বিলের কম পানিতে দাঁড়িয়ে কেউ মাছ ধরছেন, আবার কেউ গবাদি পশুর খাবার, হাঁসের জন্য শামুক অথবা নিজেদের খাবারের জন্য শাপলা সংগ্রহ করছেন। এরকম ছোটখাটো কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাহন হলো কোষা নৌকা, যাকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘ডুঙ্গা’ নামে ডাকা হয়।
নড়াইলের বিলগুলোতে কম পানিতে তাল গাছের তৈরি এই এসব ডোঙা পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করেন। হাতিয়াড়া গ্রামের মালতি রানী। সকালে বিলে গেছেন মাছ ধরতে, নির্জন এলাকায় দাঁড়িয়ে বড়শি দিয়ে ধরেছেন দেশি কয়েকটি পুঁটি আর টাকি মাছ। ফেরার পথে তুলে আনছেন কলমি শাক, শাপলা আর গরুর জন্য ঘাস। ডোঙাভর্তি করে বিকালে বাড়ি ফিরেছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। এভাবে একে একে ফিরলেন স্নিগ্ধা রানী, আরতি বিশ্বাসসহ নবীন আর প্রবীণ গৃহিণীরা। সন্ধ্যা নেমে আসছে, তখনো বিলের এক কোনায় মাছ ধরছেন কমলা রানী। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নড়াইলের বিল এলাকার চিত্র এ রকমই।
বিল আর খালে পরিপূর্ণ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন তালগাছের তৈরি ডোঙার ব্যবহার চলছে। বিল পাড়ের হাজারো মানুষের বাহন এই ডোঙা। খালে প্রবেশ করতে, খাল পাড়ি দিয়ে বাজার, বিল থেকে মাছ ধরা, শাপলা তোলার কাজে ব্যবহার হয় গ্রামীণ জনপদের এই বাহন। এ বছর পানি কম হওয়ায় নৌকার থেকে খালেবিলে ডোঙার চলাচল বেশি হলেও হাটগুলোতে দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। নড়াইল-যশোর সড়কে তুলারামপুরের হাটে ডোঙা পাওয়া যায়। এখানে সপ্তাহের শুক্রবার ও সোমবারে হাট বসে। একটি ছোট ডোঙা ২ হাজার, আর মাঝারি থেকে বড়টি ৫/৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তুলারামপুর হাটে ডোঙা কিনতে আসেন কৃষকসহ গৃহস্থ বাড়ির কর্তারা। যশোরের অভয়নগর থেকে ডোঙা কিনতে এসেছেন রকিব মোল্যা। তিনি একটি ডোঙা কিনেছেন সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। জানালেন, ‘ঘেরে মাছের খাবার দিতে এই ডোঙা কাজে লাগে। গতবছরের তুলনায় কমদামে কিনেছি।’
ডোঙাবিক্রেতা চর শালিখা গ্রামের সেলিম মোল্যা বলেন, ‘এ বছর বিলে পানি কম হওয়ায় ডোঙার চাহিদা কম। গত বছর যে ডোঙা বিক্রি করেছি ৪ হাজারে, সেটি এবার দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তালগাছ আর শ্রমিকের দামও উঠছে না।’
একটি তালগাছ থেকে দুইটি ডোাঙা তৈরি হয়। তালগাছের গোড়া মাটির ভেতর থেকে বের করে শিকড় সহ গাছটি কাটা হয়। এরপর গোড়ার অংশটি সূঁচালো করে ৯ হাত রেখে আলাদা করা হয়। গাছটির মাঝামাঝি অংশ দাগ দিয়ে হাত করাত দিয়ে ধীরে ধীরে এপাশ ওপাশ কেটে দুই ভাগ করে ফেলা হয়। ভেতরের নরম অংশ কোদাল আর শাবল দিয়ে কুপিয়ে শাঁস পরিষ্কার করে তৈরি হয় ডোঙা। এরপর হাত বাশলে দিয়ে ধীরে ধীরে কেটে-চেঁছে সুন্দর আকারের ডোঙা তৈরি করা হয়।
লোকসংস্কৃতি গবেষক অধ্যক্ষ রওশন আলী বলেন, দেশীয় প্রযুক্তির এই বাহন লোক সংস্কৃতির অংশ। এলাকায় অধিক সংখ্যায় মাছের ঘের হওয়ায় বিলে পানি কমে গিয়ে ধীরে ধীরে ডোঙার ব্যবহার কমছে। খালে এবং বিলে পানি প্রবাহ সঠিক রাখতে না পারলে জীববৈচিত্র্য ব্যাহত হবে।
