শখের ঘুড়িই ৫২ বছর ধরে সমীরের পেশা

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ১৪:৫২

সাকরাইনের তখনো সপ্তাহখানেক বাকি। কিন্তু শাঁখারি বাজারে উত্সব শুরু তারও আগে। প্রতিটি দোকানেই ঘুড়ি-নাটাইয়ের বিক্রি-বাট্টা বেশ ভালো। অন্য দোকানির চেয়ে সমীর কুমার নন্দী একটু বেশিই ব্যস্ত। বাবা-ছেলে তিনজন মিলিয়েও সামলাতে পারছেন না ভিড়। তারপরও হাসিমুখেই বিভিন্ন রঙের, হরেক নামের ঘুড়ি একে একে তুলে দিচ্ছেন সবার হাতে।

এমন ব্যস্ততার মধ্যেই কথা শুরু। ভিড়ের মধ্যে তাকে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন, ‘এখনকার সাকরাইনে তো ডিজে পার্টি, আতশবাজি ঝলকানিই বেশি দেখা যায়; ঘুড়ির চাহিদা আগের চেয়ে কেমন?’ সমীরের কথায়, ‘ঘুড়ির নেশার চেয়ে বড় নেশা কিছুতেই নেই। সাকরাইনে ডিজে পার্টি-আতশবাজি যোগ হলেও, ঘুড়ির চাহিদা কমেনি। বরং বাড়ছে।’

১৯৭২ সাল থেকে শুরু...

আগেই জেনেছি, প্রায় ৫২ বছর ধরে ঘুড়ি  তৈরি করেন সমীর কুমার নন্দী। শুনতে চাইলাম তার ঘুড়ির গল্প। মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই শঙ্খের ব্যবসা ছিল তার বাবার। তবে সমীর নন্দীকে টানত ঘুড়ি কাটাকুটির খেলা। স্কুলের টিফিনের টাকা জমিয়ে প্রতিদিন নিত্যনতুন ঘুড়ি কিনতেন। কোনোদিন টাকার অভাবে কিনতে না পারলে আনচান করে উঠত মন! কিন্তু ঘুড়ি ছাড়াতো তার চলবেই না!

সমীর নন্দী বলেন, ‘আমি প্রথম ঘুড়ি বানাই ১৯৭২ সালে। পয়সার অভাবে ঘুড়ি কিনতে না পেরেই নিজে নিজে ঘুড়ি বানানো শুরু করি। একদিন দেখলাম যে, আমার ঘুড়ি তো বেশ ভালো ওড়ে। সেই থেকে শুরু। আর থামাথামি নেই।’

শুরুতে নিজের জন্য ঘুড়ি বানালেও, পরবর্তীকালে বিক্রিরও চিন্তা করেন সমীর। তার কাছে মনে হলো বাবার শঙ্খের দোকানে শঙ্খ, বালার পাশাপাশি ঘুড়িও থাকুক। সেই থেকে সমীরের বাণিজ্যিকভাবে ঘুড়ি বানানো শুরু। তিনি জানান, ‘সেই সময়ে ৫০ পয়সার ঘুড়ি বানাতাম। সর্বোচ্চ দামের ঘুড়ির মূল্য ছিল ৫ টাকা। আর বর্তমানে ৭টাকা থেকে শুরু, সাধারণ ঘুড়ি ৪০টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।’

মায়া কাটাতে পারেননি এখনো

ঘুড়ি বানানো কারো কাছেই শিখেননি সমীর। নিজের প্রচেষ্টাতেই তিনি একের পর এক বিভিন্ন নকশার ঘুড়ি বানিয়েছেন। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা এমন নানা ধরনের ঘুড়ি যেন সমীর মুহূর্তেই বানিয়ে দেন। একটি ঘুড়ি বানাতে চার ধরনের কাজ করতে হয়। বাঁশ কেটে চিকন ও লম্বা কাইম তৈরি করা, টিস্যু কাগজ কেটে নকশা করা, রঙ করা ও আঠা দিয়ে জোড়া দেওয়া। এই কাজগুলো একসময় একাই করতেন। এখন তার পরিবারের সদস্যরাও সাহায্য করেন।

ঘুড়ির সাথে শিশু-কিশোরদের এক আলাদা মায়া কাজ করে। কোথাও কোনো ঘুড়ি কাটা পড়লে সেই ঘুড়িকে ধরার জন্য পেছনে পেছনে দৌড়ায় এলাকার শিশুরা। শীত এলেই আকাশ ছেয়ে যায় রংবেরঙের ঘুড়িতে। মানুষের এই হাসিখুশির অংশ হতে পেরেই নিজেকে সার্থক মনে করেন সমীর, আর এজন্যই তিনি অর্ধশত বছর ধরে ঘুড়ি বানিয়ে যাচ্ছেন।

ইত্তেফাক/এইচএ