আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন অনেক তরুণ। কেমন নেতৃত্ব চায় এ প্রজন্ম, এমন প্রশ্নের জবাবে তরুণেরা বলছেন, নেতৃত্ব হতে হবে তারুণ্যনির্ভর। মানুষের কাছে স্পষ্ট জবাবদিহিতা থাকতে হবে। দেশের উন্নয়নের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ নিতে হবে, আর সে কাজে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে। আগামীর নেতৃত্ব নিয়ে তরুণদের ভাবনা জানতে ‘প্রজন্ম’-এর এবারের আয়োজনে আমরা কথা বলেছি কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সাথে। এটি সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও গ্রন্থনা করেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
‘জনপ্রতিনিধিদের সুস্পষ্ট জবাবদিহিতা ও তরুণদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে’
—মো. রাগীব রহমান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আজকের তরুণ সমাজ অনেক বেশি রাজনীতিসচেতন। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে সকল খবরাখবর রাখে। নির্বাচন নিয়ে থাকে তাদের ভাবনা, জনপ্রতিনিধিদের কাছেও থাকে নানাবিধ প্রত্যাশা। নির্বাচনের মৌসুম এলেই দেখা যায় জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির জন্য দিন-রাত আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এলাকাবাসীকে উন্নয়নের ব্যাপারে নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অথচ ক্ষমতায় আসার পর অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিকেই দেখার সুযোগ আর এলাকাবাসীর হয় না। রাজধানীকেন্দ্রিক জীবনযাপন করতে করতে এলাকার খোঁজ নিতেই ভুলে যান। কাজেই জনসম্পৃক্ততা যেন কেবল নির্বাচনপূর্ব বা ভোটকেন্দ্রিক না হয়ে সব সময়ের জন্য হয়, সেটি আজকের তরুণ সমাজ জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে। জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির প্রয়াস হিসেবে দেখা যাচ্ছে এখনকার জনপ্রতিনিধিরা মাইকিং, পোস্টার ইত্যাদি পুরোনো প্রচারণা যন্ত্রের পাশাপাশি বিশেষ করে নতুন প্রজন্মক আকৃষ্ট করতে ফেসবুক, তথ্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ইত্যাদি ডিজিটাল মাধ্যমের প্রতিও মনোযোগী হচ্ছেন।
আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন, বিগত দিনে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকা বা অবদান কী ছিল, সেই সম্পর্কেও জনপ্রতিনিধিদের সুস্পষ্ট জবাবদিহিতা থাকতে হবে। তাদের এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সর্বপ্রথম গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমকে এমন একটি দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে, যেন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সাথে জনগণের সেতুবন্ধন তৈরি হয়। জনপ্রতিনিধিদের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ সম্পর্কে একদিকে যেমন জনগণকে অবহিত করতে হবে; তেমনি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রয়োজন ও প্রত্যাশার কথাও ক্ষমতাবানদের দৃষ্টিগোচর করতে হবে। সর্বোপরি আজকের তারুণ্য এমন নেতৃত্ব চায়; যারা সেই তরুণদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিবে। কোনো তরুণকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যেন ‘সহমত ভাই’-এর যাঁতাকলে পিষ্ট হতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাজীবন শেষে বেকারত্বের গ্লানি মাথায় নিয়ে যেন পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হয়ে না থাকতে হয়, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। গণতন্ত্র, সুশাসন, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইত্যাদি শব্দগুলো যেন পাঠ্যপুস্তকের বুলি হিসেবেই সীমাবদ্ধ না থাকে, আজকের তরুণ সমাজ জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে তেমনটিই প্রত্যাশা করে। কেননা এই জনপ্রতিনিধিরাই হতে পারে আজকের তরুণদের অনুপ্রেরণার উত্স ও অদম্য সাহসের জোগানদাতা।
‘আগামীতে জনপ্রতিনিধিরা স্বাস্থ্যখাতকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবেন বলে বিশ্বাস করি’
