বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

চার বিভাগের ২৫ এমপি বাদ

  • উচ্চশিক্ষিত ও করোনাকালীন ভূমিকা অগ্রাধিকার পাচ্ছে প্রার্থী
  • মনোনয়নে রংপুর-৬ আসনে মনোনয়ন পেলেন স্পিকার
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:৫০

আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের দুই দিনের বৈঠকে চার বিভাগের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে বিতর্কিত ২৫ এমপি বাদ পড়েছেন বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। দল মনোনীত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে এবার তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে দক্ষ, উচ্চ শিক্ষিত ও করোনাকালীন ভূমিকা। একই পরিবারের দুই বা ততোধিক সদস্যের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের মূলেও রয়েছে তিন ক্যাটাগরিতে বাদ পড়ার শঙ্কা। এমন আসনের সংখ্যা রয়েছে প্রায় ২০টি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ৩ হাজার ৩৬২ জন। দল মনোনীত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক শুরু হয়। 

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ঐ বৈঠকে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে রংপুর-৬ আসনে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। আগের দুই নির্বাচনে শেখ হাসিনা আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হন। বৃহস্পতিবার রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। এতে বাদ পড়েন ১২ জন বর্তমান সংসদ সদস্য। গতকাল শুক্রবার গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সংসদীয় আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। এই দুই বিভাগের ১৩ জন বর্তমান সংসদ সদস্য বাদ পড়েছেন বলে জানা গেছে। তবে কারা বাদ পড়েছেন সেই ব্যাপারে মনোনয়ন বোর্ডের কোনো সদস্য মুখ খুলছেন না।  ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৬ জন সংসদ সদস্য-মন্ত্রী দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছিলেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার আগে মনোনয়নপ্রত্যাশী ৩৩৬২ জনের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামীকাল রবিবার সকাল ১০টায় গণভবনে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে।

গতকাল মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক শেষে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে আসবে না, এটা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তাদের এখনো নির্বাচনে আসার সুযোগ আছে। হয়তো বিএনপি দলীয়ভাবে, জোটগতভাবে নাও আসতে পারে। বিএনপির ভেতর থেকে অনেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের কাছে খবর আছে—অনেকেই তারা প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবে। শেষ মুহূর্তে কোন পর্যায়ে যায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।’ তিনি বলেন, চারটি বিভাগের মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে। শনিবার না হলেও রবিবারের মধ্যে ৩০০ আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী কারা, তা ঘোষণা করতে পারব। নির্বাচনের দৌড়ে বাদ পড়ছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান কিছু সংসদ সদস্যও। অন্যদিকে এগিয়ে আছেন বয়সে তরুণ, জনগণের কাছে যার বেশি গ্রহণযোগ্যতা আছে, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য বা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা উইন্যাবল-ইলেক্ট্যাবল না, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন; তারা বাদ পড়েছেন। নারী-পুরুষ সব প্রার্থীর ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য হয়েছে। তবে উইনেবল (সম্ভাব্য জয়ী) প্রার্থী আমরা বাদ দেইনি। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা যখন বিভাগের নাম ঘোষণা করি তখন ভিড় বেড়ে যায়, নির্দিষ্ট বিভাগ শুনলে পীড়াপীড়ি শুরু হয়ে যায়। কীভাবে নাম বের করা যায়। সেই কারণে বিভাগের নাম ঘোষণা করছি না।’ ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা মনোনয়নের ব্যাপারটা সুনির্দিষ্ট করে এখন বলছি না, কারণ এর মধ্যে আমরা যে সব প্রার্থী দিয়েছি, সে সব মনোনয়নে ভুলত্রুটিও থাকতে পারে। সেটাও সংশোধনের একটা সুযোগ রেখেছি। এ কারণে আমরা ঠিক করেছি—ভিন্নভাবে, জেলাভাবে বা বিভাগভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করব না। একসঙ্গে ৩০০ আসনের প্রার্থিতা ঘোষণা করতে চাই।’ ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কত নায়ক-নায়িকা এমপি। তারা তো সরাসরি দল করে না। ভারতের মতো বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশেও আছে। আর সাকিব আল হাসান রাজনীতি করবে, জনগণের সেবা করবে। বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে সে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, অজনপ্রিয় প্রার্থীকে অন্য দল থেকে এনে নির্বাচনে প্রার্থী করার ইচ্ছা নেই। জোট শরিক দল হোক আর যে হোক, জনপ্রিয়তা দেখে দেওয়া হবে নৌকা। আমরা সেভাবেই প্রার্থী বাছাই করছি। জানা গেছে, আজ শনিবার আবারও আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। 

