যুদ্ধ আর দাবদাহের একটি বছর

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:৪৭

যুদ্ধের আগুনে পৃথিবী পুড়ছে। প্রকৃতিও যেন মানুষের কর্মের প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালকেই পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতির দাবদাহের সঙ্গে ২০২৩ সালের শেষদিকে যুক্ত হয় গাজায় ইসরাইলের নৃশংসতম হামলা। ক্ষমতা আর দম্ভের মোহে প্রতিদিনই মরতে হচ্ছে পৃথিবীর নিরীহ মানুষগুলোকে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিষবাষ্প। স্বার্থপরতা বৃদ্ধিতে মানুষে মানুষে বিভেদও বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর গাজায় ইসরাইলি বর্বরতাও বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। একটি মানবতার পক্ষে এবং অন্যটি ক্ষমতা আর গণহত্যার পক্ষে। মোটামুটি বলতে গেলে ২০২৩ সাল ছিল প্রচণ্ড দাবদাহের এবং কিছুটা শান্তির বছর।

গাজায় ইসরাইলি হামলা

গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরাইলে নজিরবিহীন হামলা চালায় যাতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হয়। প্রায় আড়াইশ’ ইসরাইলি ও বিদেশি নাগরিককে অপহরণ করে। হামাস কেন হামলা চালাল এবং ইসরাইল কেন জানতে পারেনি, তা নিয়ে নানা আলোচনা কিংবা সংশয় আছে। হামাসের হামলার পরই গাজায় নৃশংসভাবে বোমা হামলা শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী। এই হামলায় গাজার ৭০ ভাগ বাড়িঘর, কয়েক শ স্কুল, হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। বিদ্যুতের অভাবে আইসিইউতে মরতে হয়েছে শিশুদের। ফিলিস্তিনিদের আটক করে অর্ধনগ্ন করে নিয়ে গেছে ইসরাইলি বাহিনী।

হামাসকে নিঃশেষ করার নামে ইসরাইলের নির্বিচারে বোমা হামলা ও গুলিতে ২১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ গেছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ শিশু ও নারী। মৃত্যুর আগে এরা এদের অপরাধটাও জানতে পারল না। ২৩ লাখ গাজাবাসীর মধ্যে ২১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত। প্রায় তিন মাস ধরে অব্যাহত নৃশংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নেই। জাতিসংঘ এবং বিশ্বের মোড়লরা নিন্দা জানিয়েই ক্ষান্ত দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা যেন মানুষ নয়, তাই তাদের আত্মরক্ষার অধিকার নেই। ইসরাইলিরা মানুষ বলেই পৃথিবীতে তারা আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে জন্মেছে। ফিলিস্তিনিরা বাঁচার জন্য হামলা চালালে তা হয় সন্ত্রাসী হামলা, বিপরীতে ইসরাইল বর্বর হামলাকেও আত্মরক্ষার হামলা বলে অভিহিত করা হয়। অর্থ আর ক্ষমতার দম্ভটা যে বড়, তার বড় প্রমাণ এখানেই। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৬ লাখ মানুষ চরম ক্ষুধার্ত। কেউ এক বেলা, কেউ দুই বেলা, কেউ আবার তিন বেলাই খেতে পারে না। স্বজনের লাশের চেয়ে এখন অনেকেই নিজের সন্তানকে বা নিজেকে বাঁচাতে খাবারের পেছনে ছুটছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খেল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাস পুরোনো হলেও প্রযুক্তি দুনিয়া ২০২৩ সালকে সম্ভবত মনে রাখবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূল ধারায় যুক্ত হওয়ার বছর হিসেবে। কোডিং থেকে আর্ট, রচনা, এআই সিস্টেম খুব দ্রুতই বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে দিতে পারে, যা হয়তো একেবারে নিখুঁত নয়। তবে নানান পেশা ও শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জন্য দরকারি অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে সৃষ্টিশীল এসব এআই। মাইক্রোসফট, চ্যাটজিপিটি ২০২২ সালের শেষদিকে এসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আসার পর থেকে, প্রতিদ্বন্দ্বী আরো অনেক কোম্পানিই এমন এআই নিয়ে কাজ করছে। ডিসেম্বরে সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছে অ্যালফাবেট; গুগলের মালিক এই কোম্পানি জেমিনিকে হাজির করেছে, এই এআই সমস্ত গুগল পণ্য, চ্যাটবট এবং সার্চ ইঞ্জিনেও যুক্ত হবে। এটা সমাজের জন্য এত হুমকির যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও এর ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও এআইকে হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক মন্দা অব্যাহত

