বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

আফরোজা পারভীনের লেখা

পিতার কঙ্কাল

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:০১

বুলডোজার দিয়ে কবর গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্বার্থান্বেষী মহল। কবরস্থান উন্নয়নের জন্য বড় একটা প্রজেক্ট নিয়েছে তারা। অনেক টাকার ব্যাপার। কবর না গুঁড়িয়ে দিলে টাকা-পয়সা খরচের সুযোগ হয় না। এক টাকা খরচ না করলে দু টাকা মারার পথও পাওয়া যায় না। তাই কবরস্থান সংস্কারের নামে রাতের অন্ধকারে এই কাজ। কান্নার রোল পড়েছে মফস্সল শহরজুড়ে। গভীর রাতে ঘটেছে কাজটা। করবস্থানটা লোকালয় থেকে সামান্য দূরে। কাছাকাছি যারা আছে তারা কিছুটা বুঝলেও ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেনি। যারা কাজটা করছে তাদের সঙ্গে টক্কর দেবার সামর্থ্য ওদের নেই।

সকালে শহরে খবর রটে যাবার পর সবাই দৌড়ায় কবরস্থান মুখে। কবরস্থানে ঢুকে যে ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তাতে কথা বলার অবস্থা কারোই থাকে না। অনেকে পাথর হয়ে যায়। অনেকে ডুকরে ডুকরে কাঁদে। সবচেয়ে জোরে কাঁদে নীল। মাত্র কয়েকদিন আগে সে তার দাদু সিরাজউদ্দিনকে হারিয়েছে। দাদু তাকে নীলুবাবু বলে ডাকত। দাদু ছিল তার খেলার সাথি। স্কুল থেকে প্রতিদিন ফেরার পথে দাদুর কবরের পাশে খানিকক্ষণ দাঁড়ায় নীল, চোখ মোছে। এরপর সে কার পাশে দাঁড়াবে!

শত শত কবরের মাঝে অক্ষত আছে মাত্র দুটো কবর। বিষয়টা অমানবিক! বড় বেমানান! কিন্তু সে কথা বলার সাহস কারো নেই। মানুষগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া কবর আর অক্ষত কবর দুটোর দিকে বারবার তাকায়। দীর্ঘশ্বাস পড়ে! ওটাই ওদের সম্বল!

এই ধাক্কা সহজে কাটে না। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এ ওর মুখের দিকে তাকায়। তারপর বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। যেন ঝড়ে নুয়ে পড়া এক একটা গাছ ওরা। নীলের আব্বার নাম বেলাল। ডাকনাম বিলু। বিলু ক্ষোভের সঙ্গে বলে, ‘পিতৃপুরুষের কবর। তাদের দেহাবশেষ রয়েছে ওখানে। ভাঙবে আগে বললে পারত। আমরা দেহাবশেষগুলো সরিয়ে নিতাম। এখন ওগুলো আমরা পাব কোথায়?’

ওর চোখে কান্না। ও ভাবে, ওখানে তার আব্বাসহ অসংখ্য মানুষের দেহাবশেষ রয়েছে। সারাটা করবস্থান গুঁড়িয়ে মাটি সমান করা হয়েছে, কোনো কবর ছিল উঁচুতে, কোনটা নিচুতে। কোথাও তো হাড়গোড় কিছুই দেখতে পেল না! কোথায় গেল দেহাবশেষগুলো!

বিলু শুনেছিল দেহাবশেষ নাকি চুরি হয়। তাই তড়িঘড়ি কবর বাঁধাই করেছে। তারপরও রক্ষা করতে পারল না! বিলু দু হাতে মাথা চেপে মাটিতে বসে পড়ে। নীল ছুটে আসে।

‘আব্বা, আব্বা খারাপ লাগছে তোমার? শরীর খারাপ। বসো এখানে, দেখি রিকশা পাই কি না।’

‘আমার আব্বার দেহাবশেষ পাব কোথায়?’

‘দেহাবশেষ কী আব্বা?’

‘শরীর থেকে মাংস আর অন্য অর্গান যেমন কলিজা হূিপণ্ড খসে গলে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু কঙ্কালটা পড়ে থাকে, সেটার কথা বলছি।’

আমি আমার আব্বার কঙ্কাল পাব কোথায়! ওরা যদি কঙ্কালটা দিত তাহলে অন্য কোথাও কবর দিতে পারতাম। দরকার হলে আমার উঠোনে, আব্বার হাতে গড়া বাগানের পাশে। ওরা আমার আব্বার কঙ্কালটাও কেড়ে নিল!

