নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নির্বিঘ্নে নিত্যপণ্যের মতো বিক্রি হচ্ছে হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। এতে ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) ৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত একটি ক্যাম্প, যার নাম ‘বিহারি ক্যাম্প’ বা ‘বিহারি পট্টি’। ক্যাম্পের প্রায় প্রতিটি ঘরের কোনো না কোনো সদস্য প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মাদক বিক্রিতে জড়িত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিহারি ক্যাম্পটি দুই ভাগে বিভক্ত। ৩ নম্বর পুকুরের দুই পাড় মিলিয়ে সব বিহারিদের বসবাস। একপাশের নাম ৩ নম্বর টিনপট্টি এবং তার বিপরীত দিকের নাম সিমুলপাড়া চেয়ারম্যান অফিস। পুরো এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার পরিবার বসবাস করে। কিন্তু সেখানে দেখা মেলে ভয়ংকর দৃশ্যের। এক মাসের অধিক সময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিহারি ক্যাম্পের দুটি আলাদা সারির মাদক কারবারিদের ভয়ানক কর্মকাণ্ড। প্রতিটি অলিগলি মাদক কারবারিদের বেচাকেনায় জমজমাট। শুধু পুরুষই নয় ঘরের নারীরাও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করে। এক কথায় মুড়ি-মোয়ার মতোই চলে মাদকের বেচাকেনা। টাকা নিয়ে হাত বাড়ালে মুহূর্তেই মেলে হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সেখানকার সেলুনের দোকানগুলোই মাদক ব্যবসার নিরাপদ স্থান। আশপাশের বাসিন্দারা বলেন, বিহারি ক্যাম্পকে হেরোইন আর গাঁজার স্বর্গরাজ্য বলা চলে। দিনরাত দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা এসে তাদের চাহিদামতো সংগ্রহ করে স্থান ত্যাগ করে। প্রতিবাদ তো দূরে থাক মুখ খুললেই ভয়ানক হামলার শিকার হতে হয়। এক সময়কার ঐ এলাকার মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত একজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন এ প্রতিবেদক। তবে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুরো বিহারি ক্যাম্পের টিনপট্টি মাদকের কারবার বেশি হয়। ২০০ ঘর আছে সেখানে। এমনও পরিবার রয়েছে যেখানে মা-বাবা, ছেলেমেয়ে মিলেমিশে এ কারবার করে।
প্রশাসনের অভিযানের তত্পরতা সম্পর্ক জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা অভিযানের চিন্তাভাবনা করলেও তাদের সোর্সদের বরাতে এলাকায় খবর রটে যায়। দুয়েক জন ধরা পড়লেও জামিনে এসে ফের আগের মতোই কারবার চালিয়ে যায়। এ পেশা ছাড়লেন কেন? জবাবে বলেন, তার পরিবারের কোনো কিছুর অভাব নেই। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে চলতে গিয়ে জড়িয়ে যান মাদকের মতো অপরাধ জগতে। তবে গত বছর ছেড়ে দেন মাদকের কারবার। বিহারি ক্যাম্পের চেয়রাম্যানের দায়িত্বে থাকা মো. লিয়াকত হোসেনর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মাদক কারবারিদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ খোদ নিজেই। ৩ নম্বর পুকুরপাড়ের দিকে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে ‘পি’ সেক্টরে। তবে সিমুলপাড়ার পাশে তেমন নেই। পুলিশের তত্পরতা সম্পর্কে বলেন, ‘পুলিশ মাঝেমধ্যে এসে আটক করে নিয়ে যায়। কিন্তু চার-পাঁচ দিনের ব্যবধানে ফের চলে আসে তারা। তবে এ বছরে বড় ধরনের কোনো মাদকবিরোধী অভিযান হয়নি।’ নারায়ণগঞ্জের এক সমাজকর্মী জানান, ‘মাদক হচ্ছে সমাজ ধ্বংসের মূল অস্ত্র। মাদক তো যে কেউ বিক্রি করতে পারে না। মাদক বিক্রি করতে সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। কারবারিরা বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দুয়েকটা ছবি তুলে সেগুলোকে ব্যানার, ফেস্টুনে পরিণত করেই মাদক ব্যবসা পরিচালনা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তারা দেখেও না দেখার ভান করেন। তারা যদি সঠিকভাবে নির্মূল করতে চান, তাহলে মাদকই থাকবে না।’
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের একজন সিনিয়র সদস্য বলেন, বিহারি ক্যাম্প অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি এলাকা। ক্যাম্পের অধিবাসীদের মধ্যে বেশির ভাগই ভালো। তবে একটি চিহ্নিত গ্রুপ অপরাধের সঙ্গে জড়িত বছরের পর বছর। এই গ্রুপটির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করে না। গ্রুপটি ক্যাম্পের বিভিন্ন মহল্লা ও অলিগলিতে দিনরাত মাদক বিক্রি করে এবং করায়। তারা মাদক বিক্রি করে রাতারাতি প্রচুর টাকার মালিক বনে গেছে। এই গ্রুপটির সঙ্গে জড়িত কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী। রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু সোর্স। নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশের ইনচার্জ (ওসি) আল মামুন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) এস এম জহিরুল ইসলাম জানান, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অতি শিগিগরই ঐ এলাকার মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
