জাহিদ হাসান
একের পর এক ঘটনার পরিক্রমায় কেন জানি মনে হচ্ছে যুব সমাজের একটি অংশের অবস্থা আজ পালহীন নৌকার মতো। প্রবল স্রোতের নদীতে নৌকাকে সঠিক গন্তব্যে নেওয়ার জন্য যেমন নৌকার পাল দরকার তাদের অধঃপতনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বারংবার মনে হচ্ছে দেশের বর্তমান যুবারা যেন এই পালহীন নৌকা। তাদেরকে কোনোভাবেই যেন সঠিক পথে রাখা যাচ্ছে না। তবে একথা বলে রাখা আবশ্যক যে, দেশের সব যুবক-যুবতীই যে পালহীন নৌকার মতো অতলে তলিয়ে যাচ্ছে এমনটা নয়, তবে সে পথ ধরে চলার সংখ্যাই বেশি। তাই এটি ধরেই নিতে হবে যে যুব সমাজের মধ্যে অধঃপতনের ভয়াবহ রূপ দেখা দিয়েছে। আর বিগত কয়েক বছর ধরে চলমান কিছু ঘটনার গভীরতা যুব সমাজের অধঃপতনের ভয়াবহ রূপকে আরো কঠিনভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা শহরের কলেজ সড়কের ক্যালিক্স কিন্ডার গার্টেনের সামনে প্রকাশ্যে কোপানো হয় রিফাত শরীফ নামে এক যুবককে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, রিফাত শরীফকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছে কয়েকজন। তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার তা ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কিছুতেই হামলাকারীদের থামানো যায়নি। তারা রিফাত শরীফকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যায়। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে রিফাত শরীফের মৃত্যু হয়। জানা যায়, আয়েশাকে বিয়ে করা নিয়ে নয়নের সঙ্গে রিফাত শরীফের দ্বন্দ্ব চলছিল। এমনকি রিফাতের সঙ্গে আয়েশার বিয়ের পর থেকেই নয়ন দাবি করে আসছিল আয়েশা তার স্ত্রী। এ কারণে রিফাত শরীফ প্রতিদিন আয়েশাকে কলেজে পৌঁছে দিতেন। স্ত্রীকে কলেজে দিয়ে ফেরার পথে হামলার শিকার হন রিফাত শরীফ। প্রশ্ন ওঠে- একজন মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করার জন্য এটাও কী একটা কারণ হতে পারে? এসবই কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। যুব সমাজের শিল্প-সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। দিনকে-দিন কেমন যেন ভয়ানক হয়ে উঠছে এ যুব সমাজ।
যুব সমাজকে বিপথে পরিচালিত করার জন্য আকাশসংস্কৃতির রগরগে ছবি, পর্নোগ্রাফি, সমাজ ব্যবস্থা যতটুকু না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী যুবক-যুবতীদের অভিভাবকরা। গোটা দেশের কথা বাদ দিয়ে যদি বিভিন্ন শহরের বর্তমান যুব সমাজের উন্মাদনার দিকগুলো তুলে ধরা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, সে চিত্রটা আমাদের ভাবিয়ে তোলার পক্ষে যথেষ্ট। শহরের বিভিন্ন অলিতে-গলিতে বা স্কুল-কলেজের প্রবেশপথে, রাস্তার মোড়ে কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা দেওয়ার পাশাপাশি বখাটেদের অবাধ বিচরণ দেখা যায়। কিন্তু এসব দেখে আমরা কেউ টুঁ-শব্দটিও করি না। অথচ যখন সে সমস্ত জায়গায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায় তখন আমরা দেশকে তথা সরকারকে ধুয়ে ফেলি। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এসব স্থানে আড্ডা দেওয়া যুবারাও কোনো না কোনো বাবা-মায়ের সন্তান। তাহলে আমি কেন অন্যের সন্তানকে শাসাতে গিয়ে দোষী হবো? যুক্তি ঠিক আছে। কিন্তু একবারও কী ভেবে দেখেছেন এসব আড্ডায় আপনার সন্তান বা আত্মীয়স্বজন আছে কিনা? আর থাকলেও বর্তমান সমাজের অভিভাবকদের মাঝে একটা প্রবণতা হলো আমরা কেউই নিজেদের সন্তানদের চলাফেরায় কোনো দোষ-ত্রুটি দেখি না বা দেখার চেষ্টাও করি না। শুধু তাই নয়, রিফাত শরীফকে কোপানোর যে ভিডিও ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে তার সঙ্গে আরো কিছু স্টিল ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। ছবিগুলোতে দেখা যায়, উক্ত বখাটেদের কোনো এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আয়েশার উপস্থিতি। এমন খবরও চাউর হয়েছে যে, আয়েশার সঙ্গে নাকি নয়নের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাহলে কথা হলো এই যে, মেয়েটি যখন বিয়ের আগে অন্য ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেল বা সম্পর্কে জড়ালো তখন পরিবারের কী ভূমিকা ছিল? অথচ বিয়ে দেওয়ার সময় তাকে টাকাওয়ালা বাবার একমাত্র সন্তানের হাতে পাত্রস্থ করা হলো। এমন আরো একটি প্রেমের ঘটনায় সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে খাদিজা আক্তার নার্গিস নামের এক ছাত্রীর ওপর হামলা করেছিল শাবিপ্রবির ছাত্র মো. বদরুল আলম।
যদিও অনেক অভিভাবক মনে করেন যে, যুব সমাজ অবশ্যই শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে ব্যস্ত থাকছে, তবে সেটা যে সুস্থ নয় তারা তা মানতে নারাজ। অসুস্থ সংস্কৃতির ছাপ থাকা সত্ত্বেও যুব সমাজ বেশি করে আগ্রহ দেখাচ্ছে আমদানিকৃত সংস্কৃতির দিকে। এটাকেই একশ্রেণির অভিভাবক এবং যুবক-যুবতী সঠিক সংস্কৃতি বলেই ধরে নিচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত আনন্দ করতে গিয়ে তারা যে সীমানা অতিক্রম করে ফেলছে এদিকে তারা বা তাদের অভিভাবকদের কোনো নজর নেই। এমনকি সন্তানদের এমন লাগামহীন জীবন-যাপনে বাধা দেওয়া তো দূরের কথা সাবধান করার কথাও তাদের মগজে আসছে না। এমনকি অনেক অভিভাবক সন্তানদের এমন আড্ডাবাজি বা জন্মদিনের অনুষ্ঠানের নামে মাত্রাতিরিক্ত আনন্দে মিলিত হওয়াকে নিজেদের সন্তানের স্মার্টনেসের বহিঃপ্রকাশ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। যুব সমাজ আজ যে অবক্ষয়ের পথ ধরে এগিয়ে চলছে তা অব্যাহত থাকলে আমাদের ভবিষ্যত্ যে কি হবে সে কথা বলা সত্যিই কঠিন।
n লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
