ড. আর এম দেবনাথ
অর্থবছরের প্রথম দিনেই একটি ধাক্কা দেয়া সংবাদ। সংবাদটি গ্যাসের মূল্যের ওপর। দৈনিক ইত্তেফাক এর শিরোনাম করেছে, ‘গ্যাসের দামে বড়ো লাফ’। আসলেই খুব বড়ো লাফ। সংশ্লিষ্ট খবরটিতে বলা হয়েছে এর আগে কখনো এতো বেশি হারে গ্যাসের দাম বাড়েনি। ২০১৫ সালে এর দাম বেড়েছিল মাত্র ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ হারে। ২০১৭ সালে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল আরো কম হারে। সেবার মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে বৃদ্ধির পরিমাণ কখনো ২০ শতাংশের ওপরে হয়নি। এবার কী এমন ঘটল যে, ‘বিইআরসি’ এক লাফে প্রায় ৩৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ঘটাল। গৃহস্থালি ব্যবহারে এক চুলার খরচ মাসিক ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে হবে ৯২৫ টাকা। দুই চুলার খরচ ৮০০ থেকে বেড়ে হবে ৯৭৫ টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে এবারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসাবে বলা হয়েছে যে, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে। যে বৃদ্ধি করা হয়েছে তা নীতিনির্ধারকদের মতে সহনীয় ও বাস্তবসম্মত। একটি প্রশ্নের জবাবে তারা বলেছেন, এবার থেকে গ্যাসের সরবরাহ হবে সুনিশ্চিত। বলা হয়েছে গ্যাস না থাকা, বা কম থাকার চেয়ে অপেক্ষকৃত বেশি দাম শ্রেয়। তাতে উন্নয়ন সহজতর হয়। সরকারের এই যুক্তির বিরুদ্ধে ‘কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ক্যাব) বলেছে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক ও অন্যায়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, গ্যাসের এভাবে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক। বিশেষভাবে গৃহস্থালির ব্যবহারের ক্ষেত্রে। বাজারে এমন একটি ধারণা যে, গৃহস্থালি ব্যবহারে প্রচুর গ্যাস ব্যবহূত হয়। এমনকি প্রচুর গ্যাস ব্যবহূত হয় ‘সিএনজি’ হিসাবেও; কিন্তু তথ্য বলছে মোট গ্যাসের মাত্র ১৪ শতাংশ ব্যবহূত হয় বাড়ি-ঘরে এবং মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ ব্যবহূত হয় সিএনজি হিসেবে। বাকি ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ গ্যাস ব্যবহূত হয় বিদ্যুত্ উত্পাদন, শিল্প ও ক্যাপটিভ খাতে। এমতাবস্থায় গৃহস্থালি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার একটু ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে পারত। এতে রাজস্ব আয়ে খুব বড়ো ক্ষতি হতো বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কথা হচ্ছে অন্যত্র। মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়েছে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর থেকে। ঐ ‘শক’ হজম করতে করতেই এসে গেল গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির খবর। এটা খবর তো খবর নয়, আসল খবর সামনে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির আরো বড়ো খবর আছে সামনে। এর অর্থ কী দাঁড়াবে? প্রথম অর্থের কথা ব্যবসায়ীরাই বলে দিচ্ছেন। শিল্পপতিরা ইতিমধ্যেই তাঁদের প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উত্পাদনের ব্যয় বহুলাংশে বাড়বে। এতে দেশীয়ভাবে পণ্যের দাম বাড়বে, যা ক্রেতাদের সহ্যসীমার বাইরে চলে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের কথা হলো যে, বিদেশে আমাদের শিল্পের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা হ্রাস পাবে। এমনিতেই রপ্তানিমুখী শিল্প সরকারের ভর্তুকি নিয়ে বেঁচে আছে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভর্তুকির চাপ সরকারের ওপর বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। শিল্প উদ্যোক্তাদের আরো দুশ্চিন্তার কারণ আগামীদিনের সম্ভাব্য বিদ্যুত্ মূল্যবৃদ্ধি। এসবের ফল কী তা আমাদের সবার জানা। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এতে মূল্যস্ফীতি ঘটবে। সরকারি তথ্যেই দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি প্রতি মাসে বাড়ছে। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। নতুন কার্যকর বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ। এটা কীভাবে সম্ভব বাজেটের কারণে এক দফা মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির জন্য এক দফা মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। পবিত্র রোজার মাস আছে। আমরা জানি, দেশের একশ্রেণির ব্যবসায়ী এই পবিত্র মাসে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়। তারা ধর্মপ্রাণ মানুষকেও মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে রেহাই দেয় না। এর পরও ঝুঁকি থাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে, সরবরাহ ঘাটতির কারণে যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে তার। এতসব সত্ত্বেও সরকার কীভাবে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখবে তা ভবিষ্যত্ই বলবে।