আশা করা হয়েছিল, ২০২৩ সালে গণতন্ত্রের চতুর্থ ঢেউ লক্ষ্য করা যাবে। কিন্তু একেবারেই উলটো এবং রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটেছে। ফ্রিডম হাউজ এই ঘোষণা দিয়ে বছরের শুরু করেছিল যে, ২০২৩ টানা সপ্তদশ বছর হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল যেখানে বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র হ্রাস পেয়েছে। আফ্রিকায় অভ্যুত্থানের মহামারি শুরু হয়েছিল। জুলাই মাসে নাইজারের সামরিক বাহিনী দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো অভ্যুত্থানকে প্রত্যাহার না করলে হস্তক্ষেপ করার হুমকি দিয়েছিল, কিন্তু মালি এবং বুরকিনা ফাসোর সামরিক জান্তারা জবাবে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিল। আগস্টে গ্যাবনের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করে। থাইল্যান্ডে মে মাসে নির্বাচনে একটি নতুন প্রগতিশীল দল সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পায়। কিন্তু তারা ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারেনি।

এক শতাব্দী আগে ইউরোপীয় গণতন্ত্র কীভাবে ভেঙে পড়েছিল, তার স্মৃতির পুনরুজ্জীবন শুরু হয়। উগ্র ডানপন্থী দলগুলো ইউরোপজুড়ে ভালো ফল করেছে। গুয়াতেমালার অ্যাটর্নি জেনারেল দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব নেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিলেন, যখন পেরুর অ্যাটর্নি জেনারেল তার মিত্রদের সাহায্য করতে আইনপ্রণেতাদের চাপ দেওয়ার জন্য দুর্নীতি তদন্ত ব্যবহার করেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিরোধীদের ‘কীট’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন যে তিনি যদি হোয়াইট হাউজে পুনরায় আসতে পারেন, তাহলে একদিনের জন্য অন্তত স্বৈরশাসক হবেন। ট্রাম্প এই হুমকিও দিয়েছেন যে, তিনি তার রাজনৈতিক শত্রুদের লক্ষ্যবস্তু করার জন্য প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করবেন। সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের জন্য ভালো বছর ছিল না ২০২৩।

মহাকাশ প্রতিযোগিতার উল্লম্ফন

মহাকাশে যাওয়ার প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। ১৫০ বছর আগে পরামর্শ ছিল: পশ্চিমে যাও। আজ উপদেশ দেওয়া হতে পারে: মহাকাশে যাও। বিভিন্ন দেশ এবং কোম্পানি মহাকাশে যাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করে। ৭৭টি দেশে মহাকাশ সংস্থা রয়েছে; ১৬টি দেশ মহাকাশে পেলোড উেক্ষপণ করতে পারে। চাঁদ বিশেষ আগ্রহে রয়েছে। রাশিয়ার চাঁদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। ভারতের মহাকাশ অভিযান সফল হয়। চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও উচ্চাভিলাষী চাঁদের কর্মসূচি রয়েছে। নাসা ২০২৫ সালের মধ্যে মহাকাশচারীদের চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্য স্থির করেছে। মহাকাশ-সম্পর্কিত এসব প্রচেষ্টা উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলছে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মহাকাশে সামরিকীকরণের দিকে নিয়ে যাবে। স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিন এবং ভার্জিন গ্যালাক্টিকের মতো বেসরকারি সংস্থাগুলি মহাকাশ পরিচালনায় একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ফলে মহাকাশের জন্য একটা নিয়ম তৈরি করা জটিল। ফলে মহাকাশের আবর্জনা অনুসন্ধান সমস্যাকে আরো জটিল করবে কি-না, তা নিয়েও সংশয় আছে।

