বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

টাঙ্গাইল শাড়ির ‘রাজধানী’ পাথরাইল

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:০৫

‘চমচম টমটম ও শাড়ি

এই তিনে টাঙ্গাইল বাড়ি’

যাদের বাড়ি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলায়, তারা নিশ্চয়ই বুক ফুলিয়ে এই প্রবাদ বলে থাকেন। তাদের মুখে আরো বেশ কয়েকটি প্রবাদ শোনা যায়; যেমন - ‘আমার ঘর; আমার বাড়ি, গর্বের ধন টাঙ্গাইল শাড়ি’ কিংবা ‘নদী চর খাল বিল গজারির বন/টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।’

যাদের জন্মই হয়েছে তাঁতের খটখট শব্দ শুনে, যারা জানে প্রতিটি শাড়ি বুননের মধ্যেই লেপ্টে আছে ইতিহাসের গন্ধ, তারা তো এই তাঁতশিল্প নিয়ে গর্ব করবেই! তাঁতশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো কুটিরশিল্প। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তারই ঐতিহ্য বহন করে। টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা তাদের বংশ পরম্পরায় তৈরি করছেন এ শাড়ি। তাই জেলার নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে  ‘টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি’। আর টাঙ্গাইল শাড়ির ‘রাজধানী’ বলা হয় পাথরাইলকে।

পাথরাইল কেন আলাদা
উত্সবে হোক বা বাড়ির আঙিনায়, আটপৌরে ঢঙে কিংবা জমকালো সাজে; বাহারি শাড়ির ভিড়ে বাঙালি নারীদের পছন্দের তালিকায়  জায়গা করে নিয়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। মূলত টাঙ্গাইল শাড়ির সেই সুনামটা অক্ষুণ্ন রাখতে দিন-রাত মেধা-মনন খাটিয়ে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পাথরাইল এবং এর আশপাশের প্রায় ৫০০ পরিবার।

টাঙ্গাইল শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলায় পাথরাইলের অবস্থান। এখানে ঘরে ঘরে তৈরি হয় তাঁতের শাড়ি। সারা বছরই এখানে শাড়ির বাজার জমজমাট থাকে। তাঁতিরা জানান তারা সাধারণ তাঁতের শাড়ির পাশাপাশি দামি শাড়ি তৈরি করেন যার দাম ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব শাড়ি সব মানুষের চাহিদা পূরণ করে। এছাড়া অর্ডার পেলে আরো উচ্চমূল্যের শাড়িও তারা তৈরি করেন।

এছাড়াও টাঙ্গাইলের অনেক এলাকায়ও টাঙ্গাইল শাড়ি  বোনা হয়, তারপরও পাথরাইল কেন আলাদা? কারণ পাথরাইল ইউনিয়নে চার শতাধিক সনাতনী তাঁত রয়েছে, যা অন্য কোথাও নেই। পাথরাইলের প্রবীণ শাড়ি ব্যবসায়ী রঘুনাথ বসাক বলেন, সনাতনী তাঁতের শাড়ির অনেক দাম। এসব তাঁতে তিন মাস সময় নিয়েও একটি শাড়ি বোনা হয়, যেটির দাম ১০ লাখ পর্যন্তও হতে পারে। এ ছাড়া এখানে চিত্তরঞ্জন তাঁতও রয়েছে।

টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তৈরি করতে হাতের কাজ করা হয় খুব দরদ দিয়ে, গভীর মনোসংযোগের সাথে এবং অত্যন্ত সুক্ষ্মদৃষ্টিতে। পুরুষেরা তাঁত বোনে; আর চরকাকাটা, রঙকরা, জরির কাজে সহযোগিতা করে বাড়ির মহিলারা। তাঁতিরা মনের রঙ মিশিয়ে শাড়ির জমিনে শিল্পসম্মতভাবে নানা ডিজাইন করে বা নকশা আঁকে, ফুল তোলে। জানা যায়, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি প্রধানত দুই ধরনের তাঁতের মাধ্যমে তৈরি হয়। ‘পিটলম’ তাঁত বস্ত সভ্যতার উষালগ্ন থেকে শুরু হয়। ‘পিটলম’ তাঁতের বস্ত্র তৈরি করতে তাঁতিদের পরিশ্রম বেশি হয়। এ শাড়ি তৈরি করতে খরচও বেশি পড়ে। এসব তাঁতে সাধারণ শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে তিন থেকে চার দিন। আবার ‘চিত্তরঞ্জন’ তাঁতের শাড়ি তৈরি করতে তাঁতিদের ততোটা পরিশ্রম হয় না, উত্পাদন হয় বেশি, খরচ কম হয়।

ঈদ ও পূজা থাকুক আর না থাকুক, এখানকার তাঁতিদের ব্যস্ততা লেগে থাকে সারাবছর। ঘরে ঘরে বছরজুড়ে যেসব শাড়ি তৈরি হয় তা পৌঁছে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব শাড়ি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে টাঙ্গাইলের শাড়ি যাচ্ছে।

