আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি করার আগে থেকেই সংস্কার করে চলেছি

দৈনিক ইত্তেফাককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:০০

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পেলেও এখনো তা পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়ন নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, আমাদের আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও যুদ্ধভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা সংগত কারণেই কিছুটা চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে মূল্যস্ফীতি দ্রুতই কমিয়ে আনার জন্য আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। মুদ্রা বিনিময় হারের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অত্যধিক অবমূল্যায়ন এড়াতে যুক্তিসংগত পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করেছি। বর্তমানে মুদ্রা বিনিময় হারকে অনেকাংশে বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছি। ফলে, মুদ্রা বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তেমন থাকবে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে আইএমএফের মূল্যায়নকে কীভাবে দেখছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশই বিশ্বব্যাংকের সহজশর্তের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। অন্যদিকে আমরা আইএমএফের সঙ্গে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি কর্মসূচিতে আছে। আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক বার্ষিক সভায় বলেছেন যে, আইএমএফের কর্মসূচির উদ্দেশ্য পূরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক পথে রয়েছে। আমি আশাবাদী, করোনার পরে যেভাবে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, চলতি অর্থবছরেই আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আমরা প্রবৃদ্ধির আগের ধারায় ফিরে আনতে সক্ষম হব।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পলিসিসমূহ বাস্তবায়নের জন্যে গত ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ ৪২ মাসের জন্য সাতটি কিস্তিতে মোট ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি অনুমোদন করে। এর মধ্যে ১ম কিস্তিতে ৪৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে। এ ঋণের আওতায় সরকার তার প্রতিশ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রম চলমান রেখেছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি করার আগে থেকেই এসব সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছি। ২০১৯ সালে আমার প্রথম বাজেট বক্তৃতায় এসব সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা আমি বলেছিলাম। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে প্রাথমিক ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের পেমেন্টের মোট বকেয়া, রিজার্ভ মানি, অগ্রাধিকারভিত্তিক সামাজিক খাতে ব্যয় এবং সরকার কর্তৃক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য অর্জন করেছি। জুন ২০২৩ পর্যন্ত শুধু রিজার্ভ আর রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট জাতীয় সংসদে পাশ করেছি, জিডিপির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে এনবিআর কর্তৃক রাজস্ব আদায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছি, বাংলাদেশ ব্যাংকঋণের সুদের হার নির্ধারণে করিডোর পদ্ধতি চালু করেছে। ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করতে পলিসি গ্রহণ করেছে এবং পাইলট ভিত্তিতে রিস্ক বেইজড সুপারভিশন অ্যাকশন প্ল্যান সম্পন্ন করা হয়েছে। 

রিজার্ভ বাড়ানোর বিষয়ে একটি লক্ষ্যমাত্রা আইএমএফের কর্মসূচিতে ছিল। এটি অর্জন সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধপূর্ব সময়ে আমাদের রিজার্ভের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে, আমাদের রিজার্ভ এখনো সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে। একটি দেশের জন্য তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর উপযোগী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা যথেষ্ট। ২৩ অক্টোবর হিসাব অনুযায়ী আমাদের গ্রোস ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভের পরিমাণ ২৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এই রিজার্ভ দিয়ে আমরা প্রায় পাঁচ মাসের সমতুল্য আমদানি ব্যয় মেটাতে পারব। কাজেই রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থানেই রয়েছে। তাছাড়া রিজার্ভ পূর্বাবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ইতিমধ্যে আমরা আমদানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে সংযত করতে পেরেছি। চলতি অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ, অন্যদিকে আমদানি কমেছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বর্তমানে বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। বিদ্যমান ও নতুন কর্মীদের প্রবাস আয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রেরণে উৎসাহিত করার জন্য আমরা আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা প্রদান, রেমিট্যান্স প্রেরণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ, হুন্ডির ব্যবহার প্রতিহতকরণ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণের সুযোগ প্রদান ইত্যাদি উদ্যোগ নিয়েছি। এসব উদ্যোগের কার্যকর প্রভাব অল্প সময়ের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।

রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য আইএমএফের কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা আছে। এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই রাজস্ব আয় বাড়াতে আমাদের সব উৎসকেই ব্যবহার করার চেষ্টা করছি। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই একযোগে কাজ করছে। কর রাজস্বের সিংহভাগই যেহেতু আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে, সে কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায়ে দক্ষতা বৃদ্ধি ও করবান্ধব রাজস্ব প্রশাসন গড়ার জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করছে এনবিআরের পৃথক তিনটি উইং। যেমন—খুচরা ও সেবা পর্যায়ে মূসক বা ভ্যাট আদায়ে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেশিন বসানো হয়েছে। ইএফডি স্থাপনের এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে রেভিনিউ শেয়ারিং ব্যবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় প্রতি বছর ৬০ হাজার করে আগামী তিন বছরে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার মেশিন বসানো হবে। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে কর অব্যাহতির সঠিক প্রভাব বিষয়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে কতিপয় খাতে কর অব্যাহতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আয়কর ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশনও ওপর। এর সুফলও অচিরেই পাওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন। কর রাজস্ব ছাড়াও কর-বহির্ভূত খাত থেকে মোট রাজস্বের ১০ থেকে ১২ শতাংশ রাজস্ব আসে। অর্থমন্ত্রী বলেন, কর-বহির্ভূত রাজস্ব আদায়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোতে তত্পরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিভিন্ন স্টাডির মাধ্যমে কর অব্যাহতির উপযোগী যথোপযুক্ত খাত চিহ্নিত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে এর নিট প্রভাব বিষয়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে গঠনমূলক বিশ্লেষণের স্বার্থে জরিপ সম্পাদন করা প্রয়োজন।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় জ্বালানি তেলের অটোমেটেড প্রাইসিং ফরমুলা বা স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি সেপ্টেম্বরে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবনা আছে। এ বিষয়ে সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমার বাজেট বক্তৃতায় জ্বালানি তেলের অটোমেটেড প্রাইসিং ফরমুলা চালুর কথা বলেছিলাম। এটি করতে পারলে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা আমাদের জন্য ভালোই হবে। তবে এই মুহূর্তে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বেশ বাড়তির দিকে। তাই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মূল্য ঝুঁকি বিবেচনা করে মূল্যস্ফীতি যেন না বাড়ে, তাই এখনই আমরা এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করছি না। আমাদের এ বিষয়ে হোম ওয়ার্ক করা আছে। একটি ড্রাফটও রেডি আছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীল হলেই আমরা এটি করতে পারব।

আইএমএফের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু। এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করে আগেই সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য আমরা আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি করেছিলাম। সে সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধ ও যুদ্ধসংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলোর অস্তিত্ব ছিল না। ফলে সংস্কারের ফলাফল বিষয়ে সমঝোতায় আসার ক্ষেত্রে ঐ সময়ে বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে এবং যুদ্ধের অভিঘাত বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। আমরা রাজস্ব এবং রিজার্ভের যে লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে একমত হয়েছিলাম তা ঠিক করা হয়েছিল সম্ভাব্য সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং তার ফলাফল কি হতে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে। তবে বৈশ্বিক নানা কারণে রিজার্ভ এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বিচ্যুত হতে পারে। আইএমএফ কর্তৃপক্ষও বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছে। তাই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলো কি না তার চাইতে বড় বিষয় হলো লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা আন্তরিক আছি কি না। আমরা যেসব কার্যক্রম গ্রহণে একমত হয়েছি, তার সবই চলমান আছে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যেসব পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে, আশা করা যায় অতি দ্রুতই আমরা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সফল হতে পারব। আইএমএফের মিশন এবং তাদের পরিচালনা পর্ষদ তাদের মতো করে দেখবে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা। এটাই তাদের কাজের নিয়ম। আমরা আমাদের বাজেটে দেশের জনগণের কাছে যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তাই সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী চলমান রেখেছি।

ইত্তেফাক/এমএএম