ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করার এক মাস পূর্তির দিনেই যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ইতিহাসের এক নজিরবিহীন এবং স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ। ২৮ মার্চ দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রায় সব শহরে ৮৫ লাখের বেশি মানুষ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে। 'নো কিংস মার্চ' কর্মসূচির আওতায় ৩ হাজারের বেশি নাগরিকের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ট্রাম্পকে 'অযোগ্য', 'শিশুধর্ষক' এবং 'মানসিক বিকারগ্রস্ত' আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে মিনিয়াপোলিস, শিকাগো থেকে সান ফ্রান্সিসকো সব বড় বড় শহরই প্রকম্পিত হয়েছে ট্রাম্পবিরোধী স্লোগানে। এর আগে ২০২৫ সালের জুন ও অক্টোবর মাসেও এই আন্দোলন হয়েছিল। তখনো লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। আয়োজকদের দাবি, জুনে প্রায় ৫০ লাখ এবং অক্টোবরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এবারের বিক্ষোভে অনেক বিষয়ের মধ্যে প্রধান ছিল ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ।
এদিকে তিন/চার দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে-প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন ঘোষণার পরও ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করেছে। অথচ এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। স্মরণ করা যেতে পারে, অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করার অব্যবহিত পরই ট্রাম্প তার নিজস্ব 'ট্রুথ সোশ্যাল চ্যানেলে' ইরানি জনগণকে 'উঠে দাঁড়ানোর' আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন 'আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। আমরা শেষ করলে আপনারা সরকার দখল করুন। সম্ভবত বহু প্রজন্মের মধ্যে এটাই হবে আপনাদের একমাত্র সুযোগ। এটি হাতছাড়া করবেন না।' ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর এ নিয়ে অস্পষ্টতার কোনো অবকাশ থাকে না যে তার ইরান আক্রমণের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ইরানের রেজিম চেঞ্জ। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন খামেনিকে হত্যা করলেই ইরানিরা সব দলবেঁধে সরকারের বিপক্ষে রাস্তায় নেমে আসবে এবং তখন ইরানের শাহের ছেলে ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি গিয়ে সরকার গঠন করবেন। কিন্তু তার সব ভাবনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে ইরান তার ওপর আরোপিত যুদ্ধকে পঞ্চম সপ্তাহে টেনে নিয়ে এসেছে।
যদিও ইতিমধ্যেই ইরানের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতাই আমেরিকা বা ইসরাইলের আক্রমণে নিহত হয়েছেন, কিন্তু রেজিম চেঞ্জের কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। অকল্পনীয় ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু চালিয়ে যাচ্ছে বললে ভুল হবে, আমেরিকার মতো একটা পরাশক্তিকে রীতিমতো নাকানিচুবানি খাইয়ে চলেছে। প্রায় প্রতিদিনই ট্রাম্পের অসংলগ্ন কথা তারই প্রমাণ বহন করে। কখনো তিনি বলছেন তিনিই এখন ইরানের সুপ্রিম নেতা, কখনো বলছেন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, কখনো-বা বলছেন এটি শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ লাগবে। বাস্তবতা হলো, ইরান যুদ্ধ ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর রূপ ধারণ করছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সর্বাত্মক আক্রমণ মোকাবিলা করেই ইরান এই অপ্রতিসম যুদ্ধটাকে আনুভূমিকভাবে গোটা পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত হরমুজ প্রণালিতে তার নিয়ন্ত্রণ অতীতের তুলনায় আরো বেশি সংহত করেছে। বলা চলে গত এক মাসে ইরান এতে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। এদিকে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর এবার বিশ্বের অন্য আর এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চলাচল পথ 'বাব এল মান্দেব' প্রণালি নিয়েও দেখা দিয়েছে নতুন করে উদ্বেগ। সুয়েজ খাল ও লোহিতসাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগকারী এই সরু জলপথটির একপাশে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অবস্থান। ফলে তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়াতে চায়, তবে তারা হুতিদের ব্যবহার করে লোহিতসাগরের এই বাণিজ্য পথটি যে কোনো সময় বন্ধ করে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যদি তার এই মিত্র শক্তিকে যুদ্ধে নামায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। ইতিমধ্যেই হুতি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তারা যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নৌ-অবরোধ ঘোষণা করবে।
চলমান সংঘাতের এই প্রেক্ষাপটে ইরানের রেজিম পরিবর্তনের সম্ভাবনা যে খুব ক্ষীণ তা বলাই বাহুল্য। খোদ আমেরিকার মিত্ররাই এই সম্ভাবনাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্র একে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, এক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যা ইঙ্গিত দেয় যে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাবে বা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে। সম্প্রতি ফ্রাঙ্কফুর্টে এফএজেড আয়োজিত এক ফোরামে ফ্রিডরিখ মেরৎস এ অভিমত ব্যক্ত করেন। এর আগে জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভালটার স্টাইনমায়ারও এই যুদ্ধের সমালোচনা করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযান একটি 'বিপর্যয়কর ভুল' এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আর মাত্র আট মাস পরই আমেরিকাতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। মার্কিন গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই মধ্যবর্তী নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনেই ট্রাম্প তথা রিপাবলিকান রেজিমের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠবে। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, ১৯৩৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মোট ২২টি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেস গড়ে ২৮ এবং সিনেটে চারটি করে আসন হারিয়েছে। মাত্র দুটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ উভয় কক্ষেই আসন জিতেছে। এদিকে চলমান ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে নিজ দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নজিরবিহীন ধস নেমেছে-যা তার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন পর্যায়ে। গত ৩০ মার্চ প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের একটি নতুন জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর আস্থা রাখছেন-যেখানে এক সপ্তাহ আগেও এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন ক্রমাগত হ্রাস পাওয়াই ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ইরান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ছে সাধারণ আমেরিকানদের পকেটে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ার অন্যতম বড় কারণ। সামরিক অভিযানের ফলে তেল, গ্যাস, সার, বিমান ভাড়া এমনকি বন্ধকী ঋণের সুদের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ৩ দশমিক ৯৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক মাসের তুলনায় ১ ডলারেরও বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামও আকাশচুম্বী হয়েছে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
সবকিছু মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভক্রমশই বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের স্থায়িত্ব যত বাড়বে এবং অর্থনৈতিক চাপ যত প্রকট হবে, এই ক্ষোভও ততই বাড়বে; ট্রাম্পের জন্য আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে টিকে থাকাও ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কেউ কেউ এমন আশঙ্কাও করছেন, যদিই রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে যায় তাহলে ট্রাম্পকে অভিশংসিতও করা হতে পারে। গত ৬ জানুয়ারি রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে এক বক্তৃতায় ট্রাম্প নিজেও এই মর্মে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন যে, দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে ডেমোক্র্যাটরা তাকে অভিশংসনের জন্য কোনো না কোনো অজুহাত খুঁজে বের করবে। উল্লেখ্য, এর আগের মেয়াদেও তাকে অভিশংসিত করা হয়েছিল। এমন এক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ 'মিডটার্ম' বা মধ্যবর্তী নির্বাচন।
বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনায় এই নির্বাচনে ট্রাম্পের নিজের রেজিম রক্ষাই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন। প্রশ্ন তাই, যদিই-বা ইরানে রেজিম চেঞ্জ ঘটেই, ট্রাম্পের নিজের ঘরে রেজিম রক্ষা কি আদৌ সম্ভব হবে?
লেখক: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

