সাকিব কী পারবেন বিতর্ক মুছতে

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৩, ১৩:২১

বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স যতটা সমালোচনা ছড়িয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি সমালোচিত অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তার ক্যারিয়ারে যত অনিয়ম তিনি করেছেন, তা দেখেও দেশের কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্ত সাকিবকে ভালোবেসে গেছেন। সেই  সব মানুষ আজ সাকিবকে সমালোচনা করতে গিয়ে ভান্ডার খুলে বসছেন। বলছেন, সাকিব কী এমন রসগোল্লা! লজ্জার কথা! অপমানের কথা! সাকিব এই লজ্জার কথা শুনেছেন কি না, জানা নাই। 

অপমানের কথা শুনেছেন কি না, জানা নাই। তবে যেভাবে ফেসবুকে সাকিবকে তুলোধুনো করা হচ্ছে, তা নিশ্চয়ই নিজেদের মুঠোফোনে একটু হলেও দেখেছেন। সাকিব যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স করছেন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে গেছেন। যদি বাংলাদেশ ভালো পারফরম্যান্স করত, তাহলে হয়তো ইডেন গার্ডেনসের গ্যালারিতে বাংলাদেশের সমর্থক রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে নিজের গালে জুতা মারতেন না। জুতা মারার ঘটনা ছোট্ট একটু ঘটনাই নয়, এটা প্রতীকী অর্থেই সারা দেশের মানুষের মনের ক্ষোভ-কষ্ট-বেদনার ছবি।

বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে সাকিবকে নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। সাকিব যখন এক সাক্ষাত্কারে বলে দিলেন তামিম ইকবালকে প্রয়োজন আছে কি না। খেলার দিন সকালে আমি জানতে পারব কে আছে, কে নেই। এভাবে তো হয় না।’ কথা ঠিক। সবাই মেনে নিয়েছিল। যখন বেরিয়ে এলো বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের বাসায় বসে কোচ হাথুরুসিংহে, সাকিব ও পাপন মিলে নির্ধারণ করলেন তামিম বিশ্বকাপে থাকবে না। 

তামিমকে বাদ দেওয়ার পেছনের কারিগর কারা, সেটা দেশের মানুষ জেনে গেল। তাতেও দেশের মানুষ সাকিবকে কাঠড়ায় দাঁড় করায়নি। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হেরে অনেক প্রশ্নের জবাব এক-আধটু করে সাকিবের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাহলে কেন তামিম বাদ পড়লেন, তামিমকে বাদ দিতে কারা ষড়যন্ত্র করল, সেটা পরিষ্কার হয়ে গেল। দল খেলতে গেল, একাদশ সাজাতে গিয়ে কোচ হাথুরুসিংহে ও সাকিবেরা আরও সমালোচিত হলেন। আবারও সেই তামিমের অনুপস্থিতি অনুভব করল কোটি দর্শক।

ইনজুরি নিয়ে খেলা যায় না। বিশ্বকাপে ইনজুরি নিয়ে খেলতে যাওয়া যায় না। সাকিব নিজেই যখন ইনজুরিতে পড়লেন, দলকে ফেলে রেখে দেশে ফিরলেন। প্রিয় কোচের কাছে পরামর্শ নিয়ে গেলেন। পরদিনই সাকিব আরও বাজে পারফরম্যান্স করলেন। ৫ বলে ১ রান করলেন। সাকিব খেলতে পারলেন না, তা দেখে একসময় দেশের কোটি ভক্ত বুকে কষ্ট অনুভব করতেন। সেই ভক্তরা এখন সাকিবের ব্যর্থতা দেখে উল্লাস করেন। সেই ভক্তরা সাকিবকে দেখে ভর্ত্সনা করছেন। খুব বাজে বাজে ভাষায় কথা বলছেন। অথচ সাকিব তার ক্যারিয়ারে যত ভুল-ভ্রান্তি করেছেন, এই ভক্তরাই সাকিবকে বুকে আগলে রেখেছিলেন।

ক্রিকেট-ভক্তরা বিশ্বাস করেন, সাকিবের আচরণে কখনোই মনে হয়নি তিনি দেশের প্রতি দায়বদ্ধ। তার ক্যারিয়ারে যেসব ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, সাকিবের সেই সব আমলনামা দেখলে হতাশায় ডুবতে হয়। কি না করেছেন সাকিব? দলের শৃঙ্খলা সবার জন্য এক রকম, সাকিবের জন্য আরেক রকম। সাকিব কখনোই শৃঙ্খলা মেনে চলতেন না। বিশ্বকাপে দল যাবে, মিরপুরে ফটোসেশনে নেই সাকিব। বিসিবির বস পাপনকে জানিয়ে দেন, আসছেন না। 

