শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

যুদ্ধ-বিগ্রহের জেরুজালেমে লোমহর্ষক কয়েক ঘণ্টা

আমার বিশ্ব ভ্রমণের ১৫৬তম দেশ ইসরায়েল। এই যাত্রায় আমার প্রধান লক্ষ্য পবিত্র জেরুজালেম ভালোভাবে চষে বেড়ানো। যে শহরে মিশে আছে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ধর্মের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। যেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ সীমিত।

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৪৫

২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর। বিমান থেকে নেমেই সোজা দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে চলে এলাম জেরুজালেম শহরের ডাউনটাউন হোস্টেলে। সেখানে খুব বেশি সময় বিশ্রাম নিতেও মন চাচ্ছিল না, জেরুজালেমে পা রাখার পরই আল-আকসা মসজিদে যাওয়ার তর সইছিল না।

ডাউনটাউন মুসলিম কোয়ার্টার পার হয়ে জাপার স্ট্রিট গেট দিয়ে সোজা ছোট ছোট গলি পার হয়ে প্রায় ২ কিলোমিটারের মতো পায়ে হাঁটলাম। গলির মুখে যেতেই দেখা পেলাম আল-আকসার গেটের। দূর থেকেই চোখে পড়ল প্রায় ডজন খানেক ইসরায়েলি সোলজার। বড় বড় বন্দুক ঘাড়ের সাথে ঝুলানো। আমি সাহস করেই সরল ভঙ্গিতে সামনে এগোতে লাগলাম।

কিছু দূর এগোতেই বোঝা গেল বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি মুসলিম সেনাবাহিনী রয়েছে তাদের মাঝে। গিয়েই বললাম ‘আমি কি মসজিদে যেতে পারি?’ একজন এসে আমাকে নাম জিজ্ঞেস করেই বলল, ‘তোমার পাসপোর্ট দেখাও।’

তাদের রহস্যজনক চাহনি, পাসপোর্টের বিভিন্ন পাতা উল্টে পাল্টে দেখলেন। স্বাভাবিকভাবেই যা ভয়ের জন্ম দেওয়ার কথা! তারপর আমাকে বলল, ‘তুমি সুরা ফাতিহা পাঠ করো।’ আমি যথারীতি পাঠ করলাম। এমন কড়া ইন্টারভিউ পৃথিবীর কোনো ইমিগ্রেশনেও দিতে হয়নি আমার। আমি কোরআন শরীফের কয়েকটা সুরা মুখস্ত পারি। ছোটবেলায় বাবা আমাকে শিখিয়েছেন এবং মক্তবে হুজুরের কাছে আমি যা শিখেছি সেগুলো আজ আমার কাজে দিয়েছে।

মুসলমান পরিচয়ে সুরা ফাতিহা বলতে পারার সুবাদে আমাকে গেটের দুই পাশের ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সেনারা মসজিদ প্রাঙ্গণের প্রথম গেট খুলে দিলেন। ভেতর থেকে দু’জন লোক এসে আমাকে ‘স্বাগত জানিয়ে’ একটা স্থানে নিয়ে গিয়ে হিজাব ও লং স্কার্ট দিলেন। যদিও আমি বেশ শালীন ড্রেসে মসজিদ গেটে এসেছি। তারপরও আমাকে পরিপূর্ণ হিজাব দিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গনে ঢুকতে হয়েছে।

পাশ থেকে এক ভদ্রলোক বললেন, ‘অনেক দূর থেকে এসেছ, তোমার খুব সৌভাগ্য এখানে আসতে পেরেছ। এখানে অনেক মানুষ আসতে পারে না আমাদের যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে। এখানে কড়া প্রহরা এবং নিরাপত্তায় কিছু মানুষকে ইবাদত করার সুযোগ দেওয়া হয়।’

ভদ্রলোকের কথা শুনতে শুনতে আমি মসজিদের ভেতর প্রাঙ্গনে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম। অজু করলাম। ভেতরে এক আশ্চর্য শিহরণ টের পেলাম। তখন আমি আল-আকসা মসজিদের ঠিক সামনে চলে এসেছি। সোনালি আর নীল রঙের খোদাইয়ে ভরপুর কী অপূর্ব সুন্দর মসজিদ। মুসলমানদের প্রথম কিবলা। এখানে এসেছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.) সহ বহু নবী-রাসুল ও সাহাবিরা।

আমি প্রথম গেট পার হয়েই মসজিদের দেওয়াল স্পর্শ করলাম। আমার ভেতরে এক স্পিরিচুয়ালিটি জেগে উঠল। মসজিদটিতে প্রকাশ পেয়েছে নির্মাণশৈলীর এক মনোমুগ্ধকর প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন সময়ে মসজিদটি সংস্কারে ব্যবহার করা হয় মার্বেল, সোনাসহ নানা ধরনের মূল্যবান ধাতু ও পাথর। খ্রিস্টপূর্ব ১০০৪ সালে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন হজরত সোলায়মান (আ.)। এরপর বিভিন্ন সময়ই এর সংস্কার করা হয়। আল-আকসা মসজিদ মুসলমানদের পবিত্র স্থান। এছাড়াও এটিকে পবিত্র স্থান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে ইউনেস্কো।

