কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৯, ২০:৩৯

আহাদ আদনান

 

ক’দিন ধরেই ভাবছি এই বিশ্বকাপ নিয়ে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস, ভাইরাল ভিডিও বা কলাম দিয়ে সব ফাটিয়ে দেব। কিন্তু মনের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে কিছুই করিনি। একদিন খেলা চলাকালীন ‘ভাগ্নে, বাংলাদেশ কয় গোল দিল রে?’ বলার পর মজনু যেভাবে বলল, ‘ধুর মামা, তুমি ক্রিকেট আর ফুটবল কী জিনিস, তা-ই বোঝ না, আবার বেশি কথা বল!’ এরপর থেকেই ঠিক করলাম আমি কিছুই বলব না। কিন্তু অর্ধেক বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেল, অথচ সব চলছে উল্টাপাল্টা। আজ একটা কলাম লিখতেই হচ্ছে।

এই বিশ্বকাপের নাম দিয়েছি ‘কিচ্ছু ঠিক হয় নাই’ বিশ্বকাপ। যেমন, ওদের মাঠ বানানোই তো হয়নি। বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে, অথচ মাঠে জাল কই? ধর, সাকিব একটা উইকেট পেয়ে দৌড়ে জাল জড়িয়ে বলবে ‘গোল! গোল!’ তাহলেই না মজা জমবে।

খেলার আসল মজা হয় বৃষ্টির সময়। বৃষ্টির দেশে খেলা হচ্ছে, আমি খুব খুশি। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই সবাই খেলা বন্ধ করে চলে যায়, এটা স্রেফ গাধামি। আর আম্পায়ারের মুখে বাঁশি কই? কোনো ফুঁকের শব্দ শুনি না কেন? আর খেলাটা আরো সুন্দর হতো চারকোনা মাঠে খেললে। কেমন গোল মাঠ, আসলে গোলও তো না। ল্যাংড়া আমের মতো একদিক কুঁচকে থাকে। এই জন্যই বলেছিলাম, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে তোমরা খেলা দিও না। আজকালকার ছেলে-ছোকরা মুরব্বিদের কথা শুনবে কেন!

এইবার আসি আমাদের দল নিয়ে। তোমরা এটা কী দল বানিয়েছ? না বুঝলে আমার মতো বিশেষজ্ঞদের তো জিজ্ঞেস করবে। কোন হিসাবেই এটা দল হয়নি। আসো, চোখে আঙুল দিয়ে ভুল ঠিক করে দিই।

তামিম তো খেলা ভুলে গেছে। খালি ঠুকঠুক করে। একবার ওকে ‘ম্যাগি নুডলস’ খেতাব আমিই দিয়েছিলাম। এবার নাম দিলাম ‘বিটিভির আটটার খবর’। না, ওকে নেওয়া ঠিক হয়নি।

আর সৌম্য এত পিটিয়ে খেলে কেন। একটু দেখে না খেললে তো দল নিয়া ডুববে! এত উথালপাথাল খেলোয়াড় নিয়ে ঠিক করেনি নির্বাচকরা।

সাকিব তো বেয়াদব। আমার এক ভাগ্নির সাথে ওরে বিয়ে দেব ভাবছিলাম। তখন থেকে ও কী খায়, কী করে, কিভাবে কথা বলে, মুরব্বিদের সম্মান করে কি না, কিভাবে ভাত খায়, গোসলে কী সাবান মাখে, ফেসবুকে আমার স্ট্যাটাসে লাইক দেয় কি না, এসব নিয়ে আমার ব্যাপক গবেষণা। আমার ভাগ্নিকে বিয়ে না করে করল কোন এক শিশিরকে। সাকিব বেয়াদব, মহা বেয়াদব! ওরে এখনই বাদ দিয়ে দাও। আর ও এত রান করে তো নিজের জন্য। দলের কথা কিচ্ছু ভাবে না। একেবারে সেলফিশ। আমার মতে যারা ক্রিজে নেমেই গাধার মতো খেলতে যেয়ে নিয়মিত আট-দশ গড়ে রান করে, তারাই দলের জন্য খেলে। অনেক দিনের উপোসীদের যেমন কাচ্চি বিরিয়ানি হজম হয় না, আমার মতো হাড়-হাভাতে সমর্থকদের জন্য বিশ-পঁচিশ রানই ঠিক। নিয়মিত রান করলেই তাকে সেলফিশ বলে সন্দেহ করতে হবে।

