বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কমলগঞ্জে বেশির ভাগ পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৪০

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পুকুর। বাড়িঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে, মাছের উত্পাদন, সাঁতার কাটা, গৃহস্থালির ধোয়ামোছা এসব বিভিন্ন কারণে একসময় পুকুর ছিল জনগুরুত্বপূর্ণ। সুপেয় পানি ও বসতবাড়ির প্রাকৃতিক মাছ উত্পাদনের উত্স ছিল পুকুর। তবে অপরিকল্পিত নানা কর্মকাণ্ডে এসব পুকুর এখন বিলুপ্তির পথে।

সময়ের পরিক্রমায় গ্রামের পুকুর-খাল-ডোবার অনেক স্থানই ভরাট হয়ে গেছে। এতে কমে যাচ্ছে প্রাকৃতিক মাছ উত্পাদনের জলাধার। মৌলভীবাজারের  কমলগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কমলগঞ্জ উপজেলা মত্স্য অফিস সূত্র জানায়, ৯০ দশক পরবর্তী সময়ে উপজেলার নদী, খাল-বিল, জলাশয় ও পুরোনো পুকুরের এক-চতুর্থাংশ বিলীন হয়েছে। এক সময়ে এলাকায় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিতি শোনা গেলেও নব্বই-পরবর্তী সময়ে পুকুর, বিল, জলাশয়ের অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। আবার ময়লা আবর্জনায় কিছু কিছু পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘমেয়াদি খরায় আশপাশে সেচের সুবিধাটুকুও হারিয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণ, অতিবৃষ্টিতে ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুরে পানি উপচে পড়ে। পুকুর, খালবিল, জলাধারের সঙ্গে প্রকৃতিরও সম্পর্ক রয়েছে। অনাবৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বদলে যাচ্ছে এতদ এলাকার গ্রামীণ পরিবেশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বাসাবাড়িতে কয়েক দশক আগেও চেনাজানা অজস্র পুকুর ছিল। বর্তমানে গ্রামীণ ঐতিহ্য বহনকারী এসব অনেক পুকুরই হারিয়ে গেছে। গ্রামগঞ্জের শাখা খালগুলো জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। পানি শুকিয়ে গেলে উত্সবমুখর পরিবেশে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ আহরণে কৃষকরা ব্যস্ত থাকত। মাছের আহরণ পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রির মধ্যদিয়েও আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা যেত। বর্তমানে সে দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না। পুকুর, খালবিল, নদীনালা ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে কোনো কোনোটি অস্তিত্বহীন হয়ে আছে। কোনোটি থাকলেও তা অর্ধমৃত। যেসব পুকুর রয়েছে সেগুলোর মধ্যে পূর্বের বৈচিত্র্যতাও নেই। গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশেরও ভারসাম্যতা হারাচ্ছে।

গ্রামে খালবিল ছাড়াও কিছুসংখ্যক বাড়িতে পুকুর-ডোবা থাকলেও আছে সংস্কারহীন। পানি থাকলে ছেলেমেয়েরা মনের আনন্দে এগুলোতে সাঁতরে বেড়ায়। গ্রামের অনেক পুকুর-ডোবায় এখন আর পাড় নেই, পাড় ভেঙে নিঃশেষ হয়েছে। একইভাবে ডোবা, জলাশয়, খালগুলোও ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক মাছের আহরণস্থল বিলীন হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্কুলশিক্ষক মিছবাউর রহমান বলেন, গ্রামীণ পরিবেশে এখন দেশের খালবিল-নদীনালা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পুকুর ও ডোবাগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ আধুনিকতার ছোঁয়া লাগাতে পরিবেশের সেসব স্থাপনা ভরাট করে দিচ্ছে। ফলে মাছের উত্পাদন হ্রাস পাচ্ছে।

কৃষক আক্তার মিয়া, শেরওয়ান আলী, শিক্ষক জমশেদ আলী বলেন, ১০-১৫ বছর আগেও পুকুরে এবং খালবিলে বর্ষা মৌসুমে খাঁচা ভর্তি পুঁটি, শিং, মাগুর, কই, টেংরা, গুতুম, মকা (মলা), ভেড়াসহ দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এভাবে মাছ পাওয়ার পর মনের মধ্যে বাড়তি আনন্দ জোগাতো। এখন বাড়িঘরে পুকুর ভরাট হওয়ায় বর্ষায় বন্যার পরও আর সে ধরনের মাছ পাওয়া যায় না। কমলগঞ্জ উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. শহীদুর রহমান বলেন, গ্রামীণ পুকুরগুলো বৃহত্তর স্বার্থে সংরক্ষণ প্রয়োজন। বর্তমানে নানা কারণেই পুকুর-ডোবার অনেকটা ভরাট হয়েছে। আবার সরকারি উদ্যোগে কোনো কোনো স্থানে নতুনভাবে সরকারি পুকুর খনন হয়েছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তেমনিভাবে গ্রামগঞ্জের মানুষেরও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।

ইত্তেফাক/এএইচপি