মসজিদের ভেতরে খোদাই করা নানা ডিজাইনের চোখ জুড়ানো অসাধারণ স্থাপত্যশিল্প। মসজিদের ভেতরেই মাঝখান বরাবর একটা পাথরের বিশাল বড় অংশ দেখে অবাক হলাম, তারপর দেখতে পেলাম সেই পাথরের গুহার একটি ছোট্ট দরজা। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাম গুহার ভেতরে। মুসলমানরা বিশ্বাস করে ঠিক এই গুহার ভেতরে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বসে ইবাদত করতেন, বিশ্রাম করতেন। সেই ঘরের ভেতর আমি কিছুটা সময় কাটালাম। হজরত মুহাম্মদ (সা.) যে জায়গায় বসেছেন বলে ধারণা করা হয়, সেটিকে ছোট্ট করে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। ঠিক সেই স্থানে আমি বসে বিভিন্ন সুরা পাঠ করেছি। তারপর আমি সেই গুহায় পাথরের গায়ে স্পর্শ করে আবার বের হয়ে এলাম।

মসজিদের একপাশে মহিলাদের জন্য অন্যপাশে পুরুষদের জন্য নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। আমি দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করলাম। তারপর মাগরিবের নামাজ মহিলাদের কাতারে জামাতে আদায় করলাম এই পবিত্র আল আকসা মসজিদের ভেতর। সবার জন্য দোয়া করলাম।  আল-আকসা মসজিদ ঘিরে এত রক্তপাত, সংঘাত, প্রাণহানি তবুও এখানে মুসলমানরা এখনো এর রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। বিখ্যাত সাহাবা হজরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধরের একজনের সাথে পরিচয় হলো মসজিদ প্রাঙ্গণে। যুগ যুগ ধরে আব্বাসী পরিবার আল- আকসার অনেক দায়িত্ব পালন করছেন।

এটি পৃথিবীর বিখ্যাত প্রাচীন জেরুজালেম শহরে অবস্থিত। জেরুজালেম এক সময়ের ফিলিস্তিনের রাজধানী ছিল, বর্তমানে ইসরায়েলের দখলে আছে। এই আল-আকসা মসজিদ থেকেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন।

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূমি অবৈধভাবে দখলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল রাষ্ট্র। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সালে আরবদের সঙ্গে যুদ্ধে, আল-আকসা মসজিদ দখল করে নেয় ইসরায়েল। এরপর থেকেই এটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ইসরায়েল। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আল-আকসা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ১৯৬৯ সালে পবিত্র মসজিদটিতে অগ্নিসংযোগও করা হয়। এরপর নানা বিধিনিষেধ আর শর্ত সাপেক্ষে এখানে মুসলমানদের ইবাদতের সুযোগ হয়। বছরের পর বছর চলতে থাকা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে এই পবিত্র মসজিদ। এটি ইহুদিদের কাছে পবিত্র ভূমিখ্যাত ‘টেম্পল মাউন্ট’ বা ‘ঈশ্বরের ঘর’।  ইহুদিদের দাবি, পবিত্র এই ভূমির নিচেই রয়েছে তাদের দু’টি প্রাচীন মন্দির। এখানে নিয়মিত প্রার্থনায় অংশ নেয় লাখো ইহুদি। মসজিদ প্রাঙ্গণের এক কর্নারের ওপরে দাঁড়ালে দেখা যায় সেই ওয়েস্টার্ন ওয়াল।  খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছেও পবিত্রতার দিক থেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গা। তাদের বিশ্বাস, এখানেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল যিশুকে। তাই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর শহর জেরুজালেম।

আমার বিশ্ব ভ্রমণের মাঝে মসজিদ আল- আকসা ভ্রমণ আমাকে এক বিরল অভিজ্ঞতা দান করেছে। আমি মসজিদের ভেতর থেকে বের হয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। তখন সন্ধ্যার আকাশে তারকারাজি মসজিদের মিনারের গম্বুজের ওপর আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে মসজিদ আল-আকসাকে আরো অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলেছে। মুসলমানদের এই প্রথম কিবলা সারা পৃথিবীর সকল মুসলমানেরা হূদয়ে ধারণ করে থাকুক শান্তিপূর্ণভাবে।

লেখক: বিশ্ব ভ্রমণকারী। যিনি এরই মধ্যে ১৬৭ দেশ ভ্রমণ করেছেন।

ইত্তেফাক/এসটিএম