পাপন তখন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘ফটোসেশনে সাকিবের অনুপস্থিতি সত্যিই দুঃখজনক। আমি মিরপুর স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় সাকিবকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোথায়? ও বলল, আমি তো চলে এসেছি। আপনার বাসায় আসব রাতে। আমি বললাম, কেন? এখনই তো দেখা হবে। ও বলল, না, আমি বেরিয়ে গেছি। আমি পরে জানতে পারলাম যে সাকিবকে আগেই বলা হয়েছিল, আজ দলের ফটোসেশন হবে। জাতীয় দল বিশ্বকাপে যাচ্ছে, তাই সবার সঙ্গে সাকিবকেও ফটোসেশনে দেখার আশা করেছিলাম। কিন্তু সে ছিল না।’ 

আর এবারের বিশ্বকাপের ফটোসেশন বিমানবন্দরে ছিল, ফটোসেশন শেষ হওয়ার পথে, তখন দৌড়ে এসে যোগ দিলেন সাকিব। ড্রেসিং রুমে বসে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে শাস্তি ভোগ করেন। লিগের খেলায় স্টাম্প লাথি মেরে ভেঙে ফেলেন। আম্পায়ার ভুল করতে পারেন। সেটা নিয়ে ক্লাব প্রতিবাদ করবে। কিন্তু খেলোয়াড় কখনো স্টাম্পে লাথি মারতে পারেন না। নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন বিসিবির সিদ্ধান্তে। দলের খেলা চলাকালীন বিজ্ঞাপন করতে যাওয়া, দোকান উদ্বোধন করতে যাওয়া, খেলার চেয়ে টাকার পেছনে ছোটা ছিল সাকিবের স্বাভাবিক ছন্দ। দলের সঙ্গে না ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া। যখন-তখন ছুটি নিয়ে চলে যাওয়া। ইচ্ছে হলে এলাম, ইচ্ছে না হলে এলাম না। এই সিরিজ খেলব, ঐ সিরিজ খেলব না। বিশ্রামের দরকার বলে ছুটি। খেলতে না গেলেও বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে টাকা কামাতে ব্যস্ত ছিলেন। খেলার কারণেই সাকিবের দাম। অথচ খেলার চেয়ে টাকার পেছনে ছোটেন তিনি। দেশের মানুষের কাছে সাকিবকে নিয়ে একটা প্রশ্ন—কত টাকা চাই তার?

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আইসিসি দুই বছরের জন্য সাকিবকে নিষিদ্ধ করেছিল। আইসিসির এন্টিকরাপশন কোড ভঙ্গ করেছিলেন তিনি। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়ে গোপন রেখেছিলেন। ২০১৮ সালের ঘটনা, সেটি অনেকভাবে তদন্ত করে আইসিসি সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, এক বছর খেলতে পারবেন না। যদি সাজার শর্ত মেনে চলতে পারেন, তাহলে ১৮ অক্টোবর ২০২০ সালে মাঠে নামতে পারবেন। সাকিব তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মেনে নিয়েছিলেন।

বলেছিলেন, ‘আমার নিষেধাজ্ঞার জন্য আমি দুঃখিত, আমার বিরুদ্ধে আনা দায় আমি মেনে নিয়েছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইসিসির যে অবস্থান, সেখানে আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।’ এত বড় অন্যায় করেও তখন পার পেয়ে গিয়েছিল। দেশের সঙ্গে বেইমানি করলেও সাকিবকে তখন বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল দেশের ক্রিকেট-পাগল মানুষ। সে সময় ক্রিকেটের বাজারে সবার মুখে মুখে ভাসছিল—সাকিবের সঙ্গে জুয়াড়িদের হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়েছিল। 

কিন্তু সাকিব সেগুলো বিসিবিকে জানাননি। বাফুফের হিসাবপত্রে গরমিল থাকায় সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগকে নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। একই সঙ্গে বাফুফেও সোহাগকে বাড়তি শাস্তি দেয়। আইসিসি সাকিবকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করলে বিসিবি আর কোনো বাড়তি শাস্তি দেয়নি। এত ভালোবাসা পাওয়া সেই সাকিব এত সমালোচনা তৈরি করেছেন যে, আজ তাকে আর কেউ মাথার মুকুট বানাতে চান না। ক্রিকেট-পাগল মানুষগুলো এবারই প্রথম সাকিবকে ঘৃণা করল। সাকিব কি পারবেন তাকে নিয়ে হওয়া সব বিতর্ক মুছতে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