রাজনীতিতে শুধু সাকিব-মাশরাফি নন

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৪, ১৮:২৫

বাংলাদেশের ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা ওয়ানডে একাদশ গড়তে গেলে দুটো নাম আসবেই- মাশরাফি বিন মর্তুজা ও সাকিব আল হাসান। সাকিবকে তো বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার হিসেবেও বেছে নেন অনেকে। ক্রিকেটই তাদের দিয়েছে তারকাখ্যাতি। ২২ গজের মঞ্চে দাঁড়িয়েই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজেদের নাম। তাদের সেই পরিচিতিতে যোগ হয়েছেন নতুন ‘বিশেষণ’।

মাশরাফির নামের সঙ্গে আগেই যোগ হয়েছে সংসদ সদস্য। এবার সাকিবও যোগ দিলেন ওই তালিকায়। এবারের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসন থেকে টানা দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়েছেন মাশরাফি। অন্যদিকে মাগুরা-১ আসন থেকে প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ব্যবধানে জয়ী সাকিব।

ক্রিকেট থেকে রাজনীতির মাঠে এসেও তাদের দাপট। জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তবে বাংলাদেশি দুই তারকা ক্রিকেটারই যে শুধু রাজনীতিতে এসেছেন, ব্যাপারটা এমন নয়। ক্রিকেট থেকে অনেকেই নাম লিখিয়েছেন ভোটের মাঠে। কেউ সফল হয়েছেন, কেউ হয়েছেন ব্যর্থ।

ব্যর্থতার কথা বললে সবার আগে আসবে সিবি ফ্রাইয়ের নাম। ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল ও ক্রিকেট- দুই জায়গাতেই খেলেছেন তিনি। ৩৯৪টি প্রথম শ্রেণি ম্যাচ খেলা এই ব্যাটার ১৯২২ সালে ব্রাইটন থেকে নির্বাচন করেছিলেন লিবারেল পার্টির হয়ে। যদিও হেরে যান। এরপর অক্সফোর্ড ও ব্যানবেরি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও একই ফল পাওয়ায় রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়ান!

রাজনীতিতে টিকতে পারেননি ভারতের পালওয়াঙ্কার বালু-ও। ১৯১১ সালে ভারতীয় দল যখন প্রথমবার ইংল্যান্ড সফরে করেছিল, ওই দলের গর্বিত সদস্য ছিলেন এই বাঁহাতি স্পিনার। এর ছয় বছর পর তিনি তখনকার বোম্বে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিধান সভা নির্বাচনে। কিন্তু হেরে যান রাজনীতির মাঠে।

ব্যর্থতার খাতায় নাম উঠবে টেড ডেক্সটারের। সেটা মাঠ ও রাজনীতি দুটো জায়গাতেই। ১৯৬৪ অ্যাশেজে পেয়েছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়কত্ব। কিন্তু নির্বাচনে অংশ নিবেন বলে ছেড়ে দেন নেতৃত্ব। যদিও সফল হননি। হেরে যান জিম কালাহানের কাছে। ফলে দুই কূলই হারান। নির্বাচনেও জিতলেন না, ওদিকে ইংল্যান্ডের নেতৃত্বও হারান!

সিবি ফ্রাই।

মনসুর আলী খান পতৌদি। ভারতীয় নবাব থেকে ক্রিকেটার- দুটো পরিচয়ই আছে তার নামের পাশে। পরে রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে আরেকটি পরিচয় যুক্ত হয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারতের টেস্ট দলের অধিনায়ক হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে পতৌদি রাজ্য থেকে বিধানসভা নির্বাচন করলেও হেরে যান মনসুর।

ক্রীড়াবিদদের রাজনীতি-ব্যর্থতার বিপরীতে সফলতাও আছে অনেক। যেখানে উজ্জ্বল মুখ অ্যালেক ডগলাস হোম। তিনিই ইংল্যান্ডের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যার ছিল প্রথম শ্রেণিতে খেলার অভিজ্ঞতা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, মিডেলসেক্স ও এমসিসির হয়ে খেলেছেন ১০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ।

ভারতের সাবেক অধিনায়ক আজহারউদ্দিন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সিতে ৪৮ টেস্ট খেলা ওয়েস হলও নাম লিখিয়েছিলেন রাজনীতিতে। ২৬.৩৮ গড়ে ১৯২ উইকেট নেওয়া এই ক্রিকেটার অবসরের পর জড়ান রাজনীতিতে। বার্বাডোজের সিনেট ও হাউজ অব অ্যাসেম্বলিতে ছিলেন অনেকটা সময়। ১৯৮৭ সালে হয়েছিলেন এই এলাকার পর্যটন মন্ত্রী।

ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক কার? ১৯৮৭ বিশ্বকাপ দেখা ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ওই দৃশ্যটা এখনও জীবন্ত। ভারতীয় স্পিনার চেতন চৌহান গড়েছিলেন এই কীর্তি। বিশ্বকাপ মঞ্চে প্রথমবার হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গড়া চৌহান ১৯৯১ সালে অংশ নিয়েছিলেন লোকসভা নির্বাচনে। উত্তর প্রদেশের আমরোহা থেকে জয়ী হয়ে শুরু করেছিলেন নতুন ‘ইনিংস’। পরে ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করেন তিনি।

ওই সময়, মানে ১৯৯৮ সালে যখন চৌহান নির্বাচিত হন, তখন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন ভারতের অধিনায়ক। জাতীয় দলে ৯৯ টেস্ট ও ৩৩৪ ওয়ানডে খেলা এই ব্যাটারও নতুন ইনিংস গড়েন রাজনীতিতে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়ে লড়ে জয়ী হন উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদ অঞ্চল থেকে। 

নভজোৎ সিং সিধু।

আজহারউদ্দিনের নেতৃত্বে ভারতের জার্সিতে খেলেছেন নভজোৎ সিং সিধু। ভারতীয় ক্রিকেটের পরিচিতি মুখ তিনি। ২২ গজ থেকে অবসরের পর এখন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। আজহারের আগেই লোকসভার সদস্য সিধু। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন। ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সামলেছেন পাঞ্জাব সরকারের পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন ভারতের আরও কয়েকজন ক্রিকেটার। তাদের মধ্যে অন্যতম মোহাম্মদ কাইফ, শান্তাকুমারান শ্রীশান্ত ও গৌতম গম্ভীর। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল থেকে ক্রিকেট থেকে রাজনীতিতে নাম লেখানো খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি। শ্রীলঙ্কান গ্রেট অর্জুনা রানাতুঙ্গাও যেমন ২২ গজ ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন রাজনীতিতে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক তার বাবার দেখানো পথ ধরে আসেন রাজনীতির মাঠে। সংসদ সদস্য তো বটেই, কয়েকটি মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

গৌতম গম্ভীর।

রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে জেতা ১৯৯৬ বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম সদস্য সনাথ জয়াসুরিয়া। এই কিংবদন্তি ওপেনারও ক্রিকেট থেকে হাঁটেন রাজনীতির পথে। ২০১০ সালে জন্মস্থান মাতারা থেকে নির্বাচিত হন শ্রীলঙ্কার সংসদ সদস্য। রাজনীতি ও খেলা একইসঙ্গে চালিয়ে গেছেন জয়াসুরিয়া। সংসদ সদস্য হয়েও ২০১১ সাল পর্যন্ত খেলে গেছেন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি।
ক্রিকেটার থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তি হয়ে ওঠার অনেকের গল্পই তো জানা গেল। 

১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জয়ী পাকিস্তানের অধিনায়ক ইমরান খান।

তবে তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে একজন। যিনি ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে ছিলেন বিশ্ব কাঁপানো, আবার রাজনীতির মাঠ থেকে গিয়েছিলেন সর্বোচ্চ অবস্থানে। তিনি ইমরান খান। পাকিস্তানের জেতা একমাত্র বিশ্বকাপে অধিনায়ক ছিলেন এই ইমরান। তার নেতৃত্বের ক্যারিশমাতেই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধ কন্ডিশনে গিয়েও ১৯৯২ সালে বিজয় নিশান উড়িয়েছিল পাকিস্তান। খেলা ছাড়ার পর রাজনৈতিক দল গঠন করে বসেছিলেন দেশের সর্বোচ্চ চেয়ার- পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসনে।

ইমরান খান ছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। বাংলাদেশের সাকিবও তাই। অন্যদিকে ইমরান খান ছিলেন পাকিস্তানের অধিনায়ক। বাংলাদেশের সাকিব-মাশরাফিও নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশকে। মাঠে তিনজনের পরিচয় একই। এবার রাজনীতিতেও তারা মিলে গেলেন একমোহনায়!

ইত্তেফাক/জেডএইচ