আনিসুর রহমান
বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য নিয়ে ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করেছে। পোশাক শিল্পের পর অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চামড়াশিল্পকে অভিহিত করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের অপার সম্ভাবনাও রয়েছে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১ বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্ক অতিক্রম করে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এর তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ সালে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১.২৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১.০৮ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৮-১৯ সালের (জুলাই-মে) হিসাব অনুযায়ী রপ্তানির পরিমাণ .৯৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ ২০১৬-১৭ সালের পর থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে কিছুটা মন্দাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এর মূল কারণ হতে পারে বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পকে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর এবং স্থানান্তরিত হবার পর এখনো পুরোদমে উত্পাদন শুরু করতে না পারা।
সরকার পরিবেশ সহায়ক চামড়াশিল্পের কথা মাথায় রেখে ট্যানারিগুলোকে হাজারিবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এত বছর হম্বিতম্বি করার পর শেষ পর্যন্ত ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরিত হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে সাভারের ২০০ একর জমিতে চামড়া শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে । এই ২০০ একর জমিতে ১৫৫টি প্লান্টের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে চাহিদার ভিত্তিতে গ্যাস এবং বিদ্যুত্ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত চামড়াজাত পণ্যের মান ভালো হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদাও বেশি। সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা শ্রম, গুণগত মানসম্পন্ন চামড়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের নামকরা ব্র্যান্ডগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে সক্ষম হয়ে গড়ে উঠলে বাংলাদেশ চামড়া শিল্পে বিনিয়োগের হারে পরিণত হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোতে উত্পাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় ক্রেতারা পছন্দের তালিকায় রাখছে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বেশিরভাগ রেমিটেন্স আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৃহত্ বাজার হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বেশ কিছু দেশসমূহ। অন্যদিকে চামড়া শিল্পের বর্তমান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে চীন। রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে চীনের একক আধিপত্য বিরাজ করছে। আবার চামড়াজাত দ্রব্য আমদানির ক্ষেত্রে একক বৃহত্তম রাষ্ট্র হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এডিবির তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারের প্রায় ২৪.৭ ভাগ পাদুকা আমদানি করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বাজারে এখন নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান। ফলে চীনকে সরিয়ে অন্যান্য দেশ সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করার ফায়দা নিতে পারে। বাংলাদেশেরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করার যথেষ্ট সুবিধা রয়েছে বৈকি!
সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চামড়া শিল্প থেকে সরকার ৫ বিলিয়ন ডলার উপার্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চামড়া শিল্পে বার্ষিক রফতানি প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমান সরকারকে চামড়া শিল্পের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিকও মনে হচ্ছে। সরকার ইতিমধ্যে চামড়াশিল্পের উন্নয়নে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার চামড়াশিল্পের কাঁচামালের উপর শুল্কমুক্ত সুবিধা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবাধ বাজার সুবিধা এবং চামড়াজাত পণ্যকে রফতানি আয়ের অন্যতম হাতিয়াার হিসেবে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশে চামড়াশিল্প বিকাশের অন্যতম সুবিধা হচ্ছে এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের পর্যাপ্ত জোগান। এছাড়া চামড়া শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত জনবল, কম মূল্যে শ্রমিক নিয়োগের সুবিধা বিদ্যমান। বর্তমান বিশ্ববাজার অনুযায়ী চামড়া শিল্পের বাজারের আর্থিক মূল্যমান প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশ এই বৃহত্ বাজারের মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার বা তার কিছু বেশি অংশ ধরতে পেরেছে । অর্থাত্ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের বদৌলতে বেশকিছু বৈদেশিক মুদ্রা বগলদাবা করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চামড়াশিল্পের চাহিদা প্রায় ১৬০ বিলিয়ন কোটি টাকার।
সব মিলিয়ে বিশ্ববাজার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের মাধ্যমে বাড়তি উপার্জনের বিপুল পরিমাণ সুযোগ রয়েছে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
