দেশবাসীর ভালোবাসার পুরস্কার, বিসিবির অবজ্ঞার জবাবও

যোদ্ধা মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩, ১৪:৩৭

ভারতের মাটিতে ২০২৩ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৯২ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটের জয়ে। বোলিং, ব্যাটিং- দুই বিভাগেই একচ্ছত্র দাপট দেখিয়ে বাংলাদেশ বার্তা দিয়েছিল বিশ্বকাপে এমন কিছু করার, যা আগে কখনোই অর্জিত হয়নি। কিন্তু সেই বাংলাদেশ এখন বিধ্বস্ত এক শিবির। দাপুটে জয়ে শুরুর পরের চার ম্যাচেই অসহায় আত্মসমর্পণ, বাংলাদেশ দলের সামর্থ্যকে ঠেলে দিয়েছে প্রশ্নের মুখে। প্রশ্নের মুখে দেশের ক্রিকেটারদের সামর্থ্যও। দলের সবার ব্যর্থতার মধ্যে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম শুধু দুজন- মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুই ভায়রা ভাই। এই দুই জনের মধ্যে আবার উজ্জ্বলতায় এগিয়ে মাহমুদউল্লাহ, যাকে বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়ার প্রশ্নে পাড়ি দিতে হয়েছে শঙ্কার সাগর। পরীক্ষিত সৈনিক হয়েও দিতে হয়েছে দলে জায়গা পাওয়ার ‘পরীক্ষা’! বিশ্বকাপের বছরে হুট করেই ‘বিশ্রামের’ নাম করে মাহমুদউল্লাহকে ছিটকে ফেলা হয় দল থেকে।

মার্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পর সেই যে তাকে ‘বিশ্রাম’ দেওয়া হয়, সেই বিশ্রামের চাদরে আটকে পড়া মাহমুদউল্লাহ খেলতে পারেননি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হোম ও অ্যাওয়ে সিরিজ, আফগানিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজ ও এশিয়া কাপ।

দেশের ক্রিকেটামোদী দর্শক মাহমুদউল্লাহকে দলে ফেরানোর দাবিতে বিক্ষোভ-মানববন্ধন পর্যন্ত করেছে। কিন্তু সেই দাবি বিসিবির কর্তা ও নির্বাচকদের ভাবনার টনকে সাড়া ফেলতে পারেনি। দলের সিনিয়র তথা ‘বুড়ো’দের তাড়ানোর যে স্লোগান তুলেছে ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিসিবি, মাহমুদউল্লাহর দীর্ঘ ‘বিশ্রাম’ সেই পরিকল্পনারই যে অংশ ছিল, তা বোর্ড কর্তাদের কথাবার্তায়ও স্পষ্ট হয়েছে।

বিসিবির অন্যতম সক্রিয় পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন তো সরাসরিই বলে দেন, মাহমুদউল্লাহ এখনও কেন অবসর নিচ্ছেন না, সেটা তিনি বুঝতেই পারছেন না! ফলে পরিস্থিতি এমনটাই রুদ্ধশ্বাসের হয়ে উঠেছিল যে, অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহকে বিশ্বকাপ দলেও নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও বড় শঙ্কা জেগে উঠেছিল। মাহমুদউল্লাহ সেই শঙ্কার নদী পাড়ি দিয়েছেন বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে নেওয়া বিসিবি কর্তা-নির্বাচকদের ‘আঁতশ কাচের পরীক্ষা’ দিয়ে। ব্যাট হাতে দৃঢ়তাপূর্ণ ব্যাটিং তো ছিলই, পাশাপাশি বিশ্বকাপ দল থেকে তামিম ইকবালের বাদ পড়ার কাণ্ডও হয়তো মাহমুদউল্লাহর দলে ডাক পাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখে থাকবে!

তা পেছনে আর যে কারণই থাকুক, মাহমুদউল্লাহ নিজ যোগ্যতার পরীক্ষায় পাশ করেই জায়গা করে নেন বিশ্বকাপ দলে। সেই মাহমুদউল্লাহই বিশ্বকাপে দলের চরম ব্যর্থতার গল্পেও লিখে চলেছেন এক লড়াকু যোদ্ধার মাথা উঁচু করে লড়াইয়ের রূপকথা। বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত দলের বাকিদের যা পারফরম্যান্স, মাহমুদউল্লাহর লড়াকু ব্যাটিং রূপকথাই যেন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে একাদশে থাকলেও ব্যাট হাতে মাঠে নামার সুযোগ মেলেনি।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে একাদশ থেকেই ছিটকে ফেলা হয় তাকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে একাদশে ফেরানো হয় বটে; তবে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ব্যর্থতার পরও অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহকে ব্যাটিংয়ে পাঠানো হয় লোয়ার অর্ডারে, ৮ নম্বরে! কিন্তু ওই অবস্থায় নেমেও স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে খেলেন ৪১ রানের অপরাজিত ইনিংস।

