আজ ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩। গতকাল রাতে নেত্রকোনা থেকে ছেড়ে আসে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস। ভোর ৫টার দিকে বিমানবন্দর স্টেশন পার হওয়ার পর দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে ট্রেনের পেছনের দিকের তিনটি বগি। তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের ৩টি বগিতে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতাল সমর্থনকারী দুর্বৃত্তরা।
আতঙ্কিত যাত্রীরা প্রাণভয়ে ভেতরে আর্তনাদ করতে থাকেন। তবে ট্রেনের চালক তখনও বুঝতেই পারেননি আগুন লেগেছে। চালক বুঝতে বুঝতে ট্রেনটি চলে আসে তেজগাঁও। ট্রেন থামার পর যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে ভেতর থেকে নামতে শুরু করেন। তবে তিনটি বগি পুড়ে গেলেও একটির ভেতরে আটকা পড়েন চারজন।তিন বছরের শিশু সন্তান সহ দগ্ধ হন মা। সর্বস্ব দিয়ে রক্ষা করতে পারলেন না তাঁর শিশু সন্তানকে। মায়ের কোলেই পুড়ে গেল শিশুটি। আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন মা ও শিশু।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে গত ১০ ডিসেম্বর আমরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালন করলাম। জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র অনুমোদন করে। তাই বিশ্বব্যাপী ১০ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮ এর ধারা ৩ এ জীবন, স্বাধীনতা এবং দৈহিক নিরাপত্তার অধিকার এর কথা বলা আছে। ধারা ১৩-তে নিজ রাষ্ট্রের চৌহদ্দির মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং বসবাস করার অধিকার এর কথা বলা রয়েছে। সব ধরনের বৈষম্য, নির্যাতন দূর করে একটি শোষণহীন শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনের কথা বলা আছে এই ঐতিহাসিক ঘোষণায়।
নানা ধরনের উদ্যোগে আর নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা এই দিবসটি পালন করলাম। কিন্তু সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই জীবন্ত মা ও শিশুর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার মতো এমন মধ্যযুগীয় বর্বর হামলা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিল। এই অবর্ণনীয় নির্মমতা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই জঘন্য দৃষ্টান্ত, জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করল।
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৩০টি অনুচ্ছেদে মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা, মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার নানা দিক উল্লেখ রয়েছে।
প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন ধারণ, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। কাউকে নির্যাতন করা, তার সঙ্গে নিষ্ঠুর, অমানুষিক কিংবা অবমাননাকর আচরণ সকল আইনের পরিপন্থী। মানবাধিকারের আক্ষরিক অর্থ হলো মানুষের অধিকার। একজন মানুষ যে সকল অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়, যা তাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করে এবং যা হরণ করলে সে আর মানুষ থাকে না সেগুলোই তাঁর মানবাধিকার। আর যারা এই অধিকার হরণ করে তারা মানব জাতির কলঙ্ক।
এই নৈরাজ্য বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা এর অবসান চাই। আমরা চাই এই আগুন-সন্ত্রাসীদের কঠিন থেকে কঠিনভাবে বিচার করা হোক। এই বাংলাদেশে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে কেউ যেন কোনো মায়ের বুক খালি করতে না পারে। স্ত্রী যেন তার স্বামীকে না হারায়। সন্তান যেন পিতা হারিয়ে এতিম না হয়।
হরতালের নামে সহিংসতা ছড়ানোর মতো অমানবিক কার্যক্রম বন্ধ করা দরকার। কেবল সরকারের পক্ষে সম্ভব না এই সহিংসতা বন্ধ করা। তাই এই কাজের জন্যে জনমত গঠন করা দরকার। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একটা মানবিক অবস্থান থেকে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে। এই জন্যে সকল বিবেকবান মানুষকে সোচ্চার হতে হবে। সকল নাগরিকদের রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি কাজটা হলো সকল অগ্নি সন্ত্রাস আর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে বিচার আওতায় আনা। সকল অপরাধকে তদন্ত করে বিচারের মাধ্যমে নজির সৃষ্টি করা-যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এ ধরনের সহিংসতার কথা ভাবতেও ভয় পায়। এই অগ্নি সন্ত্রাস ও হত্যা এখনই রুখে দিতে হবে।
লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
