বুঝতে পারলাম আমার পরনে লুঙ্গিটা নেই, তাই লেপ-কম্বল জড়িয়ে শুয়ে ছিলাম। নানু উঠে আমাকে বার কয়েক ডাক দিলেন, ‘এই দুলু উঠবি নাকি? দেখছিস না কত সকাল হয়ে গেছে।’
আমি তো পড়ে গেলাম মহাবিপদে! এই মুহূর্তে বলতেও পারছি না যে আমার পরনে লুঙ্গিটা নেই। আর নানুর সামনে লজ্জায় উঠতেও পারছি না। নানু বাইরে যাবেন ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাস থ্রিতে পড়া মামাতো বোন নেহা হুট করে ধপাস শব্দে আমার ওপরে এসে পড়ল, ‘ভাইয়া ওঠো না তাড়াতাড়ি, খেলতে যাব।’
আমি বললাম, ‘তুই যা, আমি একটু পরে যাচ্ছি।’
নানু ততক্ষণে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেছেন। এটাই সুযোগ, নেহাকে বাইরে বের করে দিয়ে আমি চট করে লুঙ্গিটা খুঁজে পরে নেব। কিন্তু নেহা যেন কোনো কথাই শুনছে না। ও আমাকে সঙ্গে নিয়েই বের হবে।
এরমধ্যে বাইরে থেকে আবারও নানুর জোর কণ্ঠে ডাক শুনতে পেলাম, ‘কখন থেকে নেহা ডাকছে, উঠতে পারিস না? উঠবি নাকি আমি গিয়ে লেপ-কম্বল সরিয়ে দেব।’
হায় হায়! কী মুসিবতে পড়লাম! নানু যাই করুক অন্ততপক্ষে এই কাজটা যেন না করে। আমি নেহাকে কোনোরকম বুঝিয়ে ওকে বাইরে বের হতে বললাম। যাক বাবা, বাঁচা গেল!
আমি উঠব উঠব, ঠিক সেই মুহূর্তে আম্মু এক পাল মহিলা নিয়ে এসে আমার কাছে হাজির। ইসস্! এ দেখছি বিপদের ওপরে মহাবিপদ। এ মুহূর্তে মনে হলো আমার মতো বড় বিপদে হয়তো কেউ কোনো দিন পড়েনি। নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো।
আম্মু মহিলাদের বললেন, ‘এই হলো আমার ছেলে দুলু।’
আমি মহিলাদের দিকে তাকালাম, কোনোদিন দেখিনি এদের। একটা মহিলাকেও চিনতে পারলাম না। কোনো একজন মহিলা বলে উঠলেন, ‘তো এখনো শুয়ে আছ কেন বাবু, ওঠো তো তোমাকে দেখি।’ পাশ থেকে আরেকজন মহিলা বললেন, ‘সেদিনকার ছেলে কত্ত বড় হয়ে গেছে তাই না!’ ‘ওরে বাবা এখন এত প্রশংসা শোনার দরকার নাই আমার, সবাই একটু বাইরে যান না প্লিজ!’ মনে মনে বললাম আমি।
আম্মু মহিলাদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘এরা সবাই তোমার খালামণি হবে, আমার ছোটকালের বান্ধবী, একসাথে অনেক খেলাধুলা করেছি আগে। কয়েক বছর পর গ্রামে এল এরা।’
আমি মনে মনে বিরক্ত হলাম, ‘পরিচয় পর্বের আর সময় পেল না!’
‘আম্মু তোমরা বাইরে যাও আমি একটু পরেই আসছি।’ মুখে বললাম আমি।
মোটা একটা মহিলা বললেন, ‘এখনি ওঠো তো বাবু, তোমাকে দেখার জন্যই তো আমরা এলাম।’ বলে তিনি লেপের একটা অংশ উঁচু করতে চাইলেন। এ দেখছি আরেক ডাইনি, সময়-অসময় বোঝে না, যখন যেটা মন চায় সেটাই করে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই লেপের উঁচু করা অংশ চাপ দিয়ে কাছে টেনে নিলাম।
আম্মু বললেন, ‘ভীষণ লাজুক তো, তাই এমন। তোরা আয়, পরে দেখিস আমার ছেলেকে।’ বলে তিনি মহিলাদের বাইরে নিয়ে গেলেন। গেলেন ভালো কথা, কিন্তু দরজাটা খোলা রেখেই গেলেন। আরেক মুসিবত। এ অবস্থায় যদি আমি উঠে লুঙ্গি খোঁজার অভিযান চালাই তাহলে দরজা দিয়ে যে কেউ দেখে ফেলতে পারে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই আম্মুকে ডাক দিলাম। আম্মু কাছে এলে বললাম, ‘আসলে আমার পরনে লুঙ্গিটা নাই আম্মু। খুলে কোথায় যে পড়ে গেছে কে জানে। তাই তখন উঠিনি আমি।’
আম্মু হাসলেন। আমি আবারো বললাম, ‘তুমি বাইরে গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দাও। আমি লুঙ্গি খুঁজে পরছি।’
আম্মু তাই করলেন। বাইরে দরজার সামনে দারোয়ানের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি লেপ-কম্বল সরিয়ে লুঙ্গি খুঁজতে লাগলাম। দেখি খাটের নিচে এক কোনায় লুঙ্গিটা পড়ে আছে। মানুষ মহামূল্যবান কিছু দেখতে পেলে যেভাবে কুড়িয়ে নেয়, আমিও ঠিক সেভাবে লুঙ্গিটা কুড়িয়ে নিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে পরলাম। উফ্! যাক বাবা বাঁচা গেল! স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললাম।
তারপর মনে মনে বললাম, ‘এবার আয় কে কে পরিচয় হবি আমার সাথে।’
হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, দিনাজপুর সরকারি কলেজ।
