যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন বলিয়াছিলেন, ‘সেই সরকারই সর্বোত্তম যেই সরকার সবচাইতে কম দায়িত্ব গ্রহণ করে, সীমিত আকারে গঠিত হয়। ইহার বড়ো কারণ, আকারে ছোটো সরকারে জনগণ নিজেরাই ডিসিপ্লিনড, অর্থাত্ সুশৃঙ্খল হইয়া থাকে।’ সারা বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের মধ্যে সরকারের আকার লইয়া বিতর্ক আছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান অথবা যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ দল সীমিত আকারের সরকারের কথা বলিয়া থাকে; অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি বড়ো আকারের সরকার চাইলেও জনপ্রিয় লিবারেল পার্টি ছোটো আকারের পক্ষে। তবে ইহা পরিষ্কার যে, সরকারের আকার ছোটো হইলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। ইহাও আজ পরীক্ষিত সত্য যে, প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজিং সিস্টেম চাকরির বাজারে সুযোগ বৃদ্ধি করিয়া থাকে। বিমাব্যবস্থাও বিকাশ লাভ করিয়া থাকে, যাহা সাধারণ মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। পক্ষান্তরে আমরা দেখিতে পাই, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে রাজনৈতিক দলগুলি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াই সরকারের আকার বড়ো করিতে সচেষ্ট হইয়া পড়ে। বোধগম্য, ইহার প্রধান ও বাস্তব কারণ রাজনৈতিক কর্মীদের একটি বড়ো অংশকে সরকার পরিচালনায় সম্পৃক্ত করিতে চাওয়া। সেই সঙ্গে সবকিছু কুক্ষিগত রাখিবার প্রবণতাও বটে। এই কাজ করিতে গিয়া বিভিন্ন খাতকে জাতীয়করণ করা হয়। এমনকি যুগের পর যুগ যেই সকল প্রতিষ্ঠান কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই লোকসান গুনিতেছে, সেইসব খাতে বত্সরের পর বত্সর অর্থ অপচয় করিতে দেখা যায়। অথচ একই খাতে প্রাইভেট কোম্পানিগুলিকে সফলতার সঙ্গে বাণিজ্য করিয়া লাভ তুলিয়া নিতে দেখা যায়। সুতরাং ইহাই সত্য, বিশেষ করিয়া সীমিত সম্পদ ও সীমিত আয়ের দেশে সরকারের আকার বড়ো হওয়া নেতিবাচক ফল দিয়া থাকে।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মুখ্য দায়িত্ব হইল জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের নিরাপত্তা বিধান করা, সমাজে শান্তি বজায় রাখা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। আরোপিত দায়িত্বসমূহ পালনের স্বার্থে সরকার রাজস্ব আদায় করে, শাসনকার্য পরিচালনা করে এবং উন্নয়নকাজে করিয়া থাকে। বিভিন্ন খাতকে জাতীয়করণের মাধ্যমে ব্যবসায় প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া সরকারের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। আমাদের বোধগম্য নহে, যেই সকল দেশ শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য খাত, কৃষি খাত ও যোগাযোগ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলির ব্যবস্থাপনায় অপারগ, তাহারা কেন এই খাতগুলিকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাখিতে চাহে? আমাদের বাংলাদেশের বেলাতেও এই বিষয়গুলি গভীরভাবে ভাবিতে হইবে। দেশে বিভিন্ন লোকসানি খাত লইয়া এমনকি নূতন মন্ত্রণালয় খুলিয়া বসিতে দেখা যায়! এইসব ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকাইয়া বাস্তব চিন্তা করিতে হইবে। উদাহরণ লইতে হইবে অর্থনৈতিকভাবে সফল দেশগুলি হইতে।
