মাস শেষ হওয়ার আগেই অনেকের হাতের টাকা শেষ হয়ে যায়। নিয়মিত আয় থাকলেও প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেকেই মনে করেন, সমস্যাটি হয়তো আয়ের স্বল্পতায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু আয় বেশি হওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত প্রয়োজন হলো সেই আয়ে বরকত থাকা।
ইসলামে বরকত বলতে বোঝায়—আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কল্যাণ, যার ফলে অল্প সম্পদও প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট হয়ে যায় এবং জীবনে শান্তি ও স্বস্তি আসে।
আধুনিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, যারা নিজেদের প্রাপ্ত সম্পদ নিয়ে কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট থাকেন, তারা সাধারণত আর্থিকভাবে বেশি সুশৃঙ্খল এবং মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকেন। ফলে তারা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কম করেন এবং অর্থ ব্যবস্থাপনায় সফল হন। (Emmons, R. A. & McCullough, M. E., 2003, Journal of Personality and Social Psychology, 84/2, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি)
সহজ করে বললে, যে মানুষ নিজের যা আছে তার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। সে অযথা খরচ করে না। আবেগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না। ফলে তার হাতে যা আসে তা সে ধরে রাখতে পারে। আর যে মানুষ সব সময় যা নেই তা নিয়ে অস্থির, সে একটার পর একটা ভুল করতে থাকে এবং হাতে যা আসে তা খরচ করে ফেলে।
সম্পদে বরকত শুধু বেশি উপার্জনের ওপর নির্ভর করে না; মানুষের মানসিক অবস্থার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কোরআনের আশ্বাস
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)
মানে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে নিয়েছেন। একটা গুবরে পোকা থেকে শুরু করে সমুদ্রের গভীরের এক শ টন ওজনের তিমি মাছ পর্যন্ত। আপনিও সেই পৃথিবীরই একজন।
তাহলে দুশ্চিন্তা কিসের? আপনার কাজ চেষ্টা করা, বাকি দায়িত্ব আল্লাহর।
১. ইস্তিগফার করা: ক্ষমা চাওয়া বরকতের বন্ধ দরজা খোলার চাবি। আল্লাহ সুরা নুহে বলেন, ‘তখন আমি বললাম, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী তৈরি করে দেবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)
খেয়াল করুন, নুহ (আ.) তাঁর জাতির কাছে কী চাইলেন? শুধু বললেন ইস্তিগফার করো, আল্লাহর কাছে তোমাদের কৃতপাপের জন্য ক্ষমা চাও। এর ফলে কী আসবে? বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান, বাগান, নদী।
‘মিদরার’ মানে প্রচুর বৃষ্টি। ইসলামে বৃষ্টি রিজিকের প্রতীক, কারণ বৃষ্টিতে জমিন সজীব হয়, ফসল হয়, জীবন সঞ্চারিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে বেশি ইস্তিগফার করে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে বের হওয়ার পথ করে দেন, তার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করেনি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৮)
২. তাকওয়া: সব কাজে আল্লাহ সচেতনতা হলো হিসাবের বাইরে থেকে রিজিক পাওয়ার পথ। আল্লাহ সুরা তালাকে বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করেনি। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)
খেয়াল করুন, এই আয়াতে পরপর তিনটি প্রতিশ্রুতি আছে।
এখানে ‘মাখরাজ’ বলে একটা শব্দ আছে, যার মানে বের হওয়ার পথ। কঠিন বিপদে যখন মনে হবে চারদিকে অন্ধকার, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, উত্তরণের আর কোনো পথ নেই, তখন আল্লাহই নিজ অনুগ্রহে আপনাকে সেখান থেকে রক্ষা করবেন।
তারপর এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন, যা সে ভাবেইনি। মানে এমন উৎস থেকে রিজিক আসবে, যা আপনি কখনো কল্পনা করেন নি। আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। যখন আল্লাহ কারও জন্য যথেষ্ট হন, তখন তার আর চিন্তা কিসের বলুন?
