শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রশাসন চলছে আদি ব্যবস্থায়

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

ব্রিটিশ শাসনামলে সৃষ্ট পুলিশি আইন কখনোই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য উপযোগী হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ব্রিটিশ আমলে পুলিশ যেভাবে দায়িত্ব পালন করত, এখনো অনেকটা সেভাবেই তারা দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশ বাহিনী এখনো স্বাধীন দেশের উপযোগী ও জনকল্যাণমূলক বাহিনীতে পরিণত হতে পারেনি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক দিন ধরেই একধরনের অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর পেছনে নানাবিধ কারণ আছে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, জাতি হিসেবে আমরা সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঐতিহ্য ধারণ করে চলেছি। ইংরেজদের ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরূপ প্রভাব আমাদের স্থানীয় রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ব্রিটিশ শাসনের ক্ষতিকর দিক নিয়ে একাডেমিক পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আলোচনা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে ইস্যুটি বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। ইংরেজরা আমাদের এই অঞ্চলে ২০০ বছর রাজত্ব করেছে, এটি একটি বড় সময়। তারা এমনভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলেছে, যা তাদের শাসনক্ষমতাকে মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করার কাজে সহায়ক হয়। বৃহত্তর অর্থে ব্রিটিশরা কখনোই সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনা করেনি। এক্ষেত্রে ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম’-এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৮৬১ সালে পুলিশ বিভাগ পরিচালনার জন্য যে আইন প্রণয়ন করা হয়, তা মোটেও জনকল্যাণমূলক ছিল না। অথচ পুলিশের কাজই হচ্ছে সামাজিক অপরাধ এবং জনগণের নিরাপত্তা বিধানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ জনকল্যাণ সাধন করা। কিন্তু ব্রিটিশরা যে পুলিশ আইন প্রণয়ন করে, তা জনকল্যাণের চেয়ে ব্রিটিশ শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য বেশি কার্যকর ছিল। ব্রিটিশ সরকার যে পুলিশ আইন প্রণয়ন করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে দমন করা, যাতে তারা ব্রিটিশ শাসনবিরোধী কোনো তত্পরতায় যুক্ত হতে না পারে। জনগণ যাতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই ছিল ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর কাজ।

ব্রিটিশ শাসনামলে সৃষ্ট পুলিশি আইন কখনোই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য উপযোগী হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ব্রিটিশ আমলে পুলিশ যেভাবে দায়িত্ব পালন করত, এখনো অনেকটা সেভাবেই তারা দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশ বাহিনী এখনো স্বাধীন দেশের উপযোগী ও জনকল্যাণমূলক বাহিনীতে পরিণত হতে পারেনি। এ ব্যাপারে আমাদের তেমন কোনো উদ্যোগও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন, তারা নিজেদের স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে থাকেন। ফলে আমাদের পুলিশ বাহিনী এখনো জনকল্যাণমূলক একটি আদর্শিক বাহিনীতে পরিণত হতে পারেনি। পশ্চিমা বিশ্বে পুলিশ একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের পুলিশ বাহিনী এখনো সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে চলেছে। সরকারের আদেশ-নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের অনেক সময়ই জনস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। ব্রিটিশ আমলে পুলিশের প্রধান কাজই ছিল জনগণকে দমন করা এবং ইংরেজ শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা চালানো। সময়ের বিবর্তনে পুলিশ বাহিনীর আচরণ হয়তো অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু তাই বলে  নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে, পুলিশ স্বাধীন দেশের উপযোগী হয়ে স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠেছে। পুলিশের মতো অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সিভিল ব্যুরোক্র্যাসি মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসি এখনো সেই ব্রিটিশ আমলের ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে স্বাধীন দেশের মানুষ তাদের ট্যাক্সের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা পাচ্ছে না।

বিচার বিভাগ হচ্ছে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থা কি সেভাবে বিকশিত হতে হয়েছে? বিচারব্যবস্থায় নানা অসংগতি রয়েছে। ফলে বিচারপ্রার্থীকে বিচারের আশায় দিনের পর দিন কোর্টের বারান্দায় ঘুরতে হয়। ব্রিটিশরা আমাদের দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। আগে মোগল আমলে সাম্রাজ্যের সব জমির মালিক ছিলেন সম্রাট। কৃষকেরা ছিলেন সম্রাটের প্রজা। আর জমিদারগণ ছিলেন বংশানুক্রমিক রাজস্ব সংগ্রাহক। ইংরেজরা তাদের একটি অনুগত শ্রেণি তৈরির উদ্দেশ্যে জমিদারি প্রথা প্রবর্তন করে। জমিদারি প্রথা চালুর ফলে জমিদারগণ জমির মালিকে পরিণত হন। এতে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে এ দেশ থেকে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা হয় ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য কমেনি। বাংলাদেশ স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম মূলমন্ত্র ছিল শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমরা কি তা করতে পেরেছি?