দাবদাহ

বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রতি বছর অভূতপূর্ব হারে বাড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। ২০২৩ সালে দাবদাহ নানা দেশে মানুষসহ প্রাণীকূলকে ভুগিয়েছে। দাবানলে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। জুলাই মাস জুড়ে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ বইতে থাকে। এতে ভেঙে যায় তাপমাত্রাবিষয়ক বিভিন্ন রেকর্ড। দেশে দেশে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে অস্বস্তিতে পড়ে কোটি কোটি মানুষ। ১৭ জুলাই পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বে সর্বোচ্চ রেকর্ড তাপমাত্রা হয় ৫৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালিতে ১৯১৩ সালে রেকর্ড করা হয়।

তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্প

৬ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে তুরস্ক ও সিরিয়া। ৭ দশকিক ৮ রিখটার স্কেলে কম্পনের জেরে তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায় বাড়িঘর। প্রাণ হারায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। এ বছরই সেপ্টেম্বরে মাটির নিচে প্লেটের ঠোকাঠুকিতে মরক্কোয় জেগে উঠে কম্পন-দৈত্য। প্রাণ হারায় অন্তত ৩ হাজার মানুষ।

গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত সুদান

ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত সুদান। এপ্রিল থেকে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে মাঠে নামে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসেনা। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীরই দুই জেনারেল-আবদেল আল ফতা আল বুরহান ও জেনারেল মোহম্মদ হামদান দাগালো একে অন্যের রক্তপিপাসু। প্রথম জন সুদানের সেনাপ্রধান এবং ২০১৯ থেকে দেশের সর্বোচ্চ শাসনব্যবস্থার জন্য ভারপ্রাপ্ত কাউন্সিলের প্রধান। দ্বিতীয় জন দেশের আধাসামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স’ (আরএসএফ)-এর প্রধান তথা কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য। দুই জেনারেলের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার ভঙ্গ, লুটতরাজ, নৃশংসতা ও ধর্ষণে মদতের অভিযোগ রয়েছে।

ব্রিটেনে চার্লসের রাজ্যাভিষেক

২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বরে মৃত্যু হয় ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের। তার মৃত্যুর পরেই উত্তরাধিকার সূত্রে রাজা হন ছেলে তৃতীয় চার্লস। তবে রাজসিংহাসন দখলের আনুষ্ঠানিকতাটুকু বাকি ছিল। প্রায় আট মাস পরে ৬ মে ব্রিটেন ও ১৪টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের রাজা হিসাবে অভিষেক হয় তৃতীয় চার্লসের। ৭৪ বছর বয়সি তৃতীয় চার্লসই ব্রিটেনের রাজপরিবারের ইতিহাসে প্রবীণতম হিসাবে অভিষিক্ত হন।

টাইটান দুর্ঘটনা

পাঁচ জন অভিযাত্রীকে নিয়ে ১১১ বছর আগে ডুবে যাওয়া বিলাসবহুল জাহাজ টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাচ্ছিলেন ডুবযান টাইটান। কিন্তু সমুদ্রের গভীরে সর্বনাশা বিস্ফোরণই কাল হয়। চিরতরে সাগরের অতলে হারিয়ে গেল ঐ ডুবোজাহাজ। মার্কিন বেসরকারি সংস্থা ‘ওশেনগেট এক্সপিডিশনের পর্যটন সাবমেরিন ছিল ‘টাইটান’। চার দিন নিখোঁজ থাকার পর ডুবোজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করে আমেরিকান কোস্ট গার্ডের রোবট ডুবুরি। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর টাইটানের কোনো অভিযাত্রীই বেঁচে নেই বলে জানিয়েছিল ওশেনগেট।

ইত্তেফাক/এসকে