এবার নীলও কাঁদতে থাকে—দাদুর কঙ্কাল নেই, কঙ্কাল নেই!

দু-তিনজন এগিয়ে এসে ওদের ধরে। সবার চোখে পানি। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে! কয়েক পুরুষের করব এই কবরস্থানে। পূর্বপুরুষের চিহ্ন মুছে গেল! আজ তারা সর্বস্ব হারাল!


দুই.

সেদিন অনেকবেলা পর্যন্ত শহরের কোনো বাড়িতে হাঁড়ি চড়ল না। রান্নার কথা কারো মনে পড়ল না, খিদেও লাগল না। একসময় বাচ্চারা কাঁদতে শুরু করলে গৃহিণীদের মনে পড়ল রান্না আর খাওয়া নামে দুটো প্রাত্যহিক জিনিস আছে। তখন বিরস মুখে কেউ খিচুড়ি কেউ ভাত চড়াল। সে ভাত কারো গলা দিয়ে সহজে নামল না। নীল ভাত খেতে বসে কাঁদতে লাগল। বাবা নীলকে থামাতে গিয়ে নিজেও কাঁদল। নীলের মা রাজিয়া শাড়ির আঁচলে মুখ লুকাল। বিয়ের আগে জানত শ্বশুরবাড়ি মারাত্মক জায়গা! শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে চলতে হয় বুঝেশুনে। তারা একটুতেই খুঁত ধরে। তটস্থ থাকতে হয় বউদের। রাজিয়া এ বাড়িতে এসে শাশুড়িকে পায়নি। পেয়েছিল শ্বশুরকে। শ্বশুর আর বাবাতে তেমন কোনো তফাত সে খুঁজে পায়নি। মা-মা বলে গলা ছেড়ে ডাকতেন। আচরণ ছিল অনেকটা নীলের মতো। খিদে লাগলে নীল যেমন সহ্য করতে পারে না শ্বশুরও পারতেন না। নীলের মতোই এটা ওটা খাওয়ার বায়না করতেন। কোথাও গেলে খালি হাতে ফিরতেন না। বউমার জন্য হাতে করে কিছু না কিছু আনা চাই। মানুষটা ছিলেন আলাভোলা। সারাক্ষণ বইপত্র নিয়ে থাকতেন। স্কুলে বিজ্ঞান পড়াতেন। বিজ্ঞানের বইয়ে ডুবে থাকতেন। বিজ্ঞানমনস্ক উদার স্নেহশীল আর আধুনিক ছিলেন। তিনিই বিয়ের পর তাড়া দিয়ে রাজিয়াকে পড়িয়েছেন। রাজিয়া চাকরি নিয়েছে শ্বশুরের ইচ্ছেয়।

সেই শ্বশুর অকালে চলে গেলেন। স্বামী-সন্তানকে সান্ত্বনা দেবে কী নিজেই যে সামলে উঠতে পারছে না। তারপরও স্বামী-সন্তানের কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে। খেয়ে নাও। তোমরা না খেলে আব্বা কষ্ট পাবেন।’

বাপ ছেলে খেল। তবে চোখের পানিতে তাদের ভাতের থালা পুকুর হয়ে গেল। খাওয়ার পর ওরা উঠোনের লাগোয়া ছোট্ট বাগানে এলো। এই বাগানটা ছিল সিরাজ সাহেবের বড় প্রিয়। নিজ হাতে গাছ লাগাতেন, পরিচর্যা করতেন, মাটি খুঁড়তেন, সার আর পানি দিতেন। নতুন ফুল বা পাতা গজালে তাঁর আনন্দের সীমা থাকত না! ডেকে ডেকে সবাইকে দেখাতেন। গোলাপগাছটা ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। ঐ গাছের ফুল ফোটার অপেক্ষায় থাকতেন। নীল ছিল তাঁর প্রধান দর্শক, একান্ত শ্রোতা। দাদুর গায়ে গায়ে লেপটে থাকত। আর দাদুও নীলুবাবু ছাড়া কিচ্ছু বুঝতেন না।

বিলুর বাগানে আগ্রহ ছিল না। আজ নিজে ইচ্ছে করে বাগানে এলো। সঙ্গে নিল নীলকে। গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায় হাত বুলাল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল এখন থেকে গাছের যত্ন করবে। বাবার প্রিয় যা কিছু আছে সবকিছুরই যত্ন করবে তারা বাপ ছেলে মিলে।


তিন.
পাঁচ বছর কেটে গেছে। বিলু পিতার দেহাবশেষ ফিরে পাবার জন্য দপ্তরে দপ্তরে আবেদন করেছে। সাড়া পায়নি। ক্ষমতাসীনদের দোরে দোরে ঘুরেছে, লাভ হয়নি। একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছে ও। নীল স্কুল থেকে ফেরার পথে এখনও কবরস্থানে যায়। দাদার শূন্য কবরের পাশে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। দাদাকে অনুভব করতে চেষ্টা করে! শূন্য কবরস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো কবর ওর চোখে জ্বালা ধরায়!

