রোহিঙ্গা ইস্যুতে জঙ্গি তত্পরতা

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৯, ২১:৫৯

মাহমুদুর রহমান মানিক

গত কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি সংগঠন হচ্ছে আইএসআইএস বা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক সিরিয়া। ২০১৪ সালে আইএসআইএস আত্মপ্রকাশ করে সিরিয়া ও ইরাককে নিয়ে একটি ইসলামিক খেলাফতের ও ইসলামিক শরীয়া ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার অভিপ্রায় নিয়ে। তারা যে-পন্থায় ইসলামিক খেলাফতের জন্ম দিতে চেয়েছিল সেটা নির্দ্বিধায় মানবতাবিরোধী ও ন্যক্কারজনক। কিন্তু ফাঁদ স্বরূপ এই মোটিভটি কাজে লাগিয়ে তারা মুসলিম বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। বিশেষ করে তরুণরা তাদের মূল টার্গেট ছিল। এক সময় ইসলামের নামে বিপথগামী তরুণদের নিয়ে তাদের প্রশিক্ষিত সৈন্য সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি হয়েছিল। ন্যাটো, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সহায়তায় ২০১৭ সালে এই জঙ্গি গোষ্ঠীকে উত্খাত করা হলেও অনেকের মতে আইএসআইএস জঙ্গি সংগঠন সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়নি বরং তারা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং অন্য কোনো অঞ্চলকে ইরাক সিরিয়ার মতো ধ্বংসপুরিতে রূপান্তরের ছক কষছে।

যারা জঙ্গি সংগঠন নিয়ে গবেষণা করেন তাদের অনেকের মতে আইএসআইএসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেক্সট টার্গেট দুইটি জোন একটি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড এবং অন্যটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশ জোন। এ অঞ্চলে জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যকলাপের কিছু প্রমাণও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে ফিলিপাইনের মারাবি শহরে এছাড়া ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ার নাইট ক্লাবে হামলা এবং আইএসআইএস-এর দায় স্বীকার। বাংলাদেশেও ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে হামলা এবং অতিসম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় যে-জঙ্গি হামলা হয়েছিল সেটা প্রমাণ করে এ অঞ্চলে জঙ্গি সংগঠনগুলো তত্পর হওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সারাবিশ্ব আজ নিরব। রোহিঙ্গা ইস্যু শুধু বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের সমস্যা না এটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে পারে এ অঞ্চলের তথা বিশ্বের সমস্যা। উন্নয়নশীল একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় দশ লাখ শরণার্থী রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছে। আর শরণার্থী শিবিরে শিশু জন্মের হারও নিতান্ত কম নয়। নিয়মিত বাড়ছে তাদের সংখ্যা কিন্তু অন্যদিকে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোও দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে ফলে নিয়মিত সাহায্য সহযোগিতার যে আশ্বাস দিয়েছিল সেটাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে অনেকেই ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে এসে ছোটোখাটো ক্রাইম করছে অনেকে আবার নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রয়ে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই অপরাধ প্রবণতা ও দরিদ্রতার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে জঙ্গি সংগঠনগুলো। কারণ জঙ্গি সংগঠনগুলো বরাবরই দারিদ্র্য ও লোভনীয় কোনো মোটিভকে কাজে লাগাতে চায়। অভাব ও বেঁচে থাকার চেষ্টায় মানুষ যে-কোনো কাজ করতে পারে।

আল কায়েদা জিহাদের ডাক দিয়েছে আর সে ডাকে সাড়া দিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার ডানপন্থি দল ইসলামিক সংগঠন ফ্রন্ট পেমবেলা ইসলাম, তারা আরাকানে রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য সশস্ত্র সেনা পাঠাতেও প্রস্তুত। যা মিয়ানমার ছাড়াও আমাদের দেশের জন্যও ভয়ংকর সংবাদ। আরাকান রাজ্যে ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো সহিংসতা হলে আমাদের দেশেও সে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আইএসআইএস মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্খাত হয়ে রাখাইন রাজ্যে জিহাদ করার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে ফলে বাংলাদেশ মিয়ানমারের মধ্যে প্রায় ১৭০ কিলোমিটারের সীমান্ত হয়ে ওঠতে পারে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের অভয়ারণ্য। শুধু বিদেশি নয় দেশি জঙ্গি সংগঠনগুলোও পুনরুজ্জীবিত হয়ে ছোটো ছোটো মারণাস্ত্র ও নেশাদ্রব্য বিশেষ করে ইয়াবা স্থানান্তরে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে পারে। কিছুদিন আগে ঢাকায় ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গা আটক যেনো তারই আলামত। দেশে ফেরত বা স্বাধীন দেশ অর্জন এই মোটিভকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের বিপথগামী করতে পারে বিদেশি জঙ্গি সংগঠন আর পিঠে দেয়াল ঠেকা রোহিঙ্গারাও সহজেই এই মোটিভে ধ্বংসাত্মক যে-কোনো কাজ করতে পারে। এর ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া খুব স্বাভাবিক। আমরা চাই না কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে আমাদের এ অঞ্চলে জঙ্গি সংগঠনগুলো আগ্রাসন চালাক ও সোনার দেশকে মৃত্যুপুরিতে রূপান্তর করুক।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়