৩. প্রাপ্ত রিজিক থেকে দান করা: যত দেবেন, তত বাড়বে। আল্লাহ সুরা বাকারায় বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা হলো একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায়, প্রতিটি শিষে এক শ দানা। আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬১)
একটি বীজ, সাতটি শিষ, প্রতিটিতে এক শ দানা। তার মানে একটি বীজ থেকে সাত শ দানা। সুবহানাল্লাহ!
এরপর আল্লাহ বলছেন ‘যাকে চান তার জন্য তিনি বহুগুণ বাড়িয়ে দেন’, মানে সাত শও সর্বোচ্চ নয়। সাত লাখ বা সাত কোটি থেকে সাত শ কোটিও হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা রিজিক কমায় না, বরং আল্লাহ তার মাধ্যমে সম্পদে বরকত দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৭)
পকেট খালি বলে দান করব না, এই ভাবনা আসলে বরকত কমিয়ে দেয়। কারণ, দান করলে সম্পদ কমে না, বাড়ে। এটা আল্লাহর নিজের কথা।
৪. প্রাপ্ত রিজিকের জন্য শুকরিয়া জানানো: এটা বরকত বাড়ানোর সরাসরি পথ। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)
এই আয়াতের শুরুতে ‘লাম’ এবং ‘নুন’ আছে। আরবি বাক্যের এই গঠন শপথের ভাষা। আল্লাহ যেন শপথ করে বলছেন, কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই বাড়াব। এটা সম্ভাবনা নয়, প্রতিশ্রুতি। প্রাপ্ত রিজিকের জন্য কৃতজ্ঞ হলে এই আয়াত আমাদের জন্য রিজিক বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয়।
আমাদের স্বভাবের একটা মন্দ দিক হলো—ট, আমাদের যা নেই তা নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত থাকি যে যা আছে তার দিকে তাকাই-ই না। অথচ আমাদের যা-ই থাকুক, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, সর্বদা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
৫. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া: নিয়মিত নামাজ পড়লে বিশেষভাবে রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ নেন। আল্লাহ সুরা ত্বহায় বলেন, ‘তোমার পরিবারকে নামাজের আদেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো রিজিক চাই না। আমিই তোমাকে রিজিক দিই। আর শুভ পরিণাম তাকওয়াবানদের জন্য।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১৩২)
খেয়াল করুন, আল্লাহ বলছেন, তুমি নামাজ আদায় করো, রিজিকের চিন্তা আমার। এর চেয়ে বড় আশ্বাস আর কী হতে পারে?
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা: এখনই সঙ্গে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতদের হক আদায় করা রিজিকে বরকতের অপরিহার্য শর্ত। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের সম্পদে রয়েছে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ১৯)
কিছু মানুষ নিজের অভাবের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে। কিছু মানুষ অতিরিক্ত লজ্জায় বলতে না পেরে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। আমাদের এই দুই ধরনের লোককেই খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের হক বুঝিয়ে দিতে হবে। এটা আমাদের দয়া নয়, এটা তাদের পাওনা। যে সম্পদে অন্যের হক আদায় হয় না, সেই সম্পদে বরকত থাকে না।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাও রিজিক বৃদ্ধির অন্যতম উপায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৩)
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা শুধু নৈতিক দায়িত্বই নয়, এটি রিজিক বাড়ানোর একটি সরাসরি পথ।
আয়-রোজগারে বরকত শুধু বেশি অর্থ উপার্জনের ওপর নির্ভর করে না বরং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক, ইবাদত, কৃতজ্ঞতা, দানশীলতা, তাকওয়া ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
ইস্তিগফার, তাকওয়া, দান, শুকরিয়া, নামাজ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক—এই ছয়টি আমল একজন মুমিনের জীবনকে বরকতময় করে তুলতে পারে। তাই শুধু আয় বাড়ানোর চেষ্টা নয়, বরং আয়ে আল্লাহর বরকত অর্জনের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

