গ্যাসের দাম নির্ধারণ ও আঞ্চলিক বৈষম্য

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:১০

একসময়ের বাংলার শস্যভান্ডার ও ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। এখন আর শস্য থাকলেও ভান্ডার নেই। নেই ধান এবং খাল। আছে কয়েকটি বড় নদী তা-ও চড়ায় আবদ্ধ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপ অনুসারে থানাভিত্তিক দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে। এখানে কোনো শিল্পকারখানা, গ্যাসযোগ এবং রেল যোগাযোগ নেই। লেখাপড়ায়ও পিছিয়ে এ অঞ্চল। একসময় বলা হতো জ্ঞানীগুণী মানুষের জন্ম ও লালনকেন্দ্র বরিশাল। এখন সবচেয়ে বড় ‘গাইড বইয়ের’ বাজার বরিশাল।

ভোলার গ্যাস বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের পশ্চাত্পদ এলাকায় আবাসিক খাত ও শিল্পকারখানা গড়ে তোলায় সহায়ক হবে বলে অনেকে আশা করেছিল। এই বিষয় নিয়ে এই অঞ্চলে বেশ কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী বরিশালে এক সমাবেশে সবার আগে ভোলার গ্যাস বরিশালের শিল্পকারখানায় ও আবাসিক খাতে সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ ২০২৩ সালের ২১ মে ইন্ট্রাকো কোম্পানির সঙ্গে সরকার ১০ বছর মেয়াদি ভোলার গ্যাস সিএনজিতে রূপান্তর করে ঢাকায় সরবরাহ করার চুক্তি করেছে। এই কমপ্রেশড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) ঢাকা, ময়মনসিংহের ভালুকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ করা হবে। সিএনজি আকারে রূপান্তর করে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করবে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন লিমিটেড। চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রথম ধাপে চার-পাঁচ মাসের মধ্যে পাঁচ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সংকুচিত করে সরবরাহ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এক বছরের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। ইন্ট্রাকো সরকারের কাছ থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কিনবে ১৭ টাকায় আর বিক্রি করবে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা দরে।

আমার কৌতূহলী মন জানতে চায় এই পরিমাপ কেমন, কোন ধরনের বা হিসাবটিও আবার কোন প্রকারের? সেজন্যই আজ এই লেখার আয়োজন।

আমরা জানি, তরল পদার্থের আয়তন পরিমাপের একক : লিটার। এক লিটার বিশুদ্ধ পানির ওজন এক কিলোগ্রাম (কেজি) তরল পদার্থের জন্য লিটার আর বস্তুর জন্য কেজি। এলপিজি/সিএনজি গ্যাসের পরিমাপের একক ও কেজি ঘনবস্তুর ঘনফলই আয়তন। ১ ঘনমিটার = ১ স্টেয়র ১ স্টেয়র = ৩৫.৩ ঘনফুট (প্রায়) ১ ঘনফুট = ২৮.৬৭ লিটার (প্রায়) অতএব, ১ ঘনমিটার = (৩৫.৩ × ২৮.৬৭) = ১০১২.০৫১ লিটার

এই কথাগুলো লেখার উদ্দেশ্য হলো—গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে ভোলার গ্যাস-সিলিন্ডারে করে ঢাকার গাজীপুরস্থ শিল্প এলাকাসহ ময়মনসিংহের ভালুকায় সরবরাহ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই সিএনজির প্রতি ঘনমিটারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা। আমার প্রশ্ন হলো, আমরা যখন রান্নার জন্য এক সিলিন্ডার গ্যাস (সিলিন্ডারের দাম বাদে) ক্রয় করি, তখন এর দাম হয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫৬০ টাকা। তাহলে এখন একটু হিসাবনিকাশ করে নিই। সিএনজি বা এলপিজি (কমপ্রেশড ন্যাচারাল গ্যাস/সিএনজি) ৩ হাজার পিএসআই চাপে সিলিন্ডারে ভরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। আমরাও এই গ্যাস রান্নায় ব্যবহার করে থাকি। আমরা রান্নায় ব্যবহারের জন্য যে গ্যাস (সিলিন্ডারের দাম বাদে) কিনে থাকি, তার প্রতি কেজির দাম পড়ে (১৫০০ ÷ ১৫) = ১০০ টাকা আর ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে শিল্প কারখানায় স্থানান্তরিত করা হচ্ছে, তার প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় (৪৭.৬০ ÷ ১০৯২.০৫১) = .০৪৭০৩৩ টাকা অর্থাত্ .০৪৭ টাকা (প্রায়)। আমরা কেজিপ্রতি বেশি দাম দিই (১০০-.০৪৭) = ৯৯.৫৩ টাকা। সুতরাং ১৫ কেজিতে বেশি দিই (৯৯.৫৩ × ১৫) = ১৪৯২.৯৫ টাকা। অর্থাত্ গ্যাস কিনি ১ হাজার ৫০০ টাকায়। তার মধ্যে উত্পাদন মূল্য বাদে বেশি দিই ১৪৯২.৯৫ টাকা।

