শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মিরপুরে যুবলীগ নেতা খুন

এক মাসেও কিনারা হয়নি প্রকাশ্যে ঘুরছে আসামিরা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৩, ০১:২৭

রাজধানীর মিরপুর মাজার রোডে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের জের ধরে যুবলীগ নেতা শাহ আলম খুনের ঘটনার কূলকিনারা হয়নি। তবে এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় পুলিশ প্রধান আসামিসহ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে।

এ ব্যাপারে মামলার বাদী নিহত শাহ আলমের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আলী বলেন, ‘পুলিশ প্রধান আসামি স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ইসলামকে গ্রেফতার করলেও তাকে রিমান্ডে নিতে পারেনি। এই ঘটনায় আমি ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছি। কিন্তু বাকি ১১ আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ ৭৫ বছর বয়সী একজন মুক্তিযোদ্ধা বাবার এই আকুতি কেউ কি শুনছে না?

দারুস সালাম থানার ওসি আমিনুল বাশার বলেন, ‘শাহ আলম হত্যায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুই জনকে গ্রেফতার করেছি। গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে ইসলামকে রিমান্ডে আনার বিষয়ে আমরা আদালতে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু তার রিমান্ড মঞ্জুর না হওয়ায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারিনি। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’ গত ১৪ অক্টোবর রাতে মিরপুর মাজার রোডে পিয়াল গ্রুপ ও ইসলাম গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় যুবলীগ নেতা শাহ আলমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। আসামিরা হলেন—ইসলাম, শান্ত, শেখ সুমন, লিমন, পাপন, আফজাল হোসেন  গোলাপ, এনামুল করিম খোকন, আদাল ওরফে পাকিস্তানি আফজাল, ফুল ইসলাম রিজী, জাহাঙ্গীর শেখ, রাসেল, দিপঙ্কর রাহুল, মো. রাজু ও ইমরান হোসেন ওরফে ইতালী ইমরান ।

যে কারণে হত্যা :শাহ আলী ও দারুস সালাম থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিহত শাহ আলম ছিলেন শাহআলী থানা এলাকার নাবিল গ্রুপের সদস্য। নাবিল খান এর আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ থেকে নাবিল খানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিকে ২০০৭ সালে শাহআলী থানাধীন বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন গুদারাঘাটে রর‍্যাবের ক্রসফায়ারে মিরপুরের দুর্ধর্ষ পিয়াল বাহিনীর প্রধান পিয়াল নিহত হন। পিয়ালের ছোট ভাই হলেন নাবিল খান। র‍্যাবের ক্রসফায়ারে পিয়াল নিহত হওয়ার পর চাঁদাবাজির এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন নাবিল। মিরপুর মাজার রোড থেকে গাবতলী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ফুটপাতের দোকানের চাঁদাবাজি নাবিল গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশের কাছে এই গ্রুপের চাঁদাবাজদের একটি তালিকাও রয়েছে। এরা হলেন টোকাই ফারুক, অতুল, এনামুল, মাইনুদ্দীন, ইদ্রিস, মুন্না, মজিবর, আলমাস, জাফর, রাসেল ও রাজ্জাক।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দারুস সালাম থানার একজন কর্মকর্তা বলেন, শাহ আলম খুনের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় এক নম্বর আসামি হলেন মো. ইসলাম। তিনি দারুস সালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছিলেন। একসময় শাহআলী মাজারের সামনে পাইকারী সবজির আড়তে রিকশা ভ্যান চালাতেন ইসলাম। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবক লীগের একটি কমিটিতে নাম ঠাঁই পাবার পর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। একপর্যায়ে তিনি দারুস সালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হন। পরে তার চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ডের অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। নিজের নামে ইসলাম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। এলাকার নির্মাণাধীন বাড়ি বা ভবনের ইট, বালু ও সিমেন্ট সরবরাহের কাজটি ইসলাম গ্রুপের হাতে। শাহ আলম থানা পুলিশের খাতায় তার গ্রুপের যেসব চাঁদাবাজের নাম রয়েছে তারা হলেন—গোলাপ, শেখ সুমন, লিমন, খোকন ও শান্তসহ ৩০ জন। এই গ্রুপটি শাহআলী মাজারের সামনে রাতে সবজির প্রতিটি ট্রাক থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদাবাজি করে। মাজার রোডে খুচরা সবজিবিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে চাঁদাবাজি করে।

মিরপুর শাহআলী মাজারের সামনে মোট ছয়টি লেগুনা স্ট্যান্ড রয়েছে। এই ছয়টি স্ট্যান্ডের ২০০টি লেগুনা প্রতিদিন চলাচল করে। প্রতিটি লেগুনাকে দিনে ১ হাজার ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এই লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে পিয়াল গ্রুপের পাশাপাশি ইসলাম গ্রুপ চাঁদাবাজি করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিরপুর বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইসলাম গ্রুপ ও পিয়াল গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে মাজার রোডের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে এরা প্রকাশ্যে চাঁদা তোলে। দুই গ্রুপ মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করে। ছোট ছোট গ্রুপ দিয়ে এসব চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে এই দুই গ্রুপ। এদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ কোনো অভিযোগ দেয় না।

ইত্তেফাক/এমএএম