মাহমুদউল্লাহর মতো অভিজ্ঞ-পরীক্ষিত একজনকে কেন ৮ নম্বরে খেলানো হয়, তা দেখে হতবাক বিদেশি ক্রিকেট বোদ্ধারাও। তুলেন প্রশ্নও। কিন্তু বিদেশি ক্রিকেট বোদ্ধাদের সেই সমালোচনাও বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের কর্ণপাত করাতে পারেনি। ভারতের বিপক্ষে পরের ম্যাচেও তাই দলের ব্যাটিং ব্যর্থতার মিছিলেও তাকে নামানো হয় ৭ নম্বরে! কিন্তু যোদ্ধার কাজই তো যুদ্ধের সুযোগ যেখানেই হোক, সেখান থেকেই যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া। ভারতের বিপক্ষেও মাহমুদউল্লাহ নিজের যুদ্ধে জয়লাভ করেন ৭-এ নেমেও ৪৬ রানের ইনিংস খেলে। আর পরশু মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তো কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছেন মাহমুদউল্লাহ।

৩৮৩ রানের অসম্ভব লক্ষ্য তাড়ায় নেমে ৪২ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয় বাংলাদেশ দল। এই অবস্থায় এক ধাপ প্রমোশন পেয়ে ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নামেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু উইকেটে তিনি থিতু হওয়ার আগেই মুশফিকুর রহিম, মেহেদী হাসান মিরাজও আউট। ৮২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে খাদের কিনারায় পৌঁছে যায় দল। বাকি ৪ উইকেটে দল আর কতটুকু এগোতে পারবে! বরং ১০০’র আগেই অলআউট হয়ে যাওয়ার শঙ্কাই তখন প্রবল। কিন্তু ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধ বাতাসে দাঁড়িয়ে মাহমুদউল্লাহ ভাবছিলেন অন্য কিছু।

দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অনেক বারই দলকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে বাঁচিয়েছেন, আর একবার কেন নয়! মাহমুদউল্লাহ নিজের সেই পরিকল্পনায় অবিশ্বাস্যভাবে সফল। লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের নিয়ে লড়াই করে ১০০’র আগেই গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কাঁপতে থাকা বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন ২৩৩ রানের ঠিকানায়। নিজে করেছেন সেঞ্চুরি। খেলেছেন ১১১ রানের ইনিংস।

এই পথে নাসুম আহমেদকে নিয়ে সপ্তম উইকেটে ৪১, হাসান মাহমুদের সঙ্গে অষ্টম উইকেটে ৩৭ এবং মুস্তাফিজের সঙ্গে নবম উইকেটে ৬৮ রানের জুটি গড়েন মাহমুদউল্লাহ। পরশু সেঞ্চুরি করে মাহমুদউল্লাহ দলকে জেতাতে পারেননি, দলের পরাজয়টাই শুধু কিছুটা ছোট করতে পেরেছেন। তবে প্রতিকূল স্রোতে দাঁড়িয়ে যেভাবে লড়াই করেছেন, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তাছাড়া, মাহমুদউল্লাহ গড়েছেন বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপ মঞ্চে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির রেকর্ডও।

এ নিয়ে বিশ্বকাপে তিনটি সেঞ্চুরি হলো তার। বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসানের দুটি সেঞ্চুরি। মুশফিক করেছেন একটি। মানে বিশ্বকাপ মঞ্চে বাংলাদেশিদের সেঞ্চুরি মাত্র ছয়টি, তার তিনটিরই মালিক টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনায় বাতিলের খাতায় পড়ে যাওয়া মাহমুদউল্লাহ। বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরির রেকর্ডটিও তার দখলেই। এমনকি বিশ্বকাপে বাংলাদেশিদের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংসের মালিকও তিনি। ২০১৫ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিলেন অপরাজিত ১২৮ রানের ইনিংস।

পরিশেষে বলা যায়, ভারত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল ব্যর্থতার অন্ধকার গলি দিয়ে হাঁটলেও মাহমুদউল্লাহ বিজয়ী। নতুন করে জিতে নিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের মন। তিন ম্যাচেই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ৪১*, ৪৬ ও ১১১ রানের ইনিংসই সে কথা বলছে। তাকে দলে ফেরানোর দাবিতে যারা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছিল, মাহমুদউল্লাহর এই সাফল্য, এই সেঞ্চুরি যেন সেই সব দর্শকেরই ভালোবাসার প্রতিদান-পুরস্কার। বিসিবির অবজ্ঞার জবাবও!

ইত্তেফাক/জেডএইচ