কামরুন্নাহার মুন্নীর বহুমুখী প্রতিভা

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৯, ২০:২৭

না চ, গান, অভিনয়, উপস্থাপনা, নির্দেশনা, মঞ্চ নাটক লেখালেখি— যেখানেই তিনি হাত দিয়েছেন, সফলতা পেয়েছেন। তা-ও পড়া অবস্থায়। ভাবা যায়! এতগুলো কর্মকাণ্ডে কীভাবে একজন শিক্ষার্থী সফল হলেন! পড়াশোনার রেজাল্টও আবার তার ভালো। সব দিক সামলে ঢাবি ক্যাম্পাসে সাড়া জাগিয়েছেন একজন নারী। যিনি কিনা একসময় অর্থাভাবে ভার্সিটির ফরম কিনতে পারেননি। থাকার জায়গা ছিল না। রেলস্টেশনে রাত কাটিয়েছেন। সাহসী, উদ্যোমী এই নারীর নাম কামরুন্নাহার মুন্নী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিভাগে স্নাতকোত্তর করেছেন। কলেজ-ভার্সিটির রেজাল্টও খুব ভালো। মা সব সময় তার পাশে থাকেন।  ছোটোবেলা থেকেই নাচ-গান করতেন। তখনই সবার দৃষ্টি কেড়েছেন তিনি। কেউ কেউ বলতেন, দেখিস বড় হয়ে ও খুব নাম করবি। মুন্নীর সফলতার ফিরিস্তি অনেক লম্বা। তিনি নীলা নুসরাত পরিচালিত ‘মাগনা’ ছবিতে অভিনয় করেছেন। সম্প্রতি তিনি নুরুল আলম আতিক পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মানুষের বাগান’-এর কাজ শেষ করেছেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা আর নারীদের জীবন নিয়ে দুটি প্রামাণ্যচিত্রের কাজ শেষ করেছেন। পাশাপাশি ফটোস্টোরি বানাচ্ছেন। নাটক, নাচ, লেখালেখি, উপস্থাপনা এসব তো আছেই। ফটোস্টোরিতে মুন্নী ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। লেখার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি ছবি তোলেন। একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা সোনালি দিনের গান, দুর্গাপুরের নারীদের জীবন নিয়ে তিনি ফটোস্টোরি করেছেন, যা তুমূল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সিনেমায় অভিনয় প্রসঙ্গে মুন্নী বলেন, অভিনয় করতে আমি ভালোবাসি। যত ছোটোই হোক না কেন, চরিত্র ফুটিয়ে ধরতে চেষ্টা করি। এরপর তিনি অধিক্ষেত্র, ভালোবাসা, রেইন আই এন্ড আই ছবিতে কাজ করেছেন। বিদ্রোহী কবিতার ভিজুয়ালাইজ করেছেন তিনি। ফুল, টেলিফিল্ম জেনিফার তুমি, রক্তগোলাপ এবং সেলাইঘরে অভিনয় করেছেন। মুন্নীর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে গনঘরের কেচ্ছা:কক্ষ নং ২৪৩, স্বল্পদৈর্ঘ্য বরণ, স্বত্বা, মনোভ্রমণ সাক্ষাত্কার। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। ২০১৫ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শুদ্ধ অবগাহন’ প্রকাশিত হয়। এরপর প্রকাশিত হয় নন্দিত, চিঠির সুখ-দুঃখ, অলংকার যেমন কাপড়ের ইত্যাদি। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে মুন্নী জড়িত। ডিইউডিএস (ঢাকা ভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি)-এর তিনি কালচারাল সেক্রেটারি। তিনি ঢাকা ভার্সিটি কালচারাল সোসাইটির অ্যাক্টিং কো-অর্ডিনেটর হিসাবেও কাজ করেছেন। স্কুল অব হিউম্যানিটির সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। জিটিভির আজকের অনন্যা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ান হন মুন্নী। আর টিভির ক্যাম্পাস স্টার অনুষ্ঠানে সেরা দশে ছিলেন তিনি।

এত্ত এত্ত সাফল্য যার ঝুলিতে। তিনি বলেন, তার শুরুটা খুব কষ্টের ছিল। ২০১২ সালের কথা। বাবা নেই। একা ঢাকায় এলেন। আত্মীয়-স্বজনের বাসায় কিছুদিন থাকলেন। অর্থাভাবে মেস, হোস্টেলেও বেশি দিন থাকা হলো না। ‘প্রচণ্ড অর্থকষ্ট নিয়ে ঢাকায় আসি। পরিবারে আমিই বড়। আত্মীয়-স্বজন, মেস এমনকি রেলস্টেশনেও রাত কাটিয়েছি।’ তিনি বলেন, অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে রিসিপশনিস্টের চাকরি পাই। কিন্তু বসের আপত্তিকর আচরণ, প্রস্তাবের কারণে চাকরিটা করতে পারেননি বেশি দিন। এরপর অনলাইন রেডিওতে কাজ নেন। কোচিংয়ে বাচ্চাদের খাতাও দেখেছেন তিনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ। অনেকের কাছে চাকরির জন্য অনুরোধ করেছেন। এত কিছুর পরেও মুন্নীর জীবন থেমে থাকেনি। নিজের থেকেই তিনি নিজে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। তার অর্থকষ্ট এখন আর নেই। তিনি এখন স্বপ্ন দেখেন একটা প্রডাকশন হাউজ দেওয়ার। ইতিমধ্যে ক্যামেরাসহ কিছু যন্ত্রপাতি কিনেছেনও। টুকটাক কাজ হচ্ছে। তবে বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছা তার। প্রডাকশন হাউজের নাম রুটস। মুন্নী যখন বাড়িতে থাকেন। তখন সেখানকার মেয়েদের হাতের কাজ শেখান। 

সফলতা নয়, মুন্নী সার্থকতায় বিশ্বাসী। তার ভাষায়, ‘আমি সার্থকতায় বিশ্বাস করি। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। মুন্নীর লেখাজুড়ে মানবতা, মানুষের জন্য কাজ করার জয়গান। তিনি লিখেছেন—সব শেষে সবাই আলোকিত হয়ে মানবিকতার চর্চা করি আসুন। আসুন মানবতার গান গাই। ইতিবাচক হয়ে জীবনবোধ সমৃদ্ধ করি। অযথা নাক চোখ-ভ্রু না কুঁচকে হেসে জীবন যাপন করি।