কয়েক বত্সর পূর্বে এক আষাঢ়ের প্রবল বর্ষণের স্রোতধারায় একটি রেললাইনের নাট-বল্টু-ফিসপ্লেট খসিয়া পড়ায় রেললাইন নির্দিষ্ট স্থান হইতে বিচ্যুত হইয়া কিছুটা দূরে সরিয়া যায়। তখন এই বর্ষণের শেষে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র স্কুলে যাওয়ার পথে তা দেখিতে পায়। লাইনচ্যুত অবস্থায় পড়িয়া আছে লাইনটি। এবং দূরে তাকাইয়া দেখিল একটি রেলগাড়ি আসিতেছে। স্কুলপড়ুয়া বালকটি তাহার জামা খুলিয়া উপরের দিকে হাত দিয়া জামাটি নাড়াইতে থাকে। আগত রেলগাড়ির গার্ড দূর হইতে ছেলেটির সংকেত দেখিতে পাইয়া রেলটি থামাইয়া দেন। সবাই গাড়ি হইতে নামিয়া দেখিতে পায় রেললাইনের প্রকৃত অবস্থা! হাজার হাজার লোক বাচ্চাটিকে ধন্যবাদ দিতে থাকে। সারা দেশে তখন ছেলেটির নামে ধন্য ধন্য পড়িয়া যায়। রেল বিভাগ হইতে ছোটো বালককে পুরস্কৃতও করা হয়। কিন্তু রেলের এই বিপজ্জনক পথ সম্পর্কে বোধ করি বোধোদয় কাহারো হয় নাই। তাহা না হইলে রেলপথের মতো স্পর্শকাতর পথে এখনো এইরকম বিশৃঙ্খলা থাকে কী করিয়া? গত ১ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে ছবিসহ একটি সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে, যাহাতে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত হইতে টাঙ্গাইলের ঘাড়িন্দা পর্যন্ত রেলপথের বেশ কয়েকটি স্থানে রেলপথ কেবল ঝুঁকিপূর্ণই নহে, রেললাইনের সঙ্গে স্লিপার সংযুক্ত রাখিতে লোহার নাট-বল্টু ফিসপ্লেটের পরিবর্তে গুঁজিয়া দেওয়া হইয়াছে বাঁশ ও কাঠের টুকরা। আমরা জানি উপমহাদেশে ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করিবার জন্যই ব্রিটিশ আমলেই অধিকাংশ রেললাইন নির্মাণ করা হইয়াছিল। প্রকৌশল ব্যবস্থাপনার বিবেচনায় রেললাইনটি চলাচলের উপযোগী রাখিতে সর্বক্ষণিক পরিদর্শনের প্রয়োজন। অপরিহার্য নাট-বল্টুর পরিবর্তে কীভাবে বাঁশের গোঁজা ব্যবহার করা হইলো তাহা দেখিলে বিস্মিত হইতে হয়।
জানা যায়, এই রেললাইনটি ১৯৯৮ সালে নির্মাণের পর হইতে আর সংস্কার করা হয় নাই। যে রেলপথ দিয়ে প্রতিদিন ২৬টি ট্রেন চলাচল করিয়া থাকে তাহা তদারক করিবার কেহ নাই? বিশেষ করিয়া বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নিয়াছেন। সরকার রেলপথ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বেশ উদ্যোগী দীর্ঘদিন হইতে। নূতন নূতন রেললাইন যুক্ত করিয়াছে, বাড়াইয়াছে রেলগাড়ি। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যবোধের প্রতি অবহেলা আমাদের ভাবাইয়া তোলে। তবে শুধু রেললাইন কেন? যেখানে যে বিভাগে দৃষ্টি দেওয়া হউক না কেন দেখা যাইবে সর্বত্র দুর্নীতি এবং অবহেলার ছাপ রহিয়াছে। এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটিলে তাহার দায় লইবে কে?
তাই এই রহস্যজনক কাণ্ডের পিছনে কে বা কাহারা রহিয়াছে তাহা জানিতে হইবে। তাহাদের বিচারের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সেই সঙ্গে দ্রুত কাঠের গোঁজা সরাইয়া প্রয়োজনীয় নাট-বল্টুর ব্যবস্থা করিতে হইবে এবং সার্বিকভাবে রেলপথটিকে নিরাপদ করিয়া তুলিতে হইবে।
