নিয়ন্ত্রণে আসছে না আচরণবিধি লঙ্ঘন

  • রেকর্ড সংখ্যক প্রার্থীকে শোকজ
  • মাঠ পর্যায়ে কিছু প্রার্থীর বেপরোয়া আচরণে ক্ষুব্ধ ইসি
আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:৩৪

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র সপ্তাহ খানেক বাকি থাকলেও প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটকে কেন্দ্র করে রেকর্ড শোকজ, তলব, মামলা ও জরিমানার পরও প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘন থামছে না। কমিশনের রক্তচক্ষুকে আড়াল করে সারা দেশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হুমকি-ধামকি, হামলা ও পোস্টার ছেড়াসহ নানাভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলেছেন বেপরোয়া প্রার্থীরা। এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ কমিশন।

গতকালও কয়েক জন প্রার্থী ও তাদের সমর্থককে শোকজ করেছে নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি। এছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কয়েক জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে নির্বাচন কমিশনে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে কমিটি। যদিও কমিশন বলছে, দোষীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর পরও নিয়ন্ত্রণে না এলে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তের দিকে যাবে কমিশন। তবে ভোটের সময় আরো ঘনিয়ে এলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের মাত্রাও কমে আসবে বলে আশাবাদী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।

ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শুরুর আগে ও পরে নানাভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলেছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। প্রার্থী ও সমর্থকদের পরস্পর অভিযোগ, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিউজ এবং ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এসব ঘটনায় রেকর্ড সংখ্যক ব্যবস্থা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গতকাল পর্যন্ত ২৮০টিরও বেশি প্রার্থী ও তাদের সমর্থককে শোকজ, তলব, মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপিরাও রয়েছেন। বারবার আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিয়মিত আদালতে মামলাও হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ক্ষমতাসীন দলের আলোচিত দুই প্রার্থী কুমিল্লা-৬ আসনের বাহাউদ্দিন বাহার ও বরগুনা-১ আসনের ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে নির্বাচন কমিশনে ডেকে যথাক্রমে ১ লাখ ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে শেষ বারের মতো সতর্ক করা হয়েছে। বেপরোয়া প্রার্থীদের লাগাম টানতে প্রার্থিতা বাতিলের কথাও ভাবছে কমিশন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

সূত্র জানায়, এবার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচারণার আগেই সারা দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক পড়ে। বিষয়টি নিয়ে শুরুতে কমিশন নীরবতা পালন করে। এ সময় প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগে আচরণবিধি দেখা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না উলটো মন্তব্য করেন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কেউ কেউ। এতে সারা দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের আরো হিড়িক পড়ে। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সমালোচনার পর নীরবতা ভাঙে কমিশনের। একে একে শোকজ করা শুরু হয় অভিযুক্ত প্রার্থীদের। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও আচরণবিধি উপেক্ষা করে অনেক প্রার্থী প্রচারণায় নামেন। সভা, সমাবেশ ও বক্তৃতায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের নানা হুমকি-ধামকি দেন প্রার্থী ও সমর্থকরা। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি কোনো কোনো প্রার্থী। অনেক জায়গায় হামলা ও সহিংসতা চলে একে অন্যের ওপর। নির্বাচনি সহিংসতায় এ পর্যন্ত তিন জন নিহত ও বহুসংখ্যক কর্মী-সমর্থক আহত হন। ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরুর প্রথম দিন থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত অর্ধশতাধিক আসনে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত তিন জনের ও প্রায় দেড়শতাধিক আহত হন। এসব সংঘাতে জড়াচ্ছেন মূলত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই। এছাড়া তপশিল ঘোষণার পর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিগুলো সারা দেশে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের কারণে ২৮০টি শোকজ নোটিশ দিয়েছে। এর মধ্যে ২০০টি শোকজের জবাব দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীর পাশাপাশি তাদের অনুসারী নেতাকর্মী-সমর্থক এবং কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। কারো কারো বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগও রয়েছে।

ইসির সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্য অনুসারে, যে ২৮০টি শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে আওয়ামী লীগের শতাধিক প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে আবার অন্তত ৬০ জনই বর্তমান সংসদ সদস্য। পাশাপাশি ৩৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জাতীয় পার্টি-জাপার ১০ জন প্রার্থীকেও শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া শোকজ নোটিশ পাওয়া বাকিদের মধ্যে আছেন দলের কর্মী-সমর্থক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তবে এই দলেও ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থক বেশি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ইসির নির্দেশে ঝিনাইদহ-১ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই নিয়মিত আদালতে দুটি মামলা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম-১৬ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধেও। এছাড়া কুমিল্লা-৬ আসনের আ.ক.ম বাহাউদ্দিন বাহার ও বরগুনা-১ আসনের ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে নির্বাচন কমিশনে তলব করে যথাক্রমে ১ লাখ ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে শেষবারের মতো সতর্ক করে দিয়েছে কমিশন। এরপরও এসব প্রার্থীকে বাগে আনতে পারছে না কমিশন। গতকাল আব্দুল হাই ও তার কয়েকজন সমর্থকের বিরুদ্ধে আবারও মামলার সুপারিশ করে নির্বাচন কমিশনে তিনটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে অনুসন্ধান কমিটি। এছাড়া ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামীম হক, সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও রাজশাহী-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. শফিকুর রহমানসহ আরো কয়েকজন প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। প্রচারণায় অস্ত্র প্রদর্শনের অপরাধে বাগেরহাট-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইদ্রিস আলী ইজারাদারের সমর্থক শেখ মো. আবু সাঈদকে যে-কোনো নির্বাচনি প্রচারণায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও প্রার্থীরা আচরণবিধির কোনো তোয়াক্কা করছেন না।

এ ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ভোটের দিন ঘনিয়ে এলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের মাত্রাও কমে যাবে। আর সবাই যে আচরণবিধি ভঙ্গ করছে, ব্যাপারটা তা নয়। তবে রাজনৈতিক সহিংসতা হচ্ছে। আমরা প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি, তারা যেন এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ভোটের দিন যেন একটি সহজ-স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকে।

ইত্তেফাক/এএইচপি