বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ভয়ে দৃষ্টিনন্দন স্পটে যেতে পারেন না পর্যটকরা

রাঙ্গামাটিতে থাকার মানসম্পন্ন হোটেল মোটেল নেই

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:০০

দৃষ্টিনন্দন পর্যটনের জন্য দেশি-বিদেশে পর্যটকদের বারবারই আকর্ষণের কেন্দ্রে রাঙামাটি। শুধু এই জেলাতেই রয়েছে ৪০টি পর্যটন কেন্দ্র। পার্বত্য অঞ্চলে রাঙ্গামাটি জেলার সর্বত্রই জেএসএসের তৎপরতাই সিংহভাগ। কিন্তু এই অঞ্চলে জেএসএসের সন্ত্রাসীদের কারণে শহরকেন্দ্রিক পর্যটনকেন্দ্রগুলো ছাড়া অধিকাংশ দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যেতে পারেন না দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। মাঝে মধ্যেই দুর্গম এলাকাগুলোর পর্যটনকেন্দ্রে হানা দেয় এইসব সন্ত্রাসীরা। পাশাপাশি এখানে নেই কোন ভালো থাকার ব্যবস্থা। মানসম্পন্ন হোটেল-মোটেল নেই বললেই চলে। অথচ কাপ্তাই লেক ঘিরে দৃষ্টিনন্দন পর্যটন ও হোটেল-মোটেলের ব্যবস্থা হতে পারে। 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এই লেকের মাঝখানে নান্দনিক বড় রেস্টুরেন্ট করলে দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক এখানে আসবেন। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আর সঠিক নীতিই পারে রাঙামাটিকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রের রূপ দিতে। সেনাবাহিনীসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। বিদেশী পর্যটকসহ দেশী পর্যটকদের নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

কিছুদিন আগে পর্যটকের একটা গ্রুপ নৌকায় করে কাপ্তাই লেক দিয়ে চাংপং রেস্টুরেন্টে যাচ্ছিল। কিন্তু লেকেই হানা দেয় জেএসএসের সশস্ত্র দল। তারা পর্যটকদের নৌকা পুড়িয়ে দেয়। মোবাইল ফোনসহ কাছে থাকা জিনিসপত্র ছিনিয়ে দেয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর একটা দল দ্রুত সেখানে অভিযানে যায়। সেনাসদস্যদের আসার খবরে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের কারণে রাঙ্গামাটি শহরকেন্দ্রিক ছাড়া সেখানকার অধিকাংশ দৃষ্টিনন্দন স্পট কিংবা পাহাড়ে যেতে পারেন না পর্যটকরা। বরকলের হরিনা এলাকায় রয়েছে সুন্দর স্পট। সেখানে যাওয়া যায় না। থেগামুখ স্থলবন্দর রয়েছে। জেএসএসের সন্ত্রাসীদের কারণে সেটা বন্ধ। ভারত থেকে নানা ধরনের প্লাস্টিক পণ্য আসত এই বন্দর দিয়ে। অনেকদিন ধরেই এটা বন্ধ। শুভলং বাজারে রয়েছে জেএসএস ও ইউপিডিএফের অবস্থান। ফলে শুভলং ঝরনায় যেতেও ভয় পান পর্যটকরা।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার তৌহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, পর্যটকদের নৌকা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। যে চারজন পর্যটক ছিল তাদের মোবাইলগুলো সন্ত্রাসীরা নিয়ে গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সনাক্ত করা হয়েছে। তবে এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযান চলছে।

সম্প্রতি রাঙামাটি এলাকা ঘুরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরকেন্দ্রিক যেসব পর্যটনকেন্দ্র আছে তার মধ্যে ঝুলন্ত ব্রিজ, ডিসির বাংলোসহ শহরকেন্দ্রিক কয়েকটি স্পটে পর্যটকই বেশি। পাশাপাশি অনেকেই পেদা টিংটিং যান। আমেরিকা, জার্মানি, চীন, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের অনেক দেশ থেকেই বিপুল সংখ্যক পর্যটক রাঙামাটিতে আসেন। সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসেন ভারত থেকে। তারা রাঙামাটির রূপ বৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধ হন। অনেকেই সবগুলো স্পটে যেতে না পেরে আক্ষেপ করেন। এসব পর্যটকরা চান ফ্রি ঘুরে বেড়াতে। যদিও এখনো পুরো পার্বত্য এলাকায় পর্যটনের জন্য সেই ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। জেএসএস ও ইউপিডিএফ ও যে চারটি সংগঠন সেখানে আছে তারা পুরো পার্বত্য এলাকায় নানা ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। 

রাঙামাটির অর্ধশতাধিক স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কাপ্তাই লেক ঘিরে সরকার নানা ধরনের পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করতে পারে। লেকের মধ্যে রেস্টুরেন্ট ছাড়াও আশপাশে হোটেল-মোটেল করা যেতে পারে। এতে পর্যটক যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করা সম্ভব। পার্বত্য অঞ্চলের এই পর্যটন স্পটগুলি নান্দনিক পরিবেশ গড়ে তুললে এর আয় দিয়ে বাৎসরিক বাজেট দেওয়া সম্ভব। সরকারকে অর্থের জন্য কারো কাছে চাওয়ারও প্রয়োজন হবে না।  আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যে কোন ধরনের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে নিরাপত্তা দিয়ে আসছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারের পরিকল্পনা ছাড়াও সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে এইসব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা যায় তাহলে কোটি কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। পার্বত্য এলাকার মতো এমন সুন্দর জায়গা খুবই কম আছে। সম্প্রতি বান্দরবানে একটি পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণেও তারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা। অথচ পর্যটনের আয় দিয়ে থাইল্যান্ড দাঁড়িয়ে গেছে। এক সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের চাল দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এখন তারাই আমাদের চেয়ে উন্নত হয়ে গেছে শুধু পর্যটন দিয়ে। বাংলাদেশেও পরিকল্পনা নিলে পর্যটনকে দাঁড় করানো সম্ভব।

ইত্তেফাক/এমএএম