—শতাব্দী ভট্টাচার্য্য
শিক্ষার্থী, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ
বাংলাদেশ দরিদ্র একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যখাতে বর্তমান সরকারের অবদান অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে যারা জনপ্রতিনিধির ভূমিকায় আসবেন, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এর উন্নয়নের পক্ষে কাজ করবেন বলেই আমার ধারণা। সরকার প্রতি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি মানহীন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর সংখ্যা কমানো এবং মানোন্নয়নের দিকে আরও সজাগ দৃষ্টির প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে ডাক্তারদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার খবর প্রায়ই আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাই। নানা স্তরে চলা বিভিন্ন ধরনের দালালি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া কাম্য। বর্তমানে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। আর এই রেজিট্যান্স হওয়ার পিছনে দায়ী অন্যতম কারণ বিভিন্ন ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই যথেচ্ছা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। এর বিরুদ্ধে সরকারি মহল থেকে আরও ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। গ্রামে-গঞ্জে অশিক্ষিত রোগীদের ভুল চিকিত্সা দেওয়া হাতুড়ে ডাক্তারদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তারদের চিকিত্সা বিষয়ক ভুল এবং তার সমালোচনা গঠনমূলক পদ্ধতিতে, নিশ্চিত হয়েই যাতে গণমাধ্যমে আসে সে ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ভুল তথ্য পরিবেশনে জনসাধারণের মনে বাংলাদেশের চিকিত্সাব্যবস্থার উপর অনাস্থার সৃষ্টি হয়। অনেকেই আমাদের চিকিত্সাব্যবস্থার উপর ভরসা রাখতেন পারছেন না, উন্নত চিকিত্সার আশায় প্রতিবেশী দেশসহ ছুটে চলেছেন নানা দেশে। এ অবস্থা নিরসনের জন্য স্বাস্থ্যখাতের বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তি আমদানির দিকে নজর দিলে আমরা বিশ্বমানের চিকিত্সাসেবা পাব বলে আশা করা যায়। এর পাশাপাশি গ্রামীণ স্বাস্থ্যখাতের অধিকতর উন্নতিও একান্ত প্রয়োজন। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টাল গোল) বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা নির্মাণে এখন থেকেই আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়া উচিত। প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে মৌলিক চিকিত্সাসেবাটুকু যেন সর্বস্তরের মানুষ সমভাবে পায়। চিকিত্সাসেবার সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে অতীতেও বিভিন্ন শুভ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইপিআই শিডিউল, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন ইত্যাদি এর সুন্দর উদাহরণ। আসন্ন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের একটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত যোগ্য প্রতিনিধিরা স্বাস্থ্যখাতকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করি।
‘টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার মতো নেতৃত্ব প্রয়োজন’
—মো. জোবায়ের হোসেন তাকি
শিক্ষার্থী, পুরকৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নেতৃত্ব ও উন্নয়ন সবসময় সহবস্থানে থাকে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা, তা অর্জনের জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো নেতৃত্ব। আমার কাছে নেতৃত্ব হলো এমন একটি বিষয় যেখানে ব্যক্তিস্বার্থের আগে প্রাধান্য পায় রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনগণ। একটি সুশিক্ষিত নেতৃত্ব পারে যথাযথভাবে দেশের এই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে। দেশ পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন যোগ্য ও সুশিক্ষিত একজন নেতার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
বর্তমানে অবকাঠামোগত দিক থেকে ১৩৪টি দেশের মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৪তম। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়া উন্নয়নশীল দেশটি তার মাত্র ২.৮ শতাংশ জিডিপি ব্যবহার করছে এই খাতে। যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ব্যবহার করছে ৫ শতাংশ, ভিয়েতনাম ১০ শতাংশ। আমাদের এখন প্রয়োজন ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডকে সময়োপযোগী করে পরিবর্ধন করা, যা সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সড়কের উন্নয়নে রয়েছে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব। যানযটের কারণে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ, তার সমাধানে মানসম্মত গণপরিবহন, রেল ও জলপথের যথার্থ ও অধিক সংযোজন নিয়ে ভাববে—এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন। সর্বোপরি শিক্ষা ও গবেষণার দিকে গুরুত্ব দিবে এমন একটি নেতৃত্বই কামনা থাকবে।
বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কিন্তু থেমে নেই। বেশ কয়েকটি মেগা প্রোজেক্ট নির্মাণ চলছে। বর্তমানে পদ্মাসেতুর মতো বড় ও চ্যালেঞ্জিং একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। চলছে কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের মতো চ্যালেঞ্জিং কাজ। তবে এসকল প্রকল্পে অধিকতর সূক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং অভিজ্ঞ ও দক্ষ পরিচালনার ঘাটতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমদানি-নির্ভর নির্মাণ সামগ্রী থেকে বেরিয়ে দেশজ নির্মাণ সামগ্রীকে প্রাধান্য দেওয়ার গুরুত্ব বুঝবে এমন নেতৃত্ব চাই। এসব বুঝতে সক্ষম নেতৃত্বে প্রয়োজন। গণতন্ত্রের সঠিক চর্চার মাধ্যমে নেতৃত্ব দেখতে চাই তরুণেরা, যেখানে উন্নয়নের পথে কোনো বাধা থাকবে না, আর দেশ দ্রুতই পৌঁছে যাবে উন্নত দেশের কাতারে।
‘যারা নেতৃত্বে আসবেন, তাদের প্রত্যেকেরই আইন সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে’
—সাদিয়া ইসলাম
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
আসছে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আমি দারুণ আশাবাদী। এবছরই আমি প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছি। কাজেই নেতৃত্ব কেমন হওয়া উচিত এটা নিয়ে বিশদ চিন্তা করতে হচ্ছে। একজন নেতার অনেক গুণ থাকা জরুরি। সবচেয়ে বেশি দরকার দেশপ্রেম ও সততা। তিনি হবেন সরকার ও জনগণের মাঝখানে সেতুবন্ধন। দলমত নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সাথে তার বোঝাপড়াটা থাকা জরুরি। প্রতিটা নেতাই নিজ নিজ জায়গা থেকে এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন করলেই এগিয়ে যাবে দেশ। তবে সংবিধান অনুসারে একজন সাংসদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন করা। এ জায়গা থেকে আমার মনে হয়, প্রতিটি প্রার্থীরই আইন সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। আমাদের দেশের অধিকাংশ আইনই ব্রিটিশদের করে দিয়ে যাওয়া। যুগের তুলনায় সেগুলো যথেষ্ট চলনসই নয়। একজন আইনসচেতন জননেতা চাইলে সহজেই যেগুলো যুগোপযোগী করার ব্যবস্থা করতে পারেন। এ ছাড়াও আমাদের ই-কমার্স, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো কার্যকরী আইন নেই। এই বিষয়গুলোও সংসদে উঠে আসা জরুরি। মানহানিকেন্দ্রিক মামলাগুলো ছাড়া টর্ট আইনেরও সেরকম কোনো চর্চা নেই এই দেশে। কর্তব্যে অবহেলা, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, অসদাচরণ, উত্পাত, গণউত্পাত, অনধিকার প্রবেশ ইত্যাদি বিষয়ক মামলা আদালতে সচরাচর দায়ের হতে দেখা যায় না। কারণ এগুলো সম্পর্কে যথেষ্ট জনসচেতনতা নেই। আবার অনেক আইন পুঁথিগত অবস্থায় থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ থাকে খুবই সীমিত। একজন জননেতাকে অবশ্যই এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। কারণ শুধু আইন প্রণয়ন করেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, আইনের প্রচার ও যথাযথ প্রয়োগের রাস্তাটিও তাদেরকেই গড়ে দিতে হবে।