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো স্বাধীন দেশের উপযোগী হয়ে গড়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ শাসনামলে রাস্তায় আন্দোলন হতো, মিটিং-মিছিল হতো। রাজনৈতিক সহিংসতা হতো। মূলত ঔপনিবেশিক শাসন হটানোর প্রত্যয়ে এগুলো ছিল জাতীয়তবাদী আন্দোলন। এগুলো এখনো আমরা বয়ে চলেছি। একটি স্বাধীন দেশের রাজনীতি কেন সহিংসতায় পূর্ণ থাকবে? দুঃখজনক হলেও সত্যি, সহিংস ও হরতাল-ধর্মঘটের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও জনগণের কল্যাণ সাধন করা। কোনোভাবেই দেশের স্বার্থবিরোধী বা সম্পদ নষ্ট করা রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। হরতাল-ধর্মঘটের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির উত্তরাধিকার আমরা এখনো বয়ে চলেছি, যা বাংলাদেশের মতো একটি বিকাশমান অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। 

এই সময়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। প্রত্যেক সামরিক শাসক রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নেতাদের ভাগিয়ে এনে তারা তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে সামরিক শাসকদের গঠন করা রাজনৈতিক দলে আদর্শিক দ্বন্দ্ব সব সময়ই প্রকট ছিল। এছাড়া দলের প্রতি তাদের কোনো কমিটমেন্ট ছিল না। যারা কখনোই রাজনীতি করেননি, বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, তারা নতুন রাজনৈতিক দলে এসে মন্ত্রী হয়েছেন। তারা সাধারণ মানুষের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।

আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল আন্দোলন-সংগ্রাম করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কোনো উদ্যোগ নেন না। বর্তমানে যেসব রাজনৈতিক দল দেশে আন্দোলনে রয়েছে, তারা কি কখনোই বলেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, আমরা ক্ষমতায় গেলে সেই উদ্যোগ গ্রহণ করব? বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে, তা সমাধানের জন্য সংস্কার কার্যক্রম শুরু করব? তাহলে তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে কী করবে? আমাদের রাজনীতির অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে যে কোনোভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া এবং টিকে থাকা। এ জন্য যে নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, তারা সেটাই করছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটবে, কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থার যদি কোনো পরিবর্তন না হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা না হয়, তাহলে এই রাজনীতি আমাদের কোনো প্রয়োজন আছে কি? বর্তমানে দেশে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন, তারা জনগণের কতটা কল্যাণ সাধন করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে বিভিন্ন জটিল সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে স্বল্পতা, বিদেশে অর্থ পাচার—এসব জটিল সমস্যা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল কি সিরিয়াসলি কোনো কর্মসূচি দিয়েছে? তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া যায় তা নিশ্চিত করা। এটা সঠিক এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতি হতে পারে না। রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি হয় শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার অদল-বদল, তাহলে তা দিয়ে কীভাবে জনকল্যাণ বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাধিত হবে?

রাজনীতির মৌলিক কিছু জায়গায় রিকনসিলিয়েশন প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তা হয়নি। ১৯৭৫ সালের পর দেশে যেসব রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা কিন্তু সাধারণ মানুষের সামাজিক সমস্যা দূরীকরণ, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে সে ধরনের কোনো এজেন্ডা গ্রহণ করেনি। আন্দোলন হচ্ছে। আন্দোলনের মাধ্যমে হয়তো ক্ষমতার পালাবদল হবে, কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে তা দিয়ে জনকল্যাণ সাধিত হবে না। আর একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো, তাহলো সাধারণ মানুষ এখন আর আগের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে না। কারণ বারবার আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে তারা শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলই প্রত্যক্ষ করেছে, কিন্তু তাদের কোনো কল্যাণ সাধিত হয়নি। তাই সাধারণ মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতি অনেকটাই অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড, একই বছরের ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ড এবং ২১ আগস্টের গ্র্যানেড হামলা—এসব ঘটনা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই অচলায়তন ভেঙে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন।

দলগুলোর এই দ্বিধাবিভক্তির জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা এ ধরনের আরো কোনো কোনো দেশ আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাচ্ছে। গণতন্ত্রের বিভিন্ন রূপ আছে। ইউরোপ বা পশ্চিমা বিশ্বে একধরনের গণতন্ত্র প্রচলিত আছে। আবার দক্ষিণ এশিয়ান দেশগুলোতে গণতন্ত্র বিকাশের পথ ভিন্ন। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এটাই পরবর্তী সময়ে তাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত করতে সাহায্য করেছিল। বাংলাদেশ সে পথেই এগিয়ে চলেছে। আমি মনে করি, বর্তমান সরকার সঠিক পথেই আছে। যদি কোনো কারণে বর্তমান সরকারের পরিবর্তন ঘটে, তাহলে নতুন যে সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হবে, তারা যে দেশের মানুষের অধিকতর কল্যাণ সাধন করতে পারবে, তা কি আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি? আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংলাপ কখনোই খুব একটা সফল হয়নি। এত কিছুর পরও আমি মনে করি, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় ইস্যুতে সমঝোতায় উপনীত হওয়ার জন্য আলোচনার টেবিলে বসাটা ভালো। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র মৌলিক বিষয়ে অনৈক্যের সংস্কৃতি চালু করে এভাবে চলতে পারে না।

লেখক: ডিন, ফ্যাকাল্টি অব সোশ্যাল সায়েন্সেস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব ক্রিমিনোলজি

অনুলিখন: এম এ খালেক

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন