বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নিরিখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সরাসরি মনোনয়নের সংখ্যা বরাবরই কম হলেও আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন এবার অতীতের তুলনায় বেড়েছে। পুরুষ প্রার্থীর তুলনায় তাও মাত্র পাঁচ শতাংশ। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে এক হাজার ৮৯৫ জন প্রার্থী ছিলেন, যাদের মধ্যে ৯৪ জন নারী। এই ৯৪ জনের মধ্যে ৬৪ জনই ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। দলীয় মনোনয়নেও নারী সদস্যদের উপস্থিতি আশাজাগানীয়া হলেও ভোটের মাঠ দিচ্ছে ভিন্নবার্তা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও নৃতত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদা আখতার বলেছেন, ‘স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের মধ্যে নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে জয়ী হয়েছেন মাত্র ৪ জন। সবমিলিয়ে জয়ের মুখ দেখেছেন ১৯ নারী প্রার্থী। অথচ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২২। যা গতবারের তুলনায় কম। এবার যেহেতু নারী প্রার্থী বেড়েছিল, তাই সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশা ছিল নারী সংসদ সদস্যও বেশি হবে। তেমনটি হয়নি। যদিও তুলনামূলক বিচারে পুরুষ প্রার্থীদের তুলনায় নারীর প্রার্থীরাই ভালো করেছে’। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অঘোষিত ময়মনসিংহ-৩ আসনেও এগিয়ে রয়েছেন এক নারী প্রার্থী।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী ১৯ নারী প্রার্থীর মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ মনোনীত; বাকি ৪ জন স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করেছেন। বাকি ৭৭ নারী প্রার্থীর মধ্যে হেভিওয়েট প্রার্থীও ছিলেন। মমতাজ বেগম, মেহের আফরোজ চুমকি ও সানজিদা খানমের মত শক্তিশালী প্রার্থীও এবার নির্বাচনী হার্ডল পেরোতে পারেননি। শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সৈয়দা জাকিয়া নূর পুনর্নির্বাচিত হয়েছে; সংরক্ষিত আসনের সদস্য শেরীফা কাদের (মাঝে) এবার সরাসরি ভোট করলেও জয় পাননি। গতবারের তুলনায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ।
যদিও নির্বাচনী নারী বিজয়ীর সংখ্যা কম তবে একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চান অনেক বিশ্লেষক। কারণ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লে দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর মতপ্রকাশের পথ আরও ভালোভাবে উন্মুক্ত হবে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৯৭০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের মধ্যে নারীদের (৯৬ জন) অংশগ্রহণের হার ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২০। জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কংগ্রেস ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি নয়জন করে, তৃণমূল বিএনপি ছয়জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ তিনজন করে এবং গণফ্রন্ট ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি দুজনকে করে নারী প্রার্থী দেয়। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, জাতীয় পার্টি-জেপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম, কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি একজন করে নারী প্রার্থী দিয়েছে।
“আমাদের মানসিকতাই হল নারীদেরকে আমরা নমিনেশন দেই না। ভেবে চিন্তে পারবে কি পারবে না, আমরা এসব দেখি। কোনো পুরুষ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার সময় যোগ্য কি যোগ্য না, সেটা চিন্তা করা হয় না। আসলে মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সমাজেরও, কিন্তু সমাজ তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের নিয়ে আসছে। দলের ভূমিকাটা এখানে মুখ্য।”
গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নারী নেতৃত্বের হাতেই থাকছে। সংসদ ও সংসদের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারীদের দেখা যাচ্ছে। তবে সামগ্রিক রাজনীতিতে নারীরা পিছিয়েই থাকছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৯৭০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের মধ্যে নারীদের (৯৬ জন) অংশগ্রহণের হার ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২০। জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কংগ্রেস ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি নয়জন করে, তৃণমূল বিএনপি ছয়জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ তিনজন করে এবং গণফ্রন্ট ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি দুজনকে করে নারী প্রার্থী দেয়। সংরক্ষিত আসনে প্রতিনিধিত্ব করতে ৫০ জন নারী জাতীয় সংসদে যান। তবে জনরায় নিয়ে এর অর্ধেক নারীও কোনো সংসদে যেতে পারেননি। বিষয়টি আশাব্যঞ্জক নয় বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে ৩৯ জন নারী প্রার্থী অংশ নেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন জয়ী হয়ে সংসদে যান। ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে ৩৬ নারী প্রার্থীর আটজন, সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৮ নারী প্রার্থীর ছয়জন, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৯ নারীর মধ্যে ১৯ জন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯ নারী প্রার্থীর ১৮ জন নির্বাচিত হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৯ আসনে জনপ্রতিনিধি হতে লড়েন ৬৮ নারী, যাদের মধ্যে রেকর্ড ২২ জন সরাসরি নির্বাচিত হয়ে সংসদে যান। এবার এক ধরনের প্রত্যাশা ছিল নারী প্রার্থী যেহেতু বেড়েছে সেহেতু নারী সাংসদও বাড়বে। তবে তা না হলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ফলে অভিজ্ঞতা অর্জন ও তৃণমূল পর্যায় থেকে নারীর মতপ্রকাশের সুযোগ নিয়ে কাজ করার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। বাঙালি পরিবারগুলো, বাঙালি সমাজ নারীর ঘরের বাইরে যাওয়া দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে; কিন্তু রাজপথে নারী কোনো দলের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে, রাজনীতি করছে- এমন নারীকে সাদরে বরণ করা হয় না। এ ভাবনার এখন বদল ঘটবে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদে যারা নির্বাচিত হয়েছেন
আওয়ামী লীগ: (রংপুর-৬) শিরীন শারমিন চৌধুরী, (গাইবান্ধা-৩) উম্মে কুলসুম স্মৃতি, (বগুড়া-১) সাহাদারা মান্নান, (সিরাজগঞ্জ-২) জান্নাত আরা হেনরি, (বাগেরহাট-৩) হাবিবুন নাহার, (বরগুনা-২) সুলতানা নাদিরা, (শেরপুর-২) মতিয়া চৌধুরী, (কিশোরগঞ্জ-১) সৈয়দা জাকিয়া নূর, (মুন্সীগঞ্জ-২) সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, (গাজীপুর-৩) রুমানা আলী, (গাজীপুর-৪) সিমিন হোসেন রিমি, (গোপালগঞ্জ-৩) শেখ হাসিনা, (চাঁদপুর-৩) দীপু মনি, (চট্টগ্রাম-২) খাদিজাতুল আনোয়ার এবং (কক্সবাজার-৪) আসনে শাহীন আক্তার।
এর বাইরে ময়মনসিংহ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের নিলুফার আনজুম পপি নৌকা প্রতীকে প্রায় এক হজার ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। আসনটির একটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত থাকায় ফলাফল ঘোষণা করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। ওই কেন্দ্রে ১৩ জনুয়ারি ভোট হবে।
স্বতন্ত্র: (গাইবান্ধা-১) আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগার, (মাদারীপুর-৩) মোসা. তাহমিনা বেগম, (সুনামগঞ্জ-২) জয়া সেনগুপ্তা ও (হবিগঞ্জ-১) আসনে আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী জয়ী হয়েছেন।

কাল শপথ নেবেন না জাপার নির্বাচিতরা
চিত্রনায়িকা মাহির জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে
গণতান্ত্রিক বিশ্বে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি: সমমনা জোট