ভুল পরিকল্পনায় মরণফাঁদ

গোলপোস্টের পেছন দিয়ে গেছে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক। বাফুফে বলছে গোলপোস্টের অন্তত পাঁচ হাত দূরত্বে ট্র্যাক স্থাপন করলেও হতো। মাত্র তিন হাত দূর দিয়ে গেছে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের বর্ডার লাইন। মাঠ থেকে ট্র্যাক দুই তিন ইঞ্চি উঁচু, কনক্রিটের ঢালাই। ধারালো অবস্থায় রয়েছে। অলক্ষ্যে শরীরের সঙ্গে লাগলেই রক্তাক্ত হয়ে যাবে। ফুটবল খেলার সময় কোনো খেলোয়াড় যদি ছিটকে বাইরে গিয়ে পড়েন, তাহলে নির্ঘাত বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবে। গোলপোস্টের সামনে ছোট বক্সে কর্নারের এরিয়েল বলে একজনের সঙ্গে আরেক জনের ধাক্কা লাগবেই। ছিটকে গিয়ে যিনি বাইরে পড়বেন, হয় তার মাথায় লাগবে। না হয় বুকে, ঘাড়ে কিংবা পিঠে আঘাত লাগবে। অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের ধারালো অংশে লাগবেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাথায় আঘাত লাগলে নির্ঘাত মৃত্যু।

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ১৬:১৯

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম সংস্কার করতে ফুটবল খেলাটাই উধাও হয়ে গেছে। ঢাকার খেলা ঢাকার বাইরে হয়েছে। তিন বছর ধরে সংস্কারের নামে বঙ্গবন্ধুতে খেলা নেই। সংস্কারকাজ এখনো অনেক বাকি। এরই মধ্যে ফুটবল খেলাটা যেন মাঠে গড়াতে পারে তার জন্য মাঠ, ড্রেসিং রুম এবং সংবাদমাধ্যমকে বসতে দেওয়ার ব্যবস্থা করে খেলাটা চালু করতে চায় বাফুফে। গতকাল বিকালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) সেভাবেই মাঠ বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বেরিয়ে এলো মারাত্মক ত্রুটি। এই মাঠে খেলা হলে যে কোনো মুহূর্তে খেলোয়াড় মারাত্মক আহত হবেন। মাথায় আঘাত পাবেন। এই অবস্থায় মাঠ বুঝে নিতে রাজি না বাফুফে। 

ভুল পরিকল্পনায় এমন ত্রুটি হয়েছে বলে এখন সংশ্লিষ্টদের মনে হয়েছে। স্টেডিয়ামে নতুন করে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক স্থাপন করা হয়েছে। গোলপোস্টের পেছন দিয়ে গেছে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক। বাফুফে বলছে গোলপোস্টের অন্তত পাঁচ হাত দূরত্বে ট্র্যাক স্থাপন করলেও হতো। মাত্র তিন হাত দূর দিয়ে গেছে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের বর্ডার লাইন। মাঠ থেকে ট্র্যাক দুই তিন ইঞ্চি উঁচু, কনক্রিটের ঢালাই। ধারালো অবস্থায় রয়েছে। অলক্ষ্যে শরীরের সঙ্গে লাগলেই রক্তাক্ত হয়ে যাবে। ফুটবল খেলার সময় কোনো খেলোয়াড় যদি ছিটকে বাইরে গিয়ে পড়েন, তাহলে নির্ঘাত বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবে। 

গোলপোস্টের সামনে ছোট বক্সে কর্নারের এরিয়েল বলে একজনের সঙ্গে আরেক জনের ধাক্কা লাগবেই। ছিটকে গিয়ে যিনি বাইরে পড়বেন, হয় তার মাথায় লাগবে। না হয় বুকে, ঘাড়ে কিংবা পিঠে আঘাত লাগবে। অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের ধারালো অংশে লাগবেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাথায় আঘাত লাগলে নির্ঘাত মৃত্যু। বাফুফে এবং এনএসসির কর্মকর্তারা দেখলেন নির্মাণ ত্রুটিতে মরণ ফাঁদ। বাফুফে এবং এনএসসি একজন আরেক জনের দোষ দিচ্ছে। এনএসসি বলছে বাফুফের লোকজন আসেনি আর বাফুফে বলছে তারা সবকিছু লিখিত দিয়েছিল। 

এই অবস্থায় মাঠ বুঝে নিতে পারবে না জানিয়ে দিয়েছেন বাফুফের সহসভাপতি আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক। সেখানে ছিলেন এনএসসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) সামসুল আলম। দুই পক্ষই একটা সুরাহা চায়। সামসুল নিজেও হতবাক হয়েছেন। বলছিলেন মাঠ থেকে ট্র্যাকের বর্ডার লাইন হবে আরও দূরে। এতো কাছে হলে তো দুর্ঘটনা ঘটবেই।’ একমাসের মধ্যে এটির সমাধান করবেন তিনি। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের এমন জায়গাগুলো ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। কারণ এটা তো এখন ভাঙাও যাবে না। অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে।

হকির ওয়াটারিং সিস্টেম ফুটবলে

এখানেই শেষ নয়, ফুটবল মাঠে ওয়াটারিং সিস্টেমেও বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। আধুনিক সিস্টেমে মাটির নিচ থেকে পানির ফোয়ারা ছড়ানোর জন্য নজেল বেরিয়ে আসে। পানি দেওয়া হয়ে গেলে লুকিয়ে যায় নজেল। দুর্ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই। আর বঙ্গবন্ধুতে সেগুলো না করে স্প্রিংলার বসিয়েছে। আরেক নাম ওয়াটারগান। মাঠের চারদিকে টাচ লাইন ধরে স্থাপন করা হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও ফুটবল মাঠে এ ধরনের ওয়াটারিং সিস্টেম নেই। এগুলো এখন মাঠে খেলোয়াড়দের জন্য মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ফুটবলাররা যদি ছিটকে গিয়ে বন্দুকের মতো তাক করা ওয়াটারগানগুলোর উপরে পড়েন, তাহলে কী হবে বলা কঠিন। সাদাচোখে দেখলে মনে হচ্ছে মারাত্মক জখম হবে। শরীরে ঢুকে যেতে পারে। এনএসসির পরিচালক সামসুল আলম বলছেন, ‘ওয়াটারিং সিস্টেমগুলো যখন স্থাপন করা হয় তখন তারা (বাফুফে) কেন এসে জানায়নি। একটা যখন স্থাপন হয়ে গেছে তখনই বললে বন্ধ করা যেত। এখন তো সব স্থাপনের কাজই শেষ।’

ফুটবল ড্রেসিং রুমে মাত্র ১৬ জনের সিট

বলা হচ্ছে আধুনিক ড্রেসিং রুম। কার্যত উলটো। মাত্র ১৬ জনের সিটিংব্যবস্থা রাখা হয়েছে ড্রেসিং রুমে। কমপক্ষে ২৩ জনের সিটিংব্যবস্থা চেয়েছিল বাফুফে। একটা দলের সঙ্গে খেলোয়াড় কোচিং স্টাফসহ অন্তত ৩০ জন বসার ব্যবস্থা থাকে। সেখানে মাত্র ১৬ জনের চেয়ার রাখা হয়েছে। অন্যরা কি করবে? এই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। এনএসসি এবং বাফুফে এখানেও পরস্পর কথা। বাফুফে বলছে তারা ২৩ চেয়ারের কথা বলেছে। কিন্তু করেনি। আর এনএসসি যখন শুনল আর্জেন্টিনা আসবে না তখন চেয়ারের সংখ্যাও কমে গেল। এখন বলা হচ্ছে চেয়ার বাড়িয়ে দেওয়া হবে।

গ্যালারিতে শেড স্থাপন

সাধারণ দর্শকের গ্যালারিতে কি কারণে শেড স্থাপন করা হচ্ছে তার কোনো কারণ জানা নাই। তবে বড় অঙ্কের টাকা খরচা করে শেড স্থাপন করতে গিয়ে বিপত্তি বেধেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম গ্যালারি, দর্শকের কাছে যেটি আবাহনী গ্যালারি হিসাবে পরিচিত, সেখানকার শেডের কারণে ফ্ল্যাড লাইটের পুরো আলো মাঠে পড়বে না—এমন একটি কথাও কাল বিকালে বাফুফে এবং এনএসসির কর্তাদের মুখে শোনা গেল।

সবশেষে কথা

এক মাস সময় নিয়ে ত্রুটিগুলো সারিয়ে মাঠটা খেলার উপযোগী করে দেওয়া হবে। কিন্তু গ্যালারির কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দর্শক এখন খেলা দেখতে পারবে না। সাংবাদিকরা এনএসসির কাছে জানতে চাইলেন খেলা শুরু হলে কোথায় বসবেন? এনএসসি জানিয়েছে একটা ব্যবস্থা করা হবে। কয়েক দিন আগে সরকার হতে আরো ৬০ কোটি টাকা বাজেট অনুমোদন হয়েছে। এতো দিন বন্ধ থাকা স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ আবার শুরু করবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। সবমিলিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সংস্কার বলে জানিয়েছেন এনএসসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) সামসুল আলম।     

ইত্তেফাক/জেডএইচ