এছাড়া আরো একটু বিষয়, কোম্পানি পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ১৭ টাকা, সিএনজি স্টেশনগুলোর ক্ষেত্রে যা ৩৫ টাকা। এখানে দেওয়া যায় ১৭ ÷ ১০১২.০৫১ = .০১৭ টাকা (প্রায়) অর্থাত্ কোম্পানি পর্যায় প্রতি কেজি সিএনজির দাম। এই গ্যাস সরবরাহের হাতবদলের ধারাবাহিকতায় উত্পাদনের কাজটি করেছে বাপেক্স। বাপেক্সের কাছ থেকে কিনে নিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। এরপর সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি থেকে কিনে শিল্পকারখানায় সরবরাহের কাজটি করছে বেসরকারি কোম্পানি ইন্ট্রাকো। এইসব তথ্য ইন্ট্রাকোর সঙ্গে চুক্তি অবলম্বনে দৈনিক সংবাদের নিউজ (২২.১২.২০২৩খ্রি.) থেকে নেওয়া হয়েছে।

যদি ওপরের হিসাবনিকাশ বা সূত্রাবলি সঠিক হয়, তাহলে গ্যাস বিতরণ ও বিক্রির মধ্যে যে বিরাট ব্যবধান, সেটি আসলেই লুটপাটের মধ্যে পড়ে। সেজন্য বিশেষজ্ঞ মহলের সঙ্গে মিলেমিশে সাধারণ মানুষকে ১০০ গুণ দামে অর্থাত্ (.০৪৭ × ১০০) = ৪.৭টাকা অর্থাত্ ৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হোক। তাহলে ১৫ কেজি সিলিন্ডারের (শুধু গ্যাস) দাম পড়বে (৫ × ১৫) = ৭৫ টাকা।

গ্রাহক প্রথমবার সিলিন্ডারের বডি কিনে থাকে ১ হাজার ২০০ টাকায়, তারপর ঐ সিলিন্ডার জমা দিয়ে শুধু গ্যাস কিনে থাকে। এই যে দামের কথা বললাম, তা কিন্তু শুধু গ্যাসের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা বা ১ হাজার ৫৬০ টাকা। সেই হিসেবে ৭৫ টাকার সঙ্গে মার্জিন ও ব্যবস্থাপনা খরচ যোগ করে ১৫ কেজির সিলিন্ডার ১০০ টাকায় বিক্রি করলে মার্জিন হবে ১০০ গুণ। আমি এখনো পরিষ্কার নই যে, আমার এই হিসাব সঠিক কি না। যারা এই ব্যাপারে ভালো বোঝেন, তারা এই ব্যাপারে বিস্তারিত লিখবেন। আমার কাছে কেমন যেন ফাঁকিঝুঁকি মনে হয়। তাই যারা এই বিষয়ে পণ্ডিত, তারা মতামত দেবেন। আমার কোনো অজ্ঞতা বা ভ্রান্তি থাকলে তা সংশোধন করে দিলে কৃতার্থ হব।

ভোলার গ্যাস ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জসহ এই অঞ্চলে কম মূল্যে সরবরাহ না করে এরকম ঢাকায় স্থানান্তর বিমাতাসলভ আচরণ। আমরা চাই, অনতিবিলম্বে ভোলার গ্যাস যে প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর করা হচ্ছে, তা কিছু পরিমাণ কমিয়ে উত্পাদন মূল্যের সঙ্গে কম মার্জিন এবং যৌক্তিক ব্যবস্থাপনা খরচ যোগ করে যে মূল্য দাঁড়ায়, সেই মূল্যে ভোলা বরিশালসহ জেলাগুলোতে সরবরাহ করা হোক। মনে রাখা দরকার, যে কোনো আঞ্চলিক বৈষম্য বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়, বরিশাল

ইত্তেফাক/এসটিএম