সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ভোট একটি পবিত্র আমানত

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৩৫

ভোটকে বলা হয় পবিত্র আমানত। এটি নাগরিকের একটি অধিকারও বটে। একজন মুসলমান নাগরিক এই অধিকারের খেয়ানত করতে পারেন না। টাকার বিনিময়ে ভোট বিক্রি করা যাবে না। অন্যান্য চুরির ন্যায় ভোট চুরি করাও একটি গুরুতর অপরাধ। হাক্কুল ইবাদ লঙ্ঘনের শামিল। ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, হক ও বাতিল, ইমান ও কুফর ইত্যাদি পার্থক্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভোট হতে পারে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। ভোটের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১. ভোট হলো একটি সুপারিশ। এ প্রসঙ্গে কোরআনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘কেউ কোনো ভালো কাজে সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ রয়েছে, আর কেউ মন্দ কাজে সুপারিশ করলে তাতেও তার অংশ রয়েছে’ (সুরা নিসা, আয়াত নম্বর ৮৫)। সুতরাং আপনার সুপারিশটি যেন সুন্দর ও বাস্তবধর্মী হয়।

২. ভোট হলো একটি সাক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্য প্রদর্শন করো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতামাতা এবং আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়, সে বিত্তবান হোক বা বিত্তহীন, আল্লাহই শুভাকাঙ্ক্ষী তোমাদের চেয়ে। সুতরাং তোমরা বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা প্যাঁচালো কথা বলো অথবা পাশ কেটে যাও, তবে তোমরা যা করছ আল্লাহ তো তার সম্যক খবর রাখেন’ (সুরা নিসা, ৪:১৩৫)। মহানবি (স.) বলেছেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কবিরা গুনাহ। সুতরাং একজন ভোটার হচ্ছেন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন সাক্ষ্যদাতা।

৩. ভোট অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ। প্রিয় নবি (স.) বলেছেন, তুমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে হাতের অথবা মুখের অথবা অন্তরের সাহায্যে লড়াই করো। (মিশকাত, পৃষ্ঠা-৪৩৬)।

৪. ভোট জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের রায়। রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, তুমি সাহায্য করো তোমার ভাইকে, সে যদি জালিম কিংবা মজলুমও হয়। এর ব্যাখ্যায় মহানবি (স.) নিজেই বলেন, জালিমকে সাহায্য-দানের অর্থ হলো জুলুম থেকে নিবৃত্ত রাখা। তাই ভোট হতে পারে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে একটি নীরব প্রতিবাদ।

৫. ভোট হলো একটি দাওয়াত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা এমন একটি দল, মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে। মারুফ কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে। এতেই তোমরা সফল হতে পারবে। সুতরাং ইসলাম ও মুসলমানের দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে ভোট একটি কৌশলগত দাওয়াত।

৬. ভোট হলো ঐক্যের সোপান। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘ঐক্যবদ্ধভাবে আমার রুজ্জুকে ধরে রাখো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (সুরা আল-ইমরান)। অনৈক্যের কারণেই আজ মুসলমানদের বিপর্যয়। ইখতিলাফ মাআল ইত্তিহাদ নীতির ভিত্তিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

৭. ভোট হলো একটি আমানত। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, আমানত তার হকদারকে প্রত্যর্পণ করার জন্য আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন। (সুরা নিসা), সুতরাং আপনি যাকে আপনার কাজের দায়িত্ব প্রদান করছেন, তার ইচ্ছা ও যোগ্যতা উভয়ই দেখতে হবে।

৮. ভোট হলো নেতা বা প্রতিনিধি নির্বাচনের কৌশল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর তাদের নবি তাদের বলেছিল, আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের রাজা করেছেন। তারা বলল, আমাদের ওপর তার রাজত্ব কীরূপে হবে; যখন আমরা তার অপেক্ষা রাজত্বের অধিক হকদার এবং তাকে প্রচুর ঐশ্বর্য দেওয়া হয়নি। নবি বললেন, আল্লাহ অবশ্যই তাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাবান।’ (সুরা বাকারা ২৪৭), সুতরাং জনগণের প্রতিনিধি কেমন হবে এবং আপনার প্রতিনিধি কেমন হবে। এটা ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।

৯. ভোট হলো নাগরিকের সমর্থনের একটি মাধ্যম। আপনি কাকে সমর্থন করবেন, এটি ভোটের মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, রোমানরা নিকটবর্তী নিম্নভূমিতে পরাজিত হয়েছিল। তাদের পরাজয়ের কয়েক বছরের মধ্যে আল্লাহ তাআলার আদেশে আবার তারা বিজয়ী হবে। অগ্রপশ্চাত্ তারই হাতে। এতে মুমিনগণ আনন্দিত হবে। (সুরা রোম ১-৪), এই আয়াতের শানেনুজুল হচ্ছে মক্কি জীবনে রোম ও পারস্য সম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। রোমকরা কিছুটা আহলে কিতাবি হওয়ায় আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও তার সতীর্থরা তাদের বিজয় কামনা করেছিলেন। অন্যদিকে আবু জাহেল গং পারসিকরা অগ্নীপূজারি হওয়ায় তাদের জয় আশা করছিলেন। দেখা গেল প্রথম দফা যুদ্ধে পারসিকরা জিতে গেল। এতে আবু জাহেল ও তার সমর্থকগণ উল্লোসিত হন এবং আবু বকর (রা.) ও তার বন্ধুরা ব্যথিত হন। পরে সুরা রোমের প্রারম্ভিক আয়াতসমূহ নাজিল করে আল্লাহ তাআলা নবি (স.) ও সাহাবায়ে কেরামগণকে সান্ত্বনা প্রদান করেন। এ থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম? ভোটের ক্ষেত্রেও নীরবতা কাম্য নয়।

১০. ভোট হলো নাগরিকের মতামত বা পরামর্শ প্রদান। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আপনি কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। অতঃপর আপনি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন। (সুরা আল ইমরান-১৫৯) পরামর্শ করে কাজ করলে সেই কাজের মধ্যে বরকত হয়। রাষ্ট্রীয় নীতি কী হবে, সেক্ষেত্রে ভোটের মাধ্যমে নাগরিক তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করতে পারেন।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, পরিচালক, বিএসসিএল ও ইসলামি গবেষক

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন