মুন্সীগঞ্জে বৃষ্টিতে বিনাশ বীজ আলু

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:০৩

নিম্নচাপের ফলে টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় আবাদকৃত বীজ আলুর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে রোপণ করা এসব বীজ আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে আবারও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের আলু উত্পাদনে শীর্ষ এ জেলার চাষিরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ছয় উপজেলায় ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। তবে কৃষকরা বলছেন, আলু আবাদের পরিমাণ এর থেকেও বেশি। বৃষ্টিতে রোপণ করা আলুর ৭০ ভাগ থেকে ৮০ ভাগই পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি হলে নষ্ট হবে সব বীজ। মৌসুমের শুরুতেই প্রকৃতির এমন বৈরিতায় দিশেহারা তারা। সদর ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও পানিতে তলিয়ে গেছে আলুর জমি, কোথাও জমিতে জমেছে পানি। কোথাও কোথাও আলুর জমিতে নালা করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছেন কৃষকরা। তবে কষ্টের টাকা দিয়ে আবাদ করা জমির এমন হালে হতাশ তারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় আলু রোপণ শুরু হয়। ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় উপজেলায় ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। সাধারণত হেক্টর প্রতি ২ হাজার কেজি বা ৫০ মণ বীজ আলু রোপণ করা হয়। তবে চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি বলছে, মুন্সীগঞ্জে হেক্টর প্রতি বীজ লেগেছে ২ হাজার ৬৫০ কেজি বা ৬৬ মণের বেশি। সে হিসাবে ১৬ হাজার ২০০ হেক্টরে বীজ রোপণ করা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার মণ আলু।

কৃষকদের হিসাবে হেক্টর প্রতি বীজ আলুতে খরচ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৫০ টাকা; অর্থাৎ বীজ আলুতে ২৩৬ কোটিরও বেশি টাকা খরচ হয়েছে, যা এখন পানিতে। বীজ ছাড়াও প্রতি হেক্টর জমিতে এবার আলু আবাদে সার লেগেছে ১৬০০ কেজি। ২২ টাকা কেজি সারের হেক্টরে খরচ ৩৫ হাজার ২০০ টাকা। জমির ভাড়া ৭০ হাজার টাকা। শ্রমিক মজুরি হেক্টরে ৩৭ হাজার টাকা আর অন্যান্য খরচ ১৫ হাজার টাকা, অর্থাত্ হেক্টরপ্রতি ভাড়া নিয়ে চাষ করতে চাষিদের খরচ হয়েছে ৩ লাখ ২ হাজার ৯৫০ টাকা প্রায়। সে হিসাবে বৃষ্টিতে ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা নষ্টের পথে। খাসকান্দি এলাকার মো. সেলিম হাওলাদার বলেন, ‘চার কানি জমিতে আলু রোপণ করেছিলাম। প্রতি শতাংশে ৩০ কেজি থেকে ৩৫ কেজি আলু রোপণ করেছি। শ্রমিক, সার, খড়কুটো সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সব লস। এখন যদি ভাগ্যে থাকে তাহলে কিছুটা বাঁচবে।’ দেওয়ান বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তমিজউদ্দিন খাঁ বৃষ্টি মাথায় নিয়েই জমিতে নালা কেটে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন। তবে প্রতিনিয়ত বৃষ্টিতে আবারও জমিতে জমছে পানি। বৃদ্ধ এই কৃষক বলেন, ‘আমাদের লাখ লাখ টাকা মাইর। ঋণ করে আলু লাগাইছি লাভের আশায়। প্রায় ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হইছে। এখন জমির পানি বের করছি। কিন্তু একটু পরপর বৃষ্টিতে আবার তলায় (ডুবে) যায়।’

জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের হেক্টরে বর্গা নিয়ে চাষ করতে খরচ হয়েছে ৩ লাখ ২ হাজার ৯৫০ টাকা। রোপণকৃত বীজ আলুর ৭০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ নষ্ট হবে। বাকি আলুতেও আশানুরূপ ফলন হবে না। ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়াবে। এখন বীজ যদি পচে নষ্ট হয়, তাহলে বীজসংকটে পড়তে হবে চাষিদের। তাছাড়া আবারও আলু রোপণ করতে অনেকটা বিলম্ব হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আমাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হোক। অন্তত বীজ-সার সুলভমূল্যে পেলে আমাদের জন্য উপকার হবে।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা এবিএম ওয়াহিদুর রহমান বলেন, ‘এখন যদি বৃষ্টি কমে তাহলে ক্ষয়ক্ষতি তেমন হবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি হলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে। আমাদের পরামর্শ হলো, যেসব জমিতে পানি জমেছে, তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। পানি অপসারণ করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যাবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. আব্দুল আজিজ বলেন, চাষিরা অনেক টাকা দিয়ে আবাদ করেছেন। তবে সব নষ্ট হবে না। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জমির আলু কতখানি নষ্ট হয়েছে আর কতটুকু ভালো রয়েছে, তা স্পষ্ট হবে। তখনই ক্ষতির পরিমাণ বলা যাবে। পরবর্তীকালে সেই রিপোর্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠানো হবে। তখন কোনো প্রণোদনা দেওয়া হলে কৃষকদের মাঝে বণ্টন করা হবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম