ঠাঁই দাঁড়িয়ে ঢাকার তৃষ্ণার্ত জলঘর

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

সিপাহি বিদ্রোহের বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাহাদুর শাহ পার্কের আশেপাশেই রয়েছে প্রাচীন শহর ঢাকার নানান নিদর্শন। পুরোনো গির্জা ‘সেন্ট থমাস চার্চ’ কিংবা ঢাকার প্রথম পেট্রোল পাম্পের অদূরে চোখে পড়বে পুরোনো লালচে পানির ট্যাংক। দেখতে সুউচ্চ দৈত্যের মতো! বাহাদুর শাহ পার্কে কোলাহল আর পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ গাড়ির সারির দেখা মিললেও, পুরোনো সেই পানির ট্যাংক এখন পরিত্যক্ত। সবুজ আগাছায় ছেয়ে আছে জলাঘরটি। জলাঘরে কি জল মিলবে? না। থাকার কথাও নয়। প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো এই জলঘর বা ট্যাংক যে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে টিকে আছে, সেটাই-বা কম কিসে!

শুধু ‘বাহাদুর শাহ পার্ক পানির ট্যাংক’ নয়, তিলোত্তমা ঢাকায় অন্তত ৩৮টি ওভারহেড ট্যাংক আছে। যেগুলো একসময় বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য নগরবাসীর প্রধান উত্স ছিল। কালের বিবর্তনে ওয়াসার ভূগর্ভস্থ পানির পাম্পের ভিড়ে এসব ট্যাংক ‘অসহায়ের মতো’ দাঁড়িয়ে আছে। নেই রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা সংরক্ষণের তাড়না। অথচ এসব ট্যাংকের প্রাচীর কাঠামো, স্থাপত্যশৈলী, নির্মাণকৌশল এতই অসাধারণ এবং স্বতন্ত্র যে কারো নজর কেড়ে নিতে বাধ্য।

ঢাকায় পানি সরবরাহের ইতিহাস
ঢাকার এসব জলঘর নিয়ে আলোচনা করলেই চলে আসে পানি সরবরাহের ইতিহাস। যুগে যুগে ঢাকায় ছিল বিশুদ্ধ পানির অভাব। সুবেদারী আমল থেকেই ঢাকার পানি উত্স ছিল বুড়িগঙ্গা নদী, পুকুর-ডোবা ও পাতকুয়া। এর ফলে কলেরা হয়ে যায় ঢাকাবাসীর নিত্যসঙ্গী। লোকসংগীত সংগ্রাহক দীনেশ চন্দ্র সেন লিখেন, ‘কূপের জল খাইতে হইতো, তাহাতে গলগণ্ড হইতো এবং সেই জলের গুণে বারো মাস কলেরা লাগিয়া থাকিতো।’

এরপরই শুরু হলো ‘ভিস্তিওয়ালার’ যুগ। তারা বাড়ি গিয়ে পানি সরবরাহ করতো থলেতে করে। ছাগল বা ভেড়ার পাকা চামড়ার এই থলেকে বলা হতো ভিস্তি। এর পাশাপাশি চুলার আগুনে পানি বিশুদ্ধ করার রেওয়াজ শুরু হয় ঘরে ঘরে। কিন্তু পরিশ্রুত পানি ব্যবস্থার উদ্যোগ দেখা দেয় আশির দশকের শেষ দিকে।

ওভারহেড ট্যাংকের যাত্রা শুরু
খন্দকার মাহমুদুল হাসান তার ‘বাংলাদেশের প্রথম ও প্রাচীন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ১৮৬৪ সালে ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর পৌরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য নবাব পরিবার আর্থিক সহায়তায় করে। ফলে ১৮৭৮ সালের ২৪ মে থেকে ঢাকাবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। পানি সরবরাহের জন্য পানির ট্যাংকটি নির্মিত হয়েছিল।