তাঁতিদের আগমন কীভাবে?
বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণকাহিনীতে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের উল্লেখ রয়েছে। তাঁতশিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে টাঙ্গাইলের সফট সিল্ক ও কটন শাড়ি। এ শাড়ির বৈশিষ্ট্য হলো পাড় বা কিনারের নান্দনিক কারুকাজ। একসময় টাঙ্গাইলের তাঁতিরা মসলিন শাড়ি বুনতেন বলেও শোনা যায়। সে মসলিনের দিল্লির মোঘল দরবার থেকে বৃটেনের রাজপ্রাসাদ অবধি গতি ছিল।

টাঙ্গাইলে তাঁতশিল্প প্রসার প্রায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়- বসাক সম্প্রদায়ের লোকেরাই টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি। মূলত হিন্দু তাঁতিদের মৌলিক উপাধি হলো বসাক। এরা আসলে দেশান্তরি তাঁতি। ঢাকা ও ধামরাই ছিল যাদের আদি নিবাস।

জানা যায়, টাঙ্গাইল শাড়ির নতুনত্বের অন্যতম সফল তাঁতিদের মধ্যে বাজিতপুরের আনন্দ মোহন বসাক, সীতানাথ বসাক, চন্ডি গ্রামের নীল কমল বসাক, মনে মন্টু; নলসুন্দা গ্রামের হরেন্দ্র বসাক, পাথরাইল গ্রামের রঘুনাথ বসাক, আনন্দ, গোবিন্দ, সুকুমার বসাক, খুশি মোহন বসাক-এর নাম উল্লেখযোগ্য। তারা জানান টাঙ্গাইলের শাড়ি বুননের মূল কাজ একেবারেই আলাদা। অনেক পুরোনো একটা ঐতিহ্যের ধারায় চলে একাজ। সেই জ্ঞান ও নিষ্ঠা ছাড়া আসল টাঙ্গাইলের শাড়ি তৈরি করা যায় না। আসল টাঙ্গাইলের শাড়ি তৈরির জন্য এর তাঁতি বা কারিগরদের শিল্পী হয়ে উঠতে হয়। আমাদের টাঙ্গাইলে সেই শিল্পী তাঁতি আছে। তাই টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প ও তাঁতের শাড়ির এতো সুখ্যাতি।

এছাড়া মুসলমান যে সব তাঁতি ছিলেন  তাদেরকে  বলা হতো জোলা। এই জোলা তাঁতিদের সংখ্যাধিক্য ছিল টাঙ্গাইল, কালিহাতী ও গোপালপুর। ক্ষৌম বস্ত্র বো মোটা কাপড় বোনার কাজে এদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। সুতো কাটার চরকা এদের প্রত্যেক পরিবারেই ছিল এবং পুত্র কন্যাসহ পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই সুতা কাটা ও কাপড় বুনতে সারাদিন ব্যস্ত থাকত । 

পাথরাইল থেকে বেরিয়ে...
পাথরাইল ছাড়াও জেলার পাথরাইল, চন্ডি, বাজিতপুর, নলসন্ধ্যা, নলুয়া, বড়টিয়া, চিনাখোলা, মঙ্গলহোড়, টেগুড়ি, বীরপুষিয়া, গোপালপুর, রূপসী, ডুলুটিয়া, ছিলিমপুর, দেলদুয়ার, পোড়াবাড়ী, চাড়াবাড়ী, এনায়েতপুর, করটিয়া, কালিহাতী, বল্লা, রামপুর, মমিননগর, কোকডহরা, নাগবাড়ি, কাজীবাড়িসহ তাঁতপল্লী এলাকাগুলোতে প্রবেশ করলেই শোনা যায় তাঁতের খটখট শব্দ। এসব তাঁতে চলে দিন-রাত চলছে কাপড় বুননের প্রতিযোগিতা।

দেশ ভাগের পূর্বে মহানগরী কলকাতায় বসতো টাঙ্গাইল শাড়ির বাজার। স্টিমার বা জাহাজে চড়ে কলকাতায় যেতেন তাঁতিরা। কলকাতা তথা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা কিনতেন এই সব সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের তাঁতের শাড়ি। বর্তমানে টাঙ্গাইলে তাঁতের শাড়ির প্রধান হাট হচ্ছে বাজিতপুর। ভোর রাত হতে এখানে হাট শুরু হয়, সকাল ৯-১০টা পর্যন্ত চলে হাটের ব্যতিব্যস্ততা এবং বেচাকেনা। সপ্তাহে দুদিন বসা এ হাটের বেশিরভাগ ক্রেতারাই মহাজন। এছাড়া বিদেশি ব্যবসায়ীরা শাড়ি নিতে আসেন এখানে। বিশেষ করে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেশ লক্ষ করা যায় এখানে।

ইত্তেফাক/এসটিএম