একজন নেতা কতটুকু সফল হবেন সেটা নির্ভর করে তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ করতে পারছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি, নেতাদের সেগুলো নিয় যুগোপযোগী পরিকল্পনা করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। নির্বাচিত হলে আগামী পাঁচ বছর সেই লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে সত্, দেশপ্রেমিক ও নিবেদিতপ্রাণ নেতার বিকল্প নেই। আমাদেরকে এসব মাথায় রেখেই নেতৃত্ব নির্বাচন করা উচিত।
‘উন্নয়ন পরিকল্পনায় যেন পরিকল্পনাবিদদের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়’
—মীর রাসেল
শিক্ষার্থী, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
নগর পরিকল্পনা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে যে শব্দটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে, সেটি হলো ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা উন্নয়ন। হতে পারে সেটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা মানবসম্পদের উন্নয়ন। যেকোনো ধরনের উন্নয়নের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। কোনো ধরনের উন্নয়নের কথা চিন্তা করতে গেলে সবার আগে যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হয় সেটি বসতি কিংবা পরিবেশের সাথে কতটুকু মানানসই। দেখতে হয় উন্নয়নের এই পরিকল্পনা টেকসই কি না। ঢাকা শহরের কথাই বলি। আজকাল শহরের রাস্তায় বের হলেই দেখা যায়, রাস্তার অধিকাংশই চলে গেছে ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে। এতে সাধারণ জনগণের আর্থিক উন্নয়নের চিত্র ভেসে উঠলেও কমে গেছে শহরের গড় ট্রাফিক গতি। এই অসহনীয় ট্রাফিক জ্যামের বদৌলতে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে জণগণের মূল্যবান কর্মঘণ্টা। গণ-পরিবহণের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান। আজকাল একেবারে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায়ও তথ্যপ্রযুক্তি পৌঁছে গেছে। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট এখন আমাদের অনেক বড় একটি শক্তি। পরিকল্পনায় তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি স্মার্ট ডেভেলপমেন্ট সম্ভব যেখানে হয়তো ঢাকার ট্রাফিক সিস্টেমে থাকবে অত্যাধুনিক কন্ট্রোল ইয়ানেল, মেট্রোরেল বা সড়ক পরিবহনের ই-টিকেট থাকবে সবার হাতের মুঠোয়, যেখানে জ্যামে নষ্ট হবে না হাজারো কর্মঘণ্টা।
দেশের ভ্রমণ ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিকল্পনা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দিতে পারে অনেকটাই। পিছিয়ে পড়া ভ্রমণ স্থানগুলো গুছিয়ে নিয়ে এর পরিচর্যা, যোগাযোগের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং এর প্রমোশন বাংলাদেশের ভ্রমণব্যবস্থায় আনতে পারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। পরিকল্পনা এক ধরনের রাজনীতি। রাজনীতিতে শক্তিশালী দলরাই পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। আমি মনে করি, দেশের উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় পরিকল্পনাবিদদের আরও পর্যাপ্ত অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। আশা-প্রত্যাশার বাস্তবায়ন করতে পারা নেতৃত্বই সামনে আসুক, এমনই চায় এ প্রজন্ম।
‘সমস্যা সমাধানে স্থপতিদেরও পলিসি লেভেলে যুক্ত করতে হবে’
—ফেরদৌস বিন মাসুদ
শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
‘নেতা’ বা ‘নেতৃত্ব’ এই শব্দগুলোর সাথে আপামর জনতা পরিচিত, তবে বিশ্লেষণের দিক থেকে ব্যাখ্যা আলাদা। নেতা একজন অনুসরণীয় ব্যক্তি যার দিকে তাকিয়ে থাকে হাজারো জনতা। একজন সফল নেতা তিনিই হতে পারেন যার সাধারণ মানুষকে ভালোবাসার ক্ষমতা আছে, আছে সঠিক সিদ্ধান্তে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। বাংলাদেশ এমন-ই একজন নেতার হাত ধরে স্বাধীন হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালি জাতির পিতা। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অনেক উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সবার আগে এই স্বাধীনতা এবং প্রিয় দেশকে আগলে রাখা। একজন স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে হয়েছে আমরা এখনো পরিকল্পিত দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এখনো অপরিকল্পিত ভবন, রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে। কিছুদিন পর পর অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা কাটা হচ্ছে। এখনো বেশিরভাগ ফুটপাথ হকার আর অবৈধ স্থাপনাগুলো দখল করে রেখেছে। নাগরিক জীবনের বেশিরভাগ সমস্যাগুলো আমাদেরই সৃষ্টি। ছোট পরিসরে যদি শুধু ঢাকা শহরের কথাই চিন্তা করা হয় তাহলে দেখা যাবে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত আমাদের রাজধানী। এখানে অধিকাংশ জলাভূমি ভরাট করে অপরিকল্পিত স্থাপনা তৈরি হয়েছে; ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকা গুলশান, বাড্ডা, মহাখালিতে ক্যান্সারের মতো গড়ে উঠেছে বস্তি। এ ছাড়া জলাবদ্ধতা, যানজট, পরিবেশদূষণ এমনকি দুর্ঘটনার খবরগুলো আমাদের কাছে নিত্যদিনের বিষয়। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতটি আমাদের, কিন্তু সেখানেও আমরা অপরিকল্পিত উন্নয়ন করছি। অযত্ন করছি। এমন চিত্র প্রতিটি খাতেই। আগামীর নেতা হিসেবে যারা আসবেন, আমি বিশ্বাস করি, তারা আমাদের নগর ও সামাজিক পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন। এর জন্য দরকার পরিকল্পিত সমাধান ও দক্ষ পরিকল্পনাকারী। স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদেরকে পলিসি লেভেলে যুক্ত করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। তবেই সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন নগর ও নাগরিক সমস্যা সমাধানে নগর কর্তৃপক্ষগুলো নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর মধ্যে রাস্তায় নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর ডাস্টবিন স্থাপন, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, জেব্রা ক্রসিং অন্যতম। কিন্তু আমরাই সচেতনভাবে এসব ব্যবহার করি না। আমাদের নিজেদের মনমানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের প্রজন্ম এমন নেতার স্বপ্ন দেখে, যিনি দূরদর্শী, দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ববান ও সকলের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
‘সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হবে’
—নাদিয়া সুলতানা
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
লাখো সন্তানের আত্মোত্সর্গের প্রাপ্তি আমাদের আজকের সোনার বাংলাদেশ। যার রয়েছে সোনালি অতীত। স্বাধীনতা-পরবর্তী অগ্রযাত্রায় আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো, আজ বিশ্ব দরবারে জনবহুল এ দেশটি অন্যতম ‘উন্নয়নশীল দেশ’ হিসেবে স্বীকৃত। এমনই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য বাঙালিরা সংগ্রাম করেছিলেন যেখানে থাকবে না কোনো জাতি, ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ বৈষম্য; যেখানে সবাই কাঁধে কাঁধে হাত রেখে কাজ করবে বাংলাদেশ বিনির্মাণে। তবে এখনো আমরা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি।
একটি দেশের রাজনীতি সে দেশের সমাজ, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির বাইরের কিছু নয়। সমাজ, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিই রাজনৈতিক পক্ষ ও প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করে। আমরা এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতায় বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা বাড়বে না, বরং প্রতিটি দল জনগণের কাজ করে জনগণের দাবি আদায়ের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
