বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বেসরকারি আবাসন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন তথ্য চেয়েছে আপিল বিভাগ

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩, ১৬:৫৪

ঢাকার আশপাশে বেসরকারি সকল হাউজিং প্রকল্পগুলো কবে এবং কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় অনুমোদন পেয়েছেন তার বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মঙ্গলবার এই তথ্য দিতে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন। 

বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারপতি বোরহান উদ্দিন,  বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিপরীত দিকে হজ ক্যাম্পসংলগ্ন দক্ষিণখান থানার আশকোনা ও কাওলা এলাকায় অবস্থিত আশিয়ান সিটি আবাসিক প্রকল্প নিয়ে আপিল মামলার শুনানিকালে এই তথ্য চান দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মো. মোরসেদ। তিনি বলেন, এই ধরনের আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হচ্ছে রাজউক। আর আবাসন প্রকল্প করতে হলে উদ্যোক্তাদের শতভাগ ভূমিকর মালিক হতে হবে। প্রকল্প এলাকাটা নারায়ণগঞ্জ থেকে গাজীপুরের মধ্যে। এটা রাজউকের অধীনে।

শুনানির এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলির উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, বেসরকারি সব আবাসন প্রকল্পেই কী রাজউকের অনুমোদন আছে? যদি সেই অনুমোদন না থাকে তাহলে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন বলুন? একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেবেন, আরেকটির বেলায় নেবেন না সেই বৈষম্য করার সুযোগ আইনে নাই।

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলির উদ্দেশ্যে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, কোন কোন বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে রাজউকের চূড়ান্ত অনুমোদন রয়েছে সেটার নথি নিয়ে আসুন। আমরা এগুলো দেখতে চাই। কোন প্রক্রিয়ায় অনুমোদন হয়েছে সেগুলোও দেখতে চাই। শেখ মো. মোরশেদ বলেন, এই মূহুর্তে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারছি না। 

প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি সরকার পক্ষ। আপনার দায়িত্ব অনেক বেশি। শুনানিতে আশিয়ান সিটির কৌসুলি আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী ও আহসানুল করিম শুনানি করেন। 

শুনানিতে আহসানুল করিম বলেন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসকসহ সকল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এই প্রকল্প করা হয়েছে। এই প্রকল্পে সিএস, আরএস, এসএ রেকর্ড ও মহানগর জরিপ, ড্যাপ-২০১০ ও ২০২৩ অনুযায়ী এই প্রকল্পের কোন এলাকায় জলাভূমি নাই। কিন্তু আপিল বিভাগের আদেশে হাইকোর্টের রায় স্থগিত হওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আশিয়ান সিটি ও এর প্লট ক্রেতারা।

এই এলকায় বড় বড় হাউজিং প্রকল্পগুলোর যথাযথ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো কোন আইনি পদক্ষেপ নেয়নি।

আশিয়ানের কৌসুলি আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, ঢাকা সিটির পূর্ব পাশ ভরাট হয়ে গেছে। যারা হাউজিং প্রকল্প করেছে তারা তাদের প্লট বিক্রি করে ফেলেছে। কিন্তু আমি (আশিয়ান সিটি) যে তিমিরে আছি সেই তিমিরেই রয়ে গেছি। তিনি বলেন, মামলার রেকর্ডে যা আছে কোর্টকে সেটাই বিশ্বাস করতে হবে। নইলে এভিডেন্স দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, সবাইকে পথ দেখাতে গিয়ে আপনি নিজেই বিপদে পড়ে গেছেন। 

শুনানির এক পর্যায়ে রিটকারী সংগঠনগুলোর কৌসুলি ফিদা এম কামাল, প্রবীর নিয়োগী ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতি বলেন, এই মামলায় হাইকোর্টের রায়ের উপর আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ রয়েছে। এই স্থগিতাদেশ থাকার পরেও তারা প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে কী কোনো আদালত অবমাননার আবেদন নিয়ে এসেছিলেন।
তখন রিজওয়ানা হাসান বলেন, মাই লর্ড আমরা কোন পদক্ষেপ নেয়নি। প্রধান বিচারপতি বলেন, বেলা একটা সম্মানি প্রতিষ্ঠান। আপনাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিপরীত দিকে হজ ক্যাম্পসংলগ্ন দক্ষিণখান থানার আশকোনা ও কাওলা এলাকায় অবস্থিত আশিয়ান সিটি আবাসিক প্রকল্পকে অবৈধ বলে রায় দেন। বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদুল হক, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের দুইজন বিচারপতি ওই প্রকল্পকে অবৈধ বলেন।

আর একজন বিচারপতি রিট খারিজ করে প্রকল্পটি বৈধ বলে রায় দেন। এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশের পর আশিয়ান সিটি আবাসিক প্রকল্প কর্তৃপক্ষ রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রিভিউ আবেদন করে। এরই মধ্যে বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেন হাইকোর্টে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ না পাওয়ায় তিনি এখন আর বিচারপতি হিসেবে নেই। এ অবস্থায় ওই রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানির জন্য তৎকালীন প্রধান বিচারপতি পৃথক একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করেন।

বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদুল হক, বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের সমন্বয়ে এই বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়। এই বেঞ্চে শুনানি শেষে গত ১৬ আগস্ট আদালত রিভিউ আবেদনটি মঞ্জুর করে রায় দেন। নতুন এ রায়ে ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি দেওয়া রায় বাতিল করা হয়।

আশিয়ান সিটি আবাসিক প্রকল্পকে দেওয়া রাজউকের অনুমোদন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের দেওয়া আশিয়ান সিটির অবস্থানগত ছাড়পত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ব্লাস্ট, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট 

বাংলাদেশ, নিজেরা করি, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন নামের মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী আটটি সংগঠন ২০১২ সালের ২২ ডিসেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট করে। রিট আবেদনে বলা হয়, আশিয়ান সিটি ৪৩.১১ একর জমির জন্য অনুমোদন নিয়েছে। কিন্তু কাজ করছে ২৩০.৪৬ একর জমিতে। তারা যে জমি ভরাট করেছে সেটা নিম্ন জলাভূমি। জলাভূমি ভরাটের জন্য তাদের জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এই প্রকল্পটি জলাশয় ভরাট করে করা হয়নি বলে জানান অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম।

ইত্তেফাক/এএএম