এদিকে তিন ক্যাটাগরিতে বাদ পড়ার শঙ্কায় বেশ কয়েকটি জায়গায় বাবা-ছেলে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। চাঁদপুর-২ (মতলব দক্ষিণ-মতলব উত্তর) আসন থেকে আওয়ামী লীগের নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া) ও তার বড় ছেলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য সাজেদুল হোসেন চৌধুরী (দিপু)। একই পরিবারের সবচেয়ে বেশি সদস্যের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী-হরিপুর) ও পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসনে। ঠাকুরগাঁয়ে দলীয় মনোনয়নের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দবিরুল ইসলাম, তার ছেলে, মেজো ভাই, ভাতিজাসহ চার জন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। দবিরুলের বড় ছেলে ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মাজহারুল ইসলাম সুজন, এ নেতার মেজো ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী এবং ভাতিজা বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলী আসলাম জুয়েলও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। পাবনা-৪ আসনে দলীয় মনোনয়নের জন্য প্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর দুই ছেলে ও মেয়ে, জামাতাসহ চার জন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। পরিবারের বড় মেয়ে মাহজেবিন শিরিন পিয়া, দুই ছেলে গালিবুর রহমান শরীফ, সাকিবুর রহমান শরীফ, জামাতা আবুল কালাম আজাদ মিন্টু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে জমা দেন। কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিন সহোদর। তারা হলেন আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, তার বড় ভাই ও রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল এবং তাদের ছোট বোন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবেরী। কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন থেকে নৌকার প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র কেনে প্রয়াত সংসদ সদস্য (এমপি) আফাজ উদ্দীন আহমেদের তিন ছেলে। নৌকার প্রার্থী হতে চাওয়া তিন ভাই হলেন আফাজ উদ্দীন আহমেদের বড় ছেলে নাজমুল হুদা পটল বিশ্বাস, মেজো ছেলে আরিফ আহমেদ বিশ্বাস ও ছোট ছেলে দৌলতপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এজাজ আহমেদ মামুন বিশ্বাস।

যশোর-২ (ঝিকরগাছা ও চৌগাছা) আসন থেকে নৌকার প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র কেনেন বাবা ও ছেলে। বাবা-ছেলে হলেন বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম ও তার ছেলে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোস্তফা আশিষ ইসলাম। একই ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-তিতাস) আসনের বেলায়ও। এখান থেকে নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশী সংসদ সদস্য সুবিদ আলী ভূঁইয়া ও তার ছেলে দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর মোহাম্মদ আলী সুমন। জাসদের এক সময়ের আধ্যাত্মিক নেতা প্রয়াত কর্নেল তাহেরের এক ছোট ভাইয়ের আসনে এবার মনোনয়ন চেয়েছেন আরেক ছোট ভাই। নেত্রকোনা-৫ আসনের (পূর্বধলা উপজেলা) জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য তার ছোট ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল। আবার এমন ঘটনাও আছে যে, নিজের আসনে ছেলে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে বাবা নিজেই দলীয় কার্যালয়ে ছেলের সঙ্গে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মঙ্গলবার ছেলে মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিমের মনোনয়নপত্র জমা দিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজি সেলিম।

ইত্তেফাক/এএইচপি