আমরা চাই, সরকারি দল-বিরোধী দলের সমাবেশে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ নয়, বরং গঠনমূলক সমালোচনা ও দলীয় নেতাকর্মীরা সততার সাথে জনগণের জন্য কাজ করে দলকে জনপ্রিয় করতে বক্তৃতা দিবে। প্রতিটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের জনগণকে শোষণ নয়, বরং শাসনব্যবস্থায় সত্যের বিজয় নিশ্চিত করবে। সরকারি অফিস-আদালত জনগণের অনাস্থা ও অস্থিরতা নয়, বরং তা সর্বোচ্চ আস্থার জায়গা হিসেবেই পরিগণিত হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। সর্বোপরি দেশের সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সকল রাজনৈতিক দল এক থাকবে। যোগ্য নেতৃত্বই দেশকে এগিয়ে নিতে পারে, পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের স্বর্ণ শিকড়ে। আমরা আশাবাদী আগামীর নেতৃত্ব হবে জনকল্যাণমূলক ও জনবান্ধব। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জনমতের প্রাধান্য, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ দুর্নীতির অবসানের লক্ষ্যে কাজ করবে। যারা দেশ তথা জনগণের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে কাজ করবে। যাদের নেতৃত্বে দেশ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিপ্লবের সূচনা করবে।
আমাদের চাওয়া আমাদেরই পূরণ করতে হবে। আমাদের তারুণ্যকেই পরিবর্তনের চেতনায় জেগে উঠতে হবে। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা, মানসম্মত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, সুন্দর-শালীন বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে আমাদের নতুন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি আমরা চাই একটি সমৃদ্ধশালী দেশ।
‘দেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর ও শক্তিশালী করবে, এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি ’
—মাসুদ আহমেদ অপু
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সবুজ অভয়ারণ্য, সুজলা-সুফলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এ দেশে রয়েছে বহু প্রাকৃতিক সম্পদ। সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে মানবসম্পদ। আমাদের মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশের ছাত্র-জনতা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায় করেছে। পৃথিবীর কোথাও এমনভাবে ভাষার জন্য আন্দোলন করতে হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অর্জন করে স্বাধীনতা। যাত্রা শুরু হয় সোনার বাংলার। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রম করার পরও আমরা এখনো আশানুরূপ উন্নতি করতে পারিনি। কারণ বিভিন অঙ্গনে অস্থিরতা। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে থাকবে না রাজনৈতিক কলহ-মারামারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হবে সোনার বাংলাদেশ গড়ার সোনার লোক তৈরির কারখানা। দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন দলীয় নয়, যোগ্যতার মাপকাঠিতে মূল্যায়ন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। দেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে হবে। এমন নেতৃত্ব দেখতে চাই, যেখানে বিভক্তির দরজা বন্ধ করা হবে। তরুণেরা এমন নেতৃত্ব আশা করে, যেখানে মেধাবী তরুণদের দেশে যথাযথ মূল্যায়ন ও মর্যাদা দেওয়া হবে। আমরা জানি, দেশের মেধাবীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলে আর দেশে ফিরে আসে না। দেশ তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করে না। আমি আশাবাদী, আগামীর নেতৃত্বের হাত ধরে এতে পরিবর্তন আসবে। শিক্ষার্থীদের গবেষণা খাতে সরকারের বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। এমনটা হলেই মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর যেভাবে উন্নতি করেছে আমরাও সেভাবে এগোতে পারব। বতর্মান সরকারের আমলে আমরা চলমান উন্নয়ন দেখেছি। তরুণ সমাজ এখন আরও তারুণ্যনির্ভর রাজনীতি চায়, যারা যুগের সাথে তালমিলিয়ে দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য পরিকল্পনা করবে। অন্যদেশের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকে প্রাধান্য না দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক লাভ হয় এমন পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এই দেশে কৃষকদের যথাযথ মর্যাদা না দিয়ে এদেশের উন্নয়ন কখনো সম্ভব না। ওই খাতে আরও মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা হলো ভবিষ্যতে যারা নির্বাচিত হবেন, তারা সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাবেন। এভাবেই সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে।