এর কয়েক বছর পর ঢাকার গেন্ডারিয়ার ভাট্টিখানা এলাকায় নির্মিত হয় ঢাকার দ্বিতীয় ট্যাংক। যার স্থাপত্যশৈলী অনেকটা প্রথমটার মতো। নবাব ও ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বেশিরভাগ ট্যাংকই ছিল লাল ইট-সুড়কি দিয়ে বানানো। পাকিস্তান আমলে ও তার পরবর্তী সময়ে স্থাপিত ট্যাংকগুলো দেখতে বেশিরভাগই সাদাটে রঙের এবং বেশ উঁচু। ফুলবাড়িয়া, ফকিরাপুল, বিজয়নগর, হাটখোলা রোড, লালমাটিয়া, মিরপুর ১০ এলাকার ওভারহেড পানির ট্যাংকগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়।

কবে-কেন বন্ধ হলো
শোধনাগার থেকে পরিশোধিত করে পাম্পের সাহায্যে ট্যাংকে উঠিয়ে পানি রিজার্ভ করে রাখা হতো ওভারহেড ট্যাংকগুলোতে। সে সময় ঢাকার জনসংখ্যা বেশ কম হওয়ায় এসব রিজার্ভ পানিতেই সমাধান হতো। তবে জনসংখ্যা বাড়ার কারণে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে। এর ফলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় ট্যাংকগুলো। ঢাকার ওভারহেড পানির ট্যাংকগুলোর কোনটি কবে বন্ধ হয়ে গেছে- এর কোনো সঠিক তথ্য কোথাও নেই। ঢাকা ওয়াসার নথিপত্রেও এর রেকর্ড নেই। তবে সর্বশেষ ২০০৭ সালে আগারগাঁওয়ে সর্বশেষ পানির ট্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানা যায়। কেন বন্ধ হলো সেই জবাব দিয়েছেন ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ. কে. এম. সহিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ওভারহেড পানির ট্যাংকগুলো ভরতেই সময় লাগত ১০ ঘণ্টার মতো। তাই রিজার্ভ ট্যাংকে পানি উঠিয়ে রাখার মতো সময় আর নেই। এখন সরাসরি লাইনে পানি সাপ্লাই করা হয় বাড়িগুলোর নিজস্ব রিজার্ভ ট্যাংকে। এছাড়া পাম্পের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেশি, বেশ ঝামেলাপূর্ণও।’

বর্তমান অবস্থা কী?
পানি ট্যাংকগুলোর নামে ঢাকার বিভিন্ন জায়গার নামকরণও হয়েছে। যেমন, ‘ফকিরেরপুল পানি টাংকি’, ‘বিজয়নগর পানির টাংকি’। অথচ এসব ট্যাংকের বেশিরভাগই এখন দখলদারদের কবজায়। কিছু কিছু ট্যাংক অকেজো ও জরাজীর্ণ বিশাল স্তম্ভ হয়েই দাঁড়িয়ে আছে।

ঢাকার প্রথম ট্যাংকে গিয়ে দেখা যায়, ট্যাংকের নিচের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে মাজার। স্থাপনাটির একপাশের প্রাচীর ভেঙে করা হয়েছে মাজারে ঢোকার গেট। কলাপসিবল গেটে ঝোলানো সাইনবোর্ডে লেখা আছে-শাখা দায়েরায় মূসাবীয়া কলতাবাজার। ট্যাংকের বাইরের অংশে বসানো হয়েছে খাবার হোটেলসহ কয়েকটি ছোট দোকান।

এসব সম্পত্তি বেহাত হলেও নজর নেই ঢাকা ওয়াসার। ২০২০ সালের মে মাসে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক এই ট্যাংকটিকে একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তাতেও কোনো সুনজর আসেনি এই ব্রিটিশ-নবাব নিদর্শনের ওপর। দেড়শ বছরের পুরাতন এই সম্পত্তি সম্পর্কে হয়তো জানা নেই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগেরও! বরং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসার পক্ষ থেকে ট্যাংকগুলো ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে ঢাকাবাসীর বিরোধিতায় তারা বার বার পিছপা হোন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহীদ কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যে পুরান ঢাকার কথা বলছি, ৪০০-৫০০ বছরের ইতিহাসের কথা বলছি-সেই ইতিহাসটা আসলে কী? এই ছোটো ছোটো বিষয়গুলোই, ঢাকার বিখ্যাত স্থাপত্যগুলোই এর পরিচয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরকে এগুলো রক্ষায় কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে।’

ইত্তেফাক/এসটিএম