বাপ ছেলে পালা করে বই গোছায়, বাগানের যত্ন নেয়। তারপরও বাগানের আগের সৌন্দর্য নেই। ফুল আসে না ঝাঁপিয়ে, সবুজ পাতায় ভরে যায় না ডালপালা। আব্বার সময় যেমন আসত। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গোলাপগাছটার। একেবারেই মরো মরো, বিবর্ণ দশা। ওদিকে তাকালে কষ্ট হয় বিলুর! কে জানে কোনটা কম পড়ছে গাছে। রোদ পানি নাকি সার। সবই তো দিচ্ছে সাধ্যমতো। সেদিন বিলু কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে। তারপর অফিস থেকে ফেরার সময় এক প্যাকেট সার কিনে আনে। বিকেলে চা খাবার পর নীলকে ডাকে, ‘আয় তো নীল, আব্বার গোলাপগাছটায় একটু সার দিই। কত ফুল হতো আগে, এ সময় গাছ বোঝাই থাকত ফুলে। এখন যেন মরা গাছ!’

নীল ছুটে আসে। সে গাছের গোড়া খোঁচায়, মরা পাতা ফেলে দেয়। বিলু যত্ন করে সার আর পানি দেয়। কাজ শেষে বারান্দায় বসে হাঁফাতে হাঁফাতে বিলু বলে, ‘আব্বার কঙ্কাল পেলাম না। আব্বার স্পর্শমাখা ভালোবাসার বইগুলো আর বাগানটুকুই এখন সম্বল।’

বিলুর চোখ ছলছল করে। ছলছল করে নীলের চোখও। দিন কয়েক পরের এক রাত। বিলু গভীর ঘুমে। ও স্বপ্ন দেখে, আব্বা তার ঘরের চেয়ারে বসে আছেন। মুখ ভরা হাসি। বিলুকে কাছে ডাকলেন। একগাল হাসি নিয়ে বললেন, ‘কঙ্কাল তো অনেকগুলো হাড় বাপ। মানুষের দেহে ২০৬খানা হাড় থাকে। হাড় দিয়ে সার হয়। সার খুব ভালো জিনিস। গাছে দিলে বৃদ্ধি হয়। ফুল ফোটে ফল ধরে, পত্রপল্লব হয়। সে ফুল থেকে মধু হয়, মানুষ ফল খায়। বীজ থেকে নতুন গাছ জন্মায়। ফটোসেনথিসিস হয়। অক্সিজেন উত্পাদন হয়। অক্সিজেন মানুষের দরকার তাই না বাবা?’

‘এসব কথা কেন বলছ আব্বা?’

‘আমার দেহাবশেষের জন্য মন খারাপ করিস না বাবা।’

‘বোকা ছেলে আমি তো তোদের সঙ্গেই আছি!’

ঘুম ভেঙে যায় বিলুর। আব্বা আব্বা বলে চিত্কার করে ধড়ফড় করতে করতে উঠে বসে। সে চিত্কারে ঘুম ভেঙে যায় সবার। বিলুর পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। আব্বা তাকে কী বলে গেলেন? আমাদের সঙ্গে আছেন মানে!

বিলু বাইরে তাকিয়ে দেখে সকাল হয়ে গেছে। ও বারান্দায় এলো। আবছা আলোয় উঠোন তারপর বাগানে চোখ মেলে দিল। একটু অন্যরকম লাগল। ও ছুটে গেল বাগানে। গোলাপগাছে ঝাঁপিয়ে ফুল ফুটেছে। ফুলে ফুলে ভরে গেছে গাছটা।

বিলু কাঁটাভরতি গাছটা জড়িয়ে ধরে চিত্কার করতে লাগল, ‘নীল, নীলের মা তাড়াতাড়ি বাইরে আসো। দেখ।’

সদ্য ঘুম ভাঙা ওরা ছুটে এলো। কিছুই বুঝল না। বিলু চিৎকার করে বলল, ‘আব্বার দেহাবশেষ পেয়েছি। আব্বা ফিরে এসেছেন। নীল দাদুকে জড়িয়ে ধর।’

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন