রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

হরতাল-অবরোধে কক্সবাজারে পর্যটনশিল্প

৩৫ দিনে ৫০০ কোটি টাকা লোকসান দাবি ব্যবসায়ীদের

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:২১

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ২৮ অক্টোবর থেকে দেশে চলছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। সেই সূত্র ধরে হরতাল-অবরোধে চরম বাজে অবস্থা পার করেছে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ীরা। ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস উদ্যাপনের দিন থেকে কক্সবাজারে শুরু হয় লক্ষণীয় পর্যটক আগমন। কিন্তু এ শুভ সূচনার যাত্রা দীর্ঘায়িত হওয়ার পূর্বেই ?‘শনির দশা’য় আটকে গেছে লাখো মানুষের কর্মযজ্ঞ। ২৮ অক্টোবরের পর থেকে হরতাল-অবরোধে সে যাত্রায় ভাটা পড়েছে। গত ৩৫ দিনে কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সব অনুষঙ্গে প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দাবি করেছেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা।

সূত্র মতে, বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর শুক্র-শনিবার বাদে অবরোধ-হরতাল, ভরা মৌসুমেও পর্যটন স্পটগুলোকে জন-মানবশূন্য করে দিয়েছে। এতে করোনাকাল ও ২০১৪ সালের মতো আবারো দেখা দিয়েছে পর্যটন শিল্পে অশনি সংকেত। বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে অনেক হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। ফলে জেলার পর্যটন শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় অর্ধলক্ষাধিক কর্মজীবীর মধ্যে বিরাজ করছে ছাঁটাই আতঙ্ক। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে এ শিল্পে হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নেতা ও তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসেরর পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, ২০১৪ সালের জ্বালাও-পোড়াও, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাকাণ্ড, ২০১৯ সালের শেষের দিকে করোনাকাণ্ড আর এখন পর্যটনের ভরা মৌসুমে এসে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এ সময় পর্যটকে ঠাসা থাকার কথা পুরো সৈকত এলাকা। স্বাচ্ছন্দ্যে পর্যটক আসতে পারলে দুপয়সা আয় করা যেত। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদানের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের কিছুটা হলেও শোধ করা সম্ভব। কিন্তু এখন পুরো পর্যটন এলাকায় স্থানীয় কিছু দর্শণার্থী এলেও পর্যটক নেই। ব্যাংক ঋণ দূরে থাক, হোটেলে কর্মরতদের বেতন ভাতা পরিশোধ, তিন বেলা খাবার এবং আনুষঙ্গিক খরচ মেটানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাধ্য হয়ে হোটেল বন্ধ করার মতোর কঠিন সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে হবে।

ট্যুরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০০ হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউস ও চার শতাধিক রেস্টুরেন্ট। কিন্তু দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কক্সবাজার এখন প্রায় পর্যটকশূন্য। ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক রেস্টুরেন্ট। এ ছাড়া খরচ পোষাতে না পেরে কর্মচারী ছাঁটাই ও হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউজগুলো বন্ধ হতে বসেছে।

হোটেল মোহাম্মদীয়া গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান বলেন, টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে কক্সবাজারে পর্যটন শিল্পে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পর্যটন রাজধানী হিসেবে খ্যাত কক্সবাজার পর্যটকশূন্যই বলা যায়। গত এক মাসে আমাদের অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতা রাশেদুল ইসলাম ডালিম বলেন, হরতাল-অবরোধের প্রভাবে পর্যটক নেই, নেই বেচাকেনাও। ফলে কর্মচারীদের বেতনও জোগাড় হয়নি। 

তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের হিসাব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, হরতাল-অবরোধে বুকিং প্রায় শূন্য। এ সময়ে যেসব পর্যটকরা আগাম বুকিং দিয়েছিলেন তারাও তা বাতিল করছেন। দ্বাদশ নির্বাচন শেষ না হওয়ায় পর্যন্ত আর পর্যটকসমাগম স্বাভাবিক হবে কি না, সন্দেহ রয়েছে।  

কক্সবাজার আবাসিক হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজ শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্র জানায়, পর্যটক শূন্যতায় মালিক পক্ষ অনেককে বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়েছে। খরচ পোষাতে না পেরে কর্মচারি ছাঁটাই হচ্ছে। ফলে হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজের সঙ্গে জড়িত প্রায় অর্ধলাখ শ্রমিক-কর্মচারী অসহায় দিন যাপন করছেন।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা জানান, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কক্সবাজার এখন পর্যটকশূন্য। আবাসিক ও রেস্তোরাঁ খাতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। পর্যটনের অন্যান্য অনুষঙ্গে আরো ৫ কোটি টাকার ক্ষতি মিলিয়ে দৈনিক ১৫ কোটি টাকায় গত ৩৫ দিনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি