চলমান ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে রীতিমতো উড়ছে ভারত। যেমন ব্যাটিং তেমনি বোলিং সঙ্গে নজরকারা ফিল্ডিং তো রয়েছেই। কোনো দলই যেন তাদের থামাতে পারছে না। ব্যাটিং লাইনআপ স্বাগতিকদের বরাবরই ভালো। রয়েছে রোহিত-কোহলির মতো অভিজ্ঞ মারকুটে ব্যাটার, তাদের সঙ্গে তরুণ গিল, আইয়াররাতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছেই।
তবে ব্যাটাররা ব্যর্থ হলেও তাদের চিন্তা নেই কারণ তাদের দলে রয়েছেন বিশ্বমানের বোলাররা। এর মধ্যে তিন গতি তারকা তো নিয়মিতই উইকেটে আগুন ঝড়াচ্ছেন। বুমরাহ-সিরাজ-শামি প্রতিপক্ষের জন্য যেন আতঙ্কের নাম।
ভারতীয় তিন পেসারের মধ্যে মোহাম্মদ শামি বেশ অভিজ্ঞ। খেলছেন বহু সময় ধরে ভারতের হয়ে। তবে দলের হয়ে এই যাত্রাটা এখনকার মতো পুরোটা সময় সুখকর ছিল না তার জন্য। ভারত হিন্দু প্রধান দেশ ও মোহাম্মদ শামি মুসলিম খেলোয়াড় হওয়ায় অফ ফর্মে থাকলেই সমর্থকদের তীক্ত কথা শুনতে হতো তাকে।
শুধু তাই নয় এখন, যেই সমর্থকরা শামির প্রশংসায় মুখ দিয়ে ফেনা তুলছেন তারাই দুই বছর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারত ১০ উইকেটে হারার পর শামিকে পাকিস্তানের দালাল বলেছিলেন, এখানেই ছেড়ে দেননি শুনেছিলেন তাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো কটু কথাও।
তখন ভারতের সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটাররা শামির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তত্কালীন অধিনায়ক বিরাট কোহলি সংবাদ সম্মেলনে এসে শামিকে আগলে রাখার কথা বলেন এবং দলীয় পরাজয়ের দায় গোটা দলের বলে উল্লেখ করেন। কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার, ইরফান পাঠানদের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রিকেটাররাও মোহাম্মদ শামির পাশে দাঁড়ান, ভারতের সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন যাতে তারা শামির প্রতি সম্মান দেখায়। সেই সময় তীব্র ইসলামোফোবিয়া আক্রান্ত হওয়া শামিই এখন ভারতের ক্রিকেটে সাফল্য উদ্যাপনের কেন্দ্রে আছেন।
তবে শুধু যে মাঠের কাণ্ডেই শামির প্রতি ঘৃণা ছড়াতো সমর্থকরা তেমনটি নয়। তার ব্যক্তিগত জীবনেও অন্যধর্মাবলম্বি হওয়ায় ঘৃণা পেয়েছেন। কোনো কারণ ছাড়া শুনেছেন দুয়োধ্বনিও। ২০১৩ সালে ভারতের হয়ে ওয়ানডে অভিষেক হয় শামির। এরপর থেকেই বিভিন্ন সময় দলের হয়ে খেলতে দেখা গেছে তাকে। তাই বেশ পরিচিত মুখও হয়ে ওঠেন তিনি। তবে হুট করেই ২০১৯ সালে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় শামির বিরুদ্ধে। মূলত কারণ ছিল তার সাবেক স্ত্রী ভারতীয় এক মডেল হাসিন জাহান।
২০১৪ সালে শামি ও হাসিন জাহানের বিয়ে হয়। তবে এর চার বছর পর হঠাৎ স্বামীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে কোটে হাজির হন হাসিন জাহান। ভারতের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাত্কার দিতে গিয়ে হাসিন জাহান জানিয়েছিল, তার ওপর মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার এখন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বামীর বিরুদ্ধে আইনি রাস্তা নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। সে সময় তিনি ম্যাচ ফিক্সিং, পরকীয়াসহ আরো বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন শামির বিরুদ্ধে। যেই মামলা এখনো চলমান। তবে মাঠের বাহিরের এত কাহিনি নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিসিআই কখনোই শামির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
নিজের সঙ্গে এত সব কিছু ঘটলেও মাঠে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন শামি। তবে করোনার পর ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সমর্থকদের কটু কথা শুনতে হয় তাকে। সেই টুর্নামেন্টের ভারতীয় স্কোয়াডে তিনিই ছিলেন একমাত্র মুসলমান সদস্য। আর ধর্মের কারণে তাকে নানা কটাক্ষের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পাকিস্তানের কাছে সে বার বড় ব্যবধারে হেরে গিয়েছিল ভারত। শামি অনেক রানও দিয়েছিলেন। সামাজিকমাধ্যমে তাকে কার্যত তুলোধনা করেছিলেন ভারতের সমর্থকরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে সব কটাক্ষে ছিল সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত। তবে সেসব মনে রাখেনি তিনি। সব কিছু কাটিয়ে মাঠে নিজেকে প্রমাণে মনোযোগ দিয়েছিলেন তিনি। আর তার ফলই এখন পাচ্ছে ভারত।
চলতি বিশ্বকাপে সব ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেয়েও দলের এখন পর্যন্ত চলমান আসরে দলের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তিনি। আসরে ভারতের সাত ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিন ম্যাচ খেলেই তিনি শিকার করেছেন ১৪ উইকেট। যার মধ্যে দুই ইনিংসে নিয়েছেন পাঁচটি করে উইকেট। এছাড়া গত পরশু বৃহস্পতিবার মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত বোলিংয়ের সুবাদে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালীন এক রেকর্ডও গড়েছেন তিনি, ভেঙেছেন জাভাগল শ্রীনাথ ও জহির খানের যুগ্ম রেকর্ডও। এতদিন ওয়ান ডে বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে সব থেকে বেশি উইকেট নেওয়া বোলারদের ক্রমতালিকায় যুগ্মভাবে সবার উপরে ছিলেন জহির ও শ্রীনাথ। জহির বিশ্বকাপের ২৩টি ইনিংসে বল করে ৪৪টি উইকেট সংগ্রহ করেছেন। শ্রীনাথ বিশ্বকাপের ৩৩টি ইনিংসে বল করে ৪৪টি উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু শামি তাদের পেছনে ফেলতে নিয়েছেন মাত্র ১৪ ইনিংস, তার উইকেট এখন ৪৫টি।