যে কথা বলছিলাম, এবারের বাজেটে এমন কোনো জিনিস নেই, যার মূল্যবৃদ্ধি ঘটেনি। চিনি, ভোজ্য তেল—সয়াবিন, সরিষার তেল, গুঁড়া দুধ, আইসক্রিম, গুঁড়া মসলা, আচার, চাটনি, বোতল, ফ্লাস্ক, তৈজসপত্র ও আসবাবপত্র থেকে শুরু করে প্রায় সব সেবায় বসানো হয়েছে ভ্যাট। অথবা বাড়ানো হয়েছে ভ্যাটের হার। হোটেলভাড়া বাড়বে। বেড়েছে গাড়ির নিবন্ধন খরচ। ট্রেড লাইসেন্সের ফি এক লাফে বেড়েছে ছয় গুণ। তালিকা আর বাড়ানোর দরকার নেই। এসব বৃদ্ধির অবশ্যম্ভাবী ফল পড়বে যাতায়াত খরচের ওপর, বাড়িভাড়ার ওপর, ড্রাইভারের বেতনের ওপর। ইতিমধ্যেই রিকশাভাড়া বেড়েছে। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ইত্যাদির দাম এক দফা বেড়েছে। এক কেজি ছোট চিংড়ির দামও ১ হাজার টাকা। ছোটো ছোটো পুঁটির কেজিও ৪০০-৫০০ টাকা। খাসির মাংসের দাম কেজি প্রতি ৮০০-৯০০ টাকা। এভাবে সমস্ত জিনিসপত্রের দামই বাড়ছে। দুই দিন পর বাসভাড়া, ট্রাকভাড়া, লঞ্চভাড়া বাড়বে। এর ফলও দ্রব্যমূল্যের ওপর পড়বে। অনেক মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে সাভারের দিকে, জয়দেবপুরের দিকে। ছিলেন গোপীবাগে, সেখান থেকে মিরপুরের ভেতরের দিকে। বাড়িভাড়া বাঁচানোর জন্য তারপর অনেকে গিয়েছেন সাভারে। রিকশা চড়া বাদ দিয়ে মানুষ উঠছে বাসে। হেঁটে হেঁটে মা-বোনেরা শিশুদের নিয়ে যাচ্ছে স্কুলে। দুই কেজি চিনির স্থলে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত এখন কিনছে এক কেজি। এভাবে ভোগ হ্রাস করে, সেবাগ্রহণ কমিয়ে মানুষ বাঁচার চেষ্টা করছে। মধ্যবিত্ত হচ্ছে নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত হচ্ছে গরিব, গরিব হচ্ছে অতি দরিদ্র। এসব মুখের কথা নয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য। ২০১০ এবং ২০১৬ সালের মধ্যকার তথ্য।
এটা হতো না যদি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের আয় সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাড়ত। এটা কোনো দেশেই হচ্ছে না। আমাদেরও হচ্ছে না। আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, প্রতিদিন জিসিপত্রের দাম বাড়ছে। কত আন্দোলন, সংগ্রাম, মিটিং-মিছিল আমরা করেছি মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে। এখন সবাই নিস্তেজ, ক্লান্ত। এটা পরিষ্কার, মূল্যবৃদ্ধি নামীয় দানবের হাত থেকে মানুষের রেহাই সেই। তাহলে উপায়? উপায় মানুষের রোজগার-আয় বাড়ানো। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। বেকারত্ব দূর করা। চাকরিচ্যুতির ঘটনা হ্রাস করা। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেতন-মজুরি বৃদ্ধি করা। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। সরকার মাঝে মাঝে তা বাড়ায়। গেলবার তো বাড়ানো হয়েছে নজিরবিহীনভাবে। ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।’ কিন্তু লক্ষ-কোটি মানুষ, যারা বেসরকারি খাতের কর্মী, শ্রমিক—তাদের কী হবে? তাদের বেতন-ভাতা তো বাড়ে না। এমনকি কাজ করেও শ্রমিকরা নিয়মিত বেতন পায় না। সরকারি করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী-কর্মচারীরাও তাদের অবসরকালীন সুবিধা পায় না, পাচ্ছে না। এই যে পরিস্থিতি, একদিকে মূল্যবৃদ্ধি অন্যদিকে বেতন-ভাতায় স্থবিরতা, কর্মসংস্থানে ব্যর্থতা এবং কর্মচ্যুতি এর পরিণতি কী? বাজার অর্থনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে এসব তুমুল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ‘জবলেস গ্রোথের’ কথা উঠেছে। পৃথিবীর বহু দেশেই এই কথা উঠেছে। এর থেকে আমাদের রেহাই পেতে হবে। মূল্যবৃদ্ধিকে বাস্তবতা মেনে আয়বৃদ্ধির পথ বের করতে হবে। অবশ্য মূল্যবৃদ্ধিকেও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। এর জন্য প্রাশাসনিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও দরকার। আবার একশ্রেণির ব্যবসায়ীর উশৃঙ্খলতাও রোধ করতে হবে। তারা যাতে কথায় কথায় দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে না পারে তার ব্যবস্থাও করতে হবে।
সবচেয়ে বড়ো কথা আরেকটি। এই কথাটি আগেই বলতাম। এখন বলছি। কথাটি হচ্ছে, মূল্যবৃদ্ধির কোনো বিকল্প ছিল কি না? এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। দেখা যাচ্ছে, বিশেষজ্ঞদের বিচারে বিকল্প ছিল। সরকারের যুক্তি সোজা। বিদেশ থেকে তরলীকৃত গ্যাস আমদানিতে লাগবে ১৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের কাছ থেকে তোলা হবে ১০ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকার দেবে ৭ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। এসব যুক্তির পক্ষে ও বিরুদ্ধে যুক্তি আছে। প্রতিষ্ঠিত সত্য এই যে, প্রতি মাসে ‘সিসটেম লস’-এর পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা। এতে বছরে ব্যয় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ তথ্য সবারই জানা। যদি এই ‘চুরি’ বন্ধ করা যেত, তাহলে গ্যাসের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি দরকার হতো না। কিন্তু তা করা যাচ্ছে না। এই জন্যই একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘চুরির দায় বর্তাচ্ছে গ্রাহকদের ওপর।’ এর প্রতিকার কী?
n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
