রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মিডিয়া বদলে দেওয়া এক ট্র্যাজেডি

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৪০

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ডের ৬০তম বার্ষিকী চলে গেল বুধবার। এটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত ঘটনা। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরে প্রেসিডেন্ট ও গভর্নর মোটর শোভাযাত্রা সহকারে যাওয়ার সময় একটি অফিসের ছয়তলা থেকে ছোড়া গুলিতে ঘটনাটি ঘটে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ উপলক্ষ্যে বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি তখন কলেজ ছাত্র। খবর পাওয়ার পর তারা বের হয়ে রাস্তায় শোকার্ত মানুষের সঙ্গে যোগ দেন। বাইডেন বলেন, ‘কেনেডি ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা, সিনেটর এবং একজন রাষ্ট্রনায়ক। তার আকস্মিক মৃত্যুতে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল পুরো দেশ।

১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর ছিল ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষার দিন। সিবিএস নিউজ অ্যাঙ্কর ওয়াল্টার ক্রংকাইট নিউ ইয়র্ক স্টুডিওতে তার বার্তাটি পড়ে শোনানোর সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট কেনেডি দুপুর ১টায় (মধ্যাঞ্চলীয় সময়) মারা গেছেন’। এনবিসি নিউজের অ্যাঙ্কর চেট হান্টলি ও ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকগি তখন অন্যপ্রান্তে তাদের প্রতিনিধি রবার্ট ম্যাকনেইলের কাছ থেকে টেলিফোন বার্তাটি নিচ্ছিলেন। ডালাসের সঙ্গে ফোনের লাইন পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা ফোনে খবর সংগ্রহে ব্যস্ত। এবিসি টেলিভিশনে অনুষ্ঠানের মধ্যে হঠাত্ প্রচার করা হলো প্রেসিডেন্টের মৃত্যু সংবাদ। কেনেডির ছোট ভাই টেড কেনেডি ছিলেন সিনেটের হুইপ। তিনি তখন সিনেট পরিচালনায় ব্যস্ত। খবর পাওয়া মাত্র ক্যাপিটল হিল থেকে ডালাসে ফোন করার চেষ্টা করেও লাইন পাননি। পরে হোয়াইট হাউজে গিয়ে ডালাসে ফোন করেন। হতচকিত পুরো দেশ। সবাই জানার চেষ্টা করছিল হলোটা কী। 

কেনেডি ছিলেন তখন পর্যন্ত আমেরিকার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট। তিনি ও ফার্স্টলেডি জ্যাকুলিন কেনেডি (পরবর্তী সময়ে তার নামের সঙ্গে ওনাসিস যুক্ত হয়) ছিলেন ফ্যাশন আইকন এবং তরুণদের রোল মডেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে মার্কিন রাজনীতিতে কেনেডি পরিবারের একটি পরিচিতি ছিল। তার এই হঠাত্ চলে যাওয়া পুরো দেশকে নয় শুধু, বরং পুরো বিশ্বকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল। তবে মিডিয়ার জন্যও নতুন যুগের সূচনা করে এই ট্র্যাজেডি।

এনবিসি, সিবিএস এবং এবিসি ঐ সময়ে আমেরিকার প্রধান টিভি চ্যানেল। তারা পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে টানা চার দিন কেনেডিকে নিয়ে লাইভ সম্প্রচার করে করে। এর ফলে ১৯ মিলিয়নস ডলারের (বর্তমান হিসাবে ১৯১ মিলিয়ন ডলার) বিজ্ঞাপন হাতছাড়া হয়। আর্থিক ক্ষতি হলেও বিশাল এক দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হয় টেলিভিশনের। রক্তরঞ্জিত ডালাসের রাজপথ বুঝিয়ে দিল জাতীয় সংকটের সময়ে লাইভ সম্প্রচারের গুরুত্ব। বিষয়টি প্রযুক্তির কল্যাণে আজকের দিনে যতটা সহজ তখন সেরকম ছিল না। 

বিশ্বে স্যাটেলাইট যুগের সূচনা ১৯৬২ সালে। এর দুবছর পর আসে ভূ-স্থির উপগ্রহ (জিও স্টেশনারি স্যাটেলাইট)। কেনেডি হত্যাকাণ্ডের সময় উপগ্রহ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়নি। কেবল বা তারের মাধ্যমেই একাধিক নেটওয়ার্ক যুক্ত হতো তখন। সিবিএস নিউজের সাবেক অ্যাঙ্কর ড্যান র্যাদার বলেছেন, ‘কেনেডি হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা যুক্তরাষ্ট্রের চলার পথ নতুনভাবে ঠিক করে দিয়েছে।’ তিনি মনে করেন কোন একটি ঘটনা যা টেলিভিশনকে দেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে দিয়েছে তা কেনেডি ট্র্যাজেডি।’ ২০০৪ সালে তিনি সিবিএস ছাড়ার সময় ঐ মন্তব্য করেন। তিনি ১৯৬২ সালে ঐ চ্যানেলে যোগ দিয়েছিলেন।

চিত্র পরিচালক রব রেইনার সম্প্রতি সিএনএনের সাবেক সাংবাদিক সোলড্যাড ও ব্রিয়েনের সাথে একটি আইহার্ট পোডকাস্ট তৈরি করেছেন, যার নাম ‘হু কিলড্ জেএফকে?’ প্রশ্ন তোলা হয়েছে লি হার্ভে অসওয়াল্ড কি একাই কেনেডিকে খুন করেন, না সঙ্গে আর কেউ ছিল। এ নিয়ে এযাবত্ এত আলোচনা, টিভি অনুষ্ঠান হয়েছে—যা আর কোনো বিশ্বনেতাকে নিয়ে হয়নি। কেনেডি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট। তার আগে আরো তিন জন প্রেসিডেন্ট হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তারা হলেন আব্রাহাম লিংকন (১৮৬৫), চার্লস গারফিল্ড (১৮৮১) ও উইলিয়াম ম্যাককিনলি (১৯০১)। হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরো কয়েক জন। কেনেডি হত্যার পর প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় যুক্ত করা হয় সিক্রেট সার্ভিসকে।

কেনেডি গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় পাশে ছিলেন ফার্স্টলেডি জ্যাকুলিন কেনেডি। ঐ সময় তার অভিব্যক্তি কেমন হয়েছিল তারও কোনো ছবি নাই। মিডিয়ার কোনো ফটো সাংবদিক সেখানে ছিলেন না। ডালাসের রাজপথে কেনেডির শেষ যাত্রার একটি ২৬ সেকেন্ডের ভিডিও এবং কয়েকটি ছবি ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। এ কারণে এ নিয়ে ষড়যন্ত্রের জালও বিস্তার লাভ করে পরে। কারণ এত বড় ঘটনার প্রামাণ্যচিত্র যত্সামান্যই পাওয়া যায়। আমেরিকা তখনও অন্যান্য দেশের মতো খবরের জন্য সংবাদপত্র ও রেডিওর ওপরই  নির্ভরশীল ছিল। এই ঘটনা দেখিয়ে দিল টেলিভিশন সংবাদের কত গুরুত্বপূর্ণ উত্স হতে পারে।

ইত্তেফাক/এএইচপি