আর মুশফিক তো ইমোশনাল ফুল। আরে বেটা, খেলায় এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে? নিজের কথা চিন্তা করতে হবে। দল গোল্লায় যাক। ও বেশি দেশপ্রেমিক। ওকেও বাদ দিতে হবে।

মিঠুনকে তোমরা কেন নাও বলো তো? ও তো আমার ফ্রেন্ডলিস্টেই নেই। মোসাদ্দেক, সাইফুদ্দিনকেও আমি ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম। অ্যাকসেপ্ট করেনি। তিনটাকেই বাদ দিতে হবে।

রিয়াদ তো কোনো কথাই কয় না। খেলোয়াড় বলতে আমি বুঝি নয়ন মোঙ্গিয়া বা রশিদ খান। সারাক্ষণ পাকনার মতো পকপক করতে হবে। কিংবা কোহলির কুকুরের স্টাইলে জিহ্বা বের করে পোজ দিতে হবে। রিয়াদ, লিটন, জায়েদ, মেহেদির মতো চুপচাপ খেলোয়াড় অবশ্যই বাদ দিতে হবে।

সাব্বিরকেও বাদ দিয়ে দাও। বেশি পকপক করে। খেলোয়াড় হতে হবে ঠাণ্ডা, চুপচাপ। ওরে ভেবে রেখেছিলাম আমার এক ভাস্তির বিয়ের জন্য। না করে দিয়েছে। পরে বলেছিলাম রুবেলকে। দুইটাই মহা বেয়াদব। আমার পারফরম্যান্স দরকার নেই, ভদ্রতা দরকার। অভদ্র খেলোয়াড় বাদ।

মুস্তাফিজের তো বলের ধার নেই। প্রতি ম্যাচে পাঁচটার কম উইকেট হলে আমি মানতে রাজি নই। (যদিও আমার পছন্দের অনেক বোলার পুরো ক্যারিয়ারেই পাঁচটা উইকেট পায়নি)। বাদ, তুমিও বাদ।

মামা, তোমার কথা বলিনি বলে খুশি হওয়ার কিছু নেই। তুমি তো পালের গোদা। কিন্তু ফিটনেস তো কিছুই নেই। তোমাকে শিখতে হবে অজিত আগারকার (জীবনে যে একবারও দলে পার্মানেন্ট হতে পারেনি), আকাশ চোপড়া (মনে হয় খোখো খেলত নাকি ক্রিকেট খেলত?), রমিজ রাজা (দলে ঠিকমতো চান্সই পেত না), মায়ান্তী ল্যাঙার (রান্না কেমন করে জানি না, কিন্তু ভালো ম্যাচ জ্বালাতে পারে), সনজয় মানজরেকার (ভারতীয় দলের সর্বকালের সেরা টুয়েলভ ম্যান) এদের কাছ থেকে। দেশে এসে আমার পরামর্শমতো অবসর নাও।

এইজন্যই বলেছি, এই বিশ্বকাপের নাম ‘কিচ্ছু ঠিক হয় নাই’ বিশ্বকাপ। দিন ছিল আমাদের সময়। বিশ্বকাপে সুযোগই পেতাম না। মনের আনন্দে নিশ্চিন্তে খেলা দেখতাম। কিংবা চান্স পেলেও ‘সম্মানজনক’ভাবে হেরে যেতাম। কিংবা জিততাম পাঁচ বছরে একবার। এত নিয়মিত জিতলে জয়ের মর্ম বোঝা যায়! কেন এত ধারাবাহিক হতে হবে? এত পেশাদারিত্বের কী দরকার?

কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না। কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না।