>> আফফান ইয়াসিন
আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড ও জ্ঞানই শক্তি। যুগের সাথে পালা দিয়ে আমাদের দেশও এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটালের দিকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা এমনই কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তারা বুঝতে পারল যে, তাদের চোখের সামনে যেই বয়সটায় বাচ্চারা বই-খাতা নিয়ে স্কুলে থাকার কথা, ঠিক সেই বয়সে তারা বিভিন্ন গ্যারেজ, কারখানা, কারওয়াশ, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, লেগুনা, বাসের সহায়ক ও রেল লাইনের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে নিজেদের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করছে। আবার কেউ কেউ মদ, জুয়া, ইয়াবা ইত্যাদি নেশায় আসক্ত হয়ে নিজেদের ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দিকে। বিনিময়ে আমরা অর্জন করছি পথশিশু, শিশুশ্রম, অশিক্ষিত জাতি, বাল্য বিবাহ ইত্যাদি। আর এসব কিছু হতে দেশ এবং জাতিকে রক্ষা করতেই ২০১১ সালে একদল উদ্যোগী স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে এডু-আলো স্কুল নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন চবির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সাইমুম রেজা পিয়াস। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে চবি রাজনীতি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মো. শামীম মিজিসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ উদ্যোগী ছাত্র-ছাত্রীরা। সরকারের ঘোষিত ছুটিসহ বিশেষ দিন উপলক্ষে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। সেখানে ক্ষণিকের জন্য হলেও শিশুদের মুখে হাসি ফুটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়। এ ব্যাপারে স্কুলটির বর্তমান ডিরেক্টর মো. শামীম মিজি বলেন, ‘সমাজের অধিকারবঞ্চিত কোমলমতি শিশুদের প্রিয় পাঠশালা রোটারি লট এডু-আলো স্কুল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একদল শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে তোলা অন্যতম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এডু-আলো। সুবিধাবঞ্চিত ও শিক্ষাবঞ্চিত ছিন্নমূল শিশুদের আলোর পথ দেখানোর এক উদীয়মান সূর্য। এখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অক্ষর জ্ঞান ছাড়াও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাদানের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, ইফতার বিতরণ, রক্তদান কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধিসহ আলোকিত দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছে এডু-আলো নামের এই সংগঠনটির সদস্যরা। আর এ সবই হচ্ছে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। আরও বলেন, শুক্রবার ব্যতীত প্রতিদিন দুপুর ১-৩টা পর্যন্ত বায়েজিদ আবাসিক এলাকায় অবস্থিত একটি অস্থায়ী ভবনে পাঠদান করা হয় এ শিক্ষার্থীদের। এখানে বর্তমানে ৬০ জন শিশুশিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানে যারা পড়াশোনা করছে তাদের সবাই কোনো না কোনো কাজের সাথে জড়িত। কেউ ভিক্ষাবৃত্তি, কেউবা বাসাবাড়িতে কাজ করাসহ বিভিন্ন শিশুশ্রমের সাথে জড়িত। কোমলমতি শিশুদের এসব জঘন্য কর্মকাণ্ডের হাত থেকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এ সংগঠনটি ২০১১ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করে। এখানে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা দেওয়া হয়। অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান, ছবি আঁকা, গল্প কিংবা গানের আসর সবই রয়েছে এ স্কুলের পাঠ্য তালিকায়। এ ছাড়াও দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে সকল জাতীয় দিবসগুলোও উদযাপন করা হয়। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে সমাজকে আলোকিত করাই এ সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুশিক্ষা প্রদান, মানসিক বিকাশ সাধন ও সুন্দর ভবিষ্যত্ গঠনের অনুপ্রেরণা প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে চলছে এডু-আলো সংগঠন। বর্তমানে রাস্তা ও রেল লাইনের পাশে তাকালে চোখে পরে হাজার হাজার অভিভাবকহীন শিশুদের। যাদের অনেকেই নিজের পরিচয় সম্পর্কে অবগত নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় তাদের অধিকাংশই গরিব ও অসহায়। অভাবের শিকার হয়ে ছিটকে পড়ে স্কুল থেকে। এদের কারো বাবা-মা থাকলেও নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নেয় না। বরং অভাবের তাড়নায় পাঠিয়ে দিচ্ছে কাজে। এভাবে দেখা যায় প্রতি বছর পথশিশুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। তাদের জীবনের মৌলিক অধিকারগুলো হতেও তারা বঞ্চিত। একটা দেশের ভবিষ্যত্ নির্ভর করে ওই দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের উপর ভিত্তি করেই। প্রজন্মের একটি বিরাট অংশজুড়ে আছে পথশিশুরা। আর তাদের বাদ দিয়ে উন্নয়নের কথা চিন্তাও করা যায় না। তাই এডু-আলো প্রতিষ্ঠান তাদের অধিকার আদায়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
