শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

৪০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে খোট্টা ভাষীরা

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:৫৩

কা যা তাই? সেন্টার মে যা তাই। কয় রিপ্পে? বিশ রিপ্পে। কয় জন আতাহে? ২ জন।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বন্দর কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় এক রিকশাওয়ালা ও যাত্রীর মধ্যে এমন কথোপকথন দেখে থেমে গেলাম। তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম তারা এটা কোন ভাষায় কথা বলছেন। তারা জানান এটা তাদের গ্রামের খোট্টা ভাষা। তারা নিজেদের মধ্যে এই ভাষাতেই কথা বলেন এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাভাবিক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। নিজেদের মধ্যে কি কথা হয়েছে জানতে চাইলে তারা চলিত ভাষায় তা পুনরাবৃত্তি করেন যার অর্থ হলো ‘কোথায় যাবেন? আমি সেন্টারে যাবে। ভাড়া কয় টাকা? ভাড়া বিশ টাকা। কতজন আছেন? দুজন আছি।’

এই ভাষা কেমনে শিখেছেন জানতে চাইলে মো. হেলাল উদ্দিন নামের আরেক রিকশাচালক বলেন, ‘খোট্টা বাত হামসব পরিবার ছে ছিখাই, হামসব হামসবকা বাথ কতাজু, খোট্টা বাত আমডাছে আচ্চা লাগে’ (খোট্টা ভাষা আমরা আমাদের পরিবারের কাছ থেকে শিখেছি। আমরা সবাই নিজেদের মধ্যে এই ভাষায় কথা বলি এবং এই খোট্টা ভাষায় কথা বলতে আমাদের খুব ভালো লাগে)।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় কয়েক শতক ধরে উপজেলার ১ নম্বর বৈরাগ ইউনিয়নের উত্তর বন্দর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে খোট্টা ভাষাভাষী গোষ্ঠী। তাদের ভাষার নামানুসারে আশেপাশের লোকদের কাছে তাদের গ্রামের নাম ‘খোট্টা পাড়া’ নামে পরিচিত। গ্রামটিতে হিন্দু-মুসলিম মিলে অন্তত এক হাজার পরিবারের ৮ হাজারেরও বেশি লোকজন বসবাস করে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ছবি: ইত্তেফাক

খোট্টাদের সঙ্গে কথা বলে ও বিভিন্ন বইয়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী খোট্টাভাষীদের পূর্বপুরুষরা মুঘল সেনা সদস্য হিসেবে ভারত থেকে আনোয়ারায় আসেন। সম্রাট শাহজাহান তার দ্বিতীয় পুত্র শাহজাদা শাহ সুজাকে ১৬৩৯ সালে বাংলার সুবাহ্ দার নিয়োগ করেন। ওই সময় এ দেশে বর্গি, ফিরিঙ্গি ও পর্তুগিজরা লুটতরাজ চালাচ্ছিল। তাদের দমনে চট্টগ্রামে ৮ হাজার সৈন্য পাঠানো হয় মুঘল দরবার থেকে। আজকের খোট্টাদের পূর্বপুরুষরা সেই সেনাদলেরই অংশ ছিলেন। তাদের আদি নিবাস ছিল ভারতের বেনারসের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই সৈনিক ছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালে মুঘলদের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের পতনের মধ্য দিয়ে অবিভক্ত ভারতবর্ষের শাসনভার আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের হাতে চলে যায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে খোট্টা ভাষাভাষী মুঘল সৈনিকেরা আনোয়ারার উত্তর বন্দর গ্রামে জনসাধারণের সঙ্গে বসবাস শুরু করে। কয়েক শতাব্দী পর তারা এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে মিশে গেলেও সে সময় থেকে এখনও তারা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রেখেছে।

স্থানীয়রা জানান, গ্রামটি থেকে অনেকেই বড় বড় পদাধিকার করেছেন। তার মধ্যে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যান হয়েছেন। বর্তমান নারী ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন খোট্টাভাষী।

মোহাম্মদ রায়হান নামের আরেক খোট্টাভাষী জানান, বেশির ভাগ হিন্দি ও অল্পবিস্তর বাংলা মিশ্রিত আমাদের এই ভাষা। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কেমন আছেন’কে খোট্টা ভাষায় ‘আচ্ছে নি, কেছাই?’ বলে। এর উত্তরে ‘ভালো আছি’ এর জায়গায় ‘আচ্ছাই’ বলে। ‘কি কর’-এর স্থলে ‘কিয়াত্তাই’ ও এর উত্তরে ‘বসে আছি’-এর বদলে ‘বেটকেলয়ে’ বলি।

ছবি: ইত্তেফাক

খোট্টাভাষী আনোয়ারা উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মরিয়ম বেগম বলেন, ‘আগে আমরা নিজেদের মধ্যে আমাদের খোট্টা ভাষায় কথা বলতাম। আমাদের মুরব্বিরাও খোট্টা ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের মুখ থেকে খোট্টাভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও শুদ্ধ-চলিতভাষী হয়ে উঠেছে। কারণ এখানকার মেয়েদের বিভিন্ন জায়গায় বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের ছেলেদের জন্য বউ (পুত্রবধূ) আনা হচ্ছে। তাই তারা এখন জন্মের পর থেকে সন্তানদের চলিত ভাষায় কথা বলা শেখাচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে খোট্টা ভাষা বিলুপ্ত হতে চলেছে।’

খোট্টাভাষীদের ইতিহাসের বিষয়ে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও গল্পকার জামাল উদ্দিন বলেন, ‘খোট্টারা প্রকৃত অর্থে উত্তর ভারতীয়। ১৬৬৬ সালে মুঘল সৈন্য হয়ে তারা চট্টগ্রাম জয়ের লক্ষ্যে আসেন। তাদের মধ্যে দুই হাজার সৈন্য প্রাচীন বন্দরনগরীতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে মুসলিম খোট্টা ও হিন্দু খোট্টা নামে দুটি গ্রুপ ছিল। সেই দুই গ্রুপের সেনাপতি ছিলেন জবরদস্ত খাঁ (মনু মিয়া)। চট্টগ্রাম জয়ের পর তারা বন্দরের দুর্গে বসবাস করতে শুরু করে। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে এসে তাদেরকে চাকরিচ্যুত করে। এরপর তারা দুর্গের পার্শ্ববর্তী এলাকা উত্তর বন্দর এবং দক্ষিণ বন্দরে বসবাস করতে শুরু করেন। তারা এখনও নিজেদের মধ্যে উত্তর ভারতীয় সেই খোট্টা ভাষায় কথা বলে থাকেন।’

ইত্